বিজ্ঞাপন
মুক্তিকামী জনতার দৈনিক 'মুক্তির লড়াই' পত্রিকার জন্য জরুরী ভিত্তিতে দেশের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে ব্যুরো চীফ, প্রতি জেলা ও উপজেলার একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহীরা আবেদন করুন। যোগাযোগের ঠিকানাঃ কামরুজ্জামান জনি- সম্পাদক, মুক্তির লড়াই। ইমেইলঃ jobmuktirlorai@gmail.com । ধন্যবাদ ।

কুরবানির ফযিলত ও শিক্ষা…হোসাইন মো. ইলিয়াস

Muktir Lorai / ২৮৪ বার ভিউ করা হয়েছে
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১

আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের অনুপম নিদর্শন ঈদুল আযহা, এটি মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। যাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মানুষ পশু কুরবানি করে থাকে। এ কুরবানির বিধান যুগে যুগে সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রমাণিত যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাদের প্রিয় বস্তু কুরবানি করতেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ পশু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারন করে। তোমাদের ইলাহ, এক ইলাহ; সুতরাং তাঁরই নিকট আত্মসমর্পন করো এবং সুসংবাদ বিনীতদের জন্য’(সুরা হাজ্জ: ৩৪)।
ক.কুরবানির পরিচয়:
আরবি কুরব বা কুরবান এবং ফার্সী ও উর্দুতে ইহা কুরবানি নামে ব্যবহৃত। শাব্দিক অর্থ: নৈকট্য বা সান্নিধ্য। কুরআনুল কারিমে কুরবানির একাধিক সমার্থকবোধক শব্দের ব্যবহার রয়েছে। যেমন-
-নাহর অর্থে। কুরআনুল কারিমের ভাষায়: ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানি করুন’ (সূরা কাউছার: ০২)। নাসাক অর্থে। আল্লাহ তা’আলা বলেন: (হে নবী)‘বলুন! নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে’ (সূরা আনআ’ম: ১৬২)। -মানসাক অর্থে। কুরআনুল কারিমের ভাষায়:‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি’ (সূরা হাজ্জ: ৩৪)। -আযহা অর্থে। হাদিসের ভাষায় কুরবানির ঈদকে ‘ঈদুল আযহা’ বলা হয়। পরিভাষায়: কুরবানি হলো ‘আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত সময়ে, নির্দিষ্ট নিয়মে, নির্দিষ্ট পশু যবেহ করা’।
খ.কুরবানির উদ্দেশ্য:
কুরবানির উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জন। সকল রকমের লৌকিকতা পরিহার, কুপ্রবৃত্তির দমন ও পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টির মানসে তাকওয়ার গুণাবলী অর্জন করাই কুরবানির উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:‘কখনোই আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না কুরবানির পশুর গোস্ত ও রক্ত ; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া’(সূরা হাজ্জ: ৩৭)। হাদীস শরিফে এসেছে, একদা মহানবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান কুরবানি কী ? সাহাবায়ে কিরাম বলেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই এ বিষয়ে ভালো জানেন। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘ইহা তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুন্নাত’। সাহাবায়ে কিরাম বললেন: এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে? মহানবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কুরবানির পশুর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে তোমাদের জন্য নেকী রয়েছে’(ইবনে মাজাহ) ।
গ.কুরবানির হুকুম:
কুরবানির হুকুমের বিষয়ে আলেমগণ দু’টি মত ব্যক্ত করেন। যথা- ১. ওয়াজিব: হানাফী মাজহাবানুযায়ী সামর্থবানদের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। তাঁদের দলীল- কুরআনুল কারিমের ভাষায়: ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত এবং কুরবানি আদায় করুন’ (সুরা কাউসার: ০২)। হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূল সা. ইরশাদ করেন: কুরবানি করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে’ (ইবনে মাজাহ)। ২. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ: জমহুর উলামাগণের মতে কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তাঁদের দলীল- রাসূল সা. এর বাণী উম্মুল মু’মেনীন হযরত উম্মে সালামা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সা.ইরশাদ করেন: ‘তোমরা যখন জিলহজ্জের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছে পোষণ করবে তাহলে সে যেন (চাঁদ উদিত হওয়া হতে কুরবানি পর্যন্ত) তার চুল ও নখ কাটা হতে বিরত থাকে’(সহীহ মুসলিম)। এখানে ‘তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছে পোষণ করবে’ দ্বারা কুরবানি করাকে আবশ্যক বুঝানো হয়নি; বরং সুন্নাত সাব্যস্ত হতে পারে।
ঘ.যাদের জন্য কুরবানি ওয়াজিব:
যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ সুবহে সাদিক হতে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সমযয়ের মধ্যে যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তাহলে তার জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব, তবে এ ক্ষেত্রে যাকাতের ন্যায় বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়। নিসাব বলতে হাওয়ায়েজে আসলিয়াহ্ তথা নিত্যপ্রয়োজনীয় ধন-সম্পদ বাদ দিয়ে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য বা তার সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে এ জাতীয় প্রত্যেক মুসলিম (নর-নারী), প্রাপ্তবয়স্ক, মুকিম, হজ্জরত না থাকা ও সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন ব্যক্তির ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব।
ঙ.কুরবানির ফযিলত:
কুরবানি ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। ইসলামে এর গুরুত্ব ও ফযিলত অপরিসীম। হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম/তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন,‘হে রাসূল সা.! এ কুরবানি কী? তিনি বলেন: ইহা তোমাদের পিতা ইবরাহীম আ. এর সুন্নাত। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের জন্য কী (উপকারিতা) রয়েছে? তিনি বলেন, (কুরবানির পশুর) প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে তোমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে’(সুনানে আবু দাউদ)। মহানবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যে মু‘মিন ব্যক্তি প্রশস্ত হৃদয়ে হাসি-খুশি মনে সাওয়াবের আশায় কুরবানি করবে, আল্লাহ তা’আলা তার এ কুরবাননিকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষায় জন্যে ঢাল স্বরূপ বানিয়ে দিবেন’ (ইবনে মাজাহ)। রাসূল -সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- আরো ইরশাদ করেন: ‘কুরবানির দিন আল্লাহর নিকট বনী আদমের পশু যবেহ অপেক্ষা অন্য কোন আমল অধিক পছন্দনীয় নয়। কিয়ামতের দিন কুরবানিকৃত পশুর পশম, খুর ও শিংসহ উপস্থিত হবে’(তিরমিজি)।
চ. কুরবানির শিক্ষা:
ইসলামের প্রত্যেকটি ইবাদতে যেমনি মহান মনীবের সন্তুষ্টি অর্জন লক্ষ্য হয় ও অশেষ সওয়াব নির্ধারিত থাকে তেমনি মানবজাতির জন্য বহুবিধ শিক্ষা নিহিত রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি শিক্ষা-
১/ এ কুরবানি আমাদের মহান আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদের স্বীকৃতির শিক্ষা দেয়। কুরআনুল কারিমের ভাষায়:‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত এবং কুরবানি আদায় করুন’(সুরা কাউসার: ০২)। ২/ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সমীপে নিজেকে পরিপূর্ণরূপে সমর্পন করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: ‘যখন তারা দু’জনে আনুগত্য প্রকাশ এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে কাত করিয়ে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে, এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি’ (সুরা সাফফাত:১০৩-১০৫)। ৩/ তাকওয়ার গুণাবলী অর্জন ও তার যথাযথ অনুশীলন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:‘ইহা আল্লাহর বিধান এবং যে আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করল, ইহা তো তার অন্তরের তাকওয়া’ (সূরা হাজ্জ : ৩২)। ৪/ আল্লাহ তা’আলার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। কুরআনুল কারিমের ভাষায়: ‘এভাবেই আমি ঐগুলোকে তোমাদেও অধীন কওে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’(সূরা হাজ্জ : ৩৬)। ৫/ সর্বাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে স্মরণ করা। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:‘সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারন করে’(সূরা হাজ্জ :৩৪)। ৬/ আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের শিক্ষা দেয়। ৭/ সকল কাজে বিশুদ্ধ নিয়্যাতের আবশ্যকতা। ৮/ স্বীয় অধীনস্তদেরকেও আল্লাহর বিধান পালনে অভ্যস্থ করা। রাসূল সা. বলেন: ‘তোমারা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’। ৯/ পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ের ইসলামের বিধান পালন করা। ১০/ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করা। “হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী ? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করুন” (সূরা সাফফাত:১০২)। ১১/ সবরের শিক্ষা। কুরআনুল কারিমের ভাষায়: ‘আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন’ (সূরা সাফফাত: ১০২)। ১২/ সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়।
কুরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি, সান্নিধ্য ও নৈকট্য অর্জিত হয়, ধনী-গরিব, সুখী-দুঃখী নির্বিশেষে সকলের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। উঁচু-নিচু, জাতি-বর্ণ ভেদাভেদ দূরিভ’ত করে একই কাতারে একই সাথে আনন্দ উপভোগ করার ক্ষেত্র তৈরি করে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুরবানি জাতির ভাগ্যে ঐক্য ও সাম্যের বার্তা বয়ে আনে। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের সকল কুরবানি কবুল করে তাঁর নৈকট্যবান বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমীন!
লখেক: হোসাইন মো. ইলিয়াস,
কামিল, বিএ (অনার্স), এমএ, এমফিল, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়।
উপাধ্যক্ষ, নিবরাস মাদরাসা, ঢাকা।


এই বিভাগের আরো সংবাদ
Translate »
Translate »