বিজ্ঞাপন
মুক্তিকামী জনতার দৈনিক 'মুক্তির লড়াই' পত্রিকার জন্য জরুরী ভিত্তিতে দেশের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে ব্যুরো চীফ, প্রতি জেলা ও উপজেলার একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহীরা আবেদন করুন। যোগাযোগের ঠিকানাঃ কামরুজ্জামান জনি- সম্পাদক, মুক্তির লড়াই। ইমেইলঃ jobmuktirlorai@gmail.com । ধন্যবাদ ।

কুমিল্লার গৌরব সাংবাদিক নওশাদ কবীর একজন কর্মী, সংগঠক, পাঠক ও শিল্পী

Muktir Lorai / ১২৮ বার ভিউ করা হয়েছে
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২১

ডেস্ক রিপোর্টঃ
নওশাদ কবীর ১৯৬২ সালের ৮ আগস্ট বুধবার সকাল আটটায় কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানার ইতিহাসখ্যাত ময়নামতি অঞ্চলে সিন্দুরিয়া পাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হুমায়ুন কবীর, মাতা নাজমুন নেছা ।নওশাদ কবীর ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে হুমায়ুন কবীর লিখেছেন; দেওয়ান মজলিস ২০০ বছর পূর্বে এই পরিবারের গোড়াপত্তন করেন। তিনি ছিলেন আগরতলা মহারাজার অধীনে একজন দেওয়ান। দেওয়ান মজলিসের একমাত্র পুত্র মোহাম্মদ তিতা গাজী। তিনিও অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তার পুত্র দেলোয়ার আলী মেহেরকুল পরগনার ইজারাদার ছিলেন। তিনি এলাকার বিচারকাজ পরিচালনা করতেন। তার পুত্র আলী আহমদ তিনি হেড পোস্টমাস্টার ছিলেন। তাঁর পুত্র ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে হাজার ১৯২১ সালে ম্যাট্রিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার পর ১৯২৮ সালে পোস্টমাস্টার পদে চাকরি করেন। তিনি ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন ক্রীড়ামোদী ও সমাজসেবী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর ছেলে আর মেয়ের মধ্যে হুমায়ুন কবীর জ্যৈষ্ঠ।হুমায়ুন কবীর রেলওয়েতে চাকরি করতেন। তিনি পঞ্চাশের দশকে একজন কৃতি ফুটবলার । নওশাদ কবিরের নানার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামের জমিদার বাড়িতে। এই পরিবারের সাথে হযরত শাহজালাল (র:) দরগা মহল্লার রক্তের সম্পর্ক বিদ্যমান। নওশাদ কবীর পিতা-মাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তারা তিন ভাই, দুই বোন। তারা হলেন- জেসমিন সুলতানা সাজ্জাদ, মামলার কবীর, রিয়াজ কবীর ও তাজমিন সুলতানা। তারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত ও জীবনে প্রতিষ্ঠিত।
নওশাদ কবিরের বিদ্যারম্ভ ও কুমিল্লা রেলওয়ে স্কুল। ১৯৭২ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৭৯ সালে বাণিজ্য বিভাগে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার উত্তীর্ণ হন। ১৯৮১ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বানিজ্য বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উভয় পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন, কিন্তু সেখানে তার মন টেকেনি। তারপর তার লেখাপড়ার ছেদ পড়ে। বহিরাগত প্রার্থী হিসেবে ১৯৯২ সালে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে বিএ পাস করেন। প্রকৃতপক্ষে কুমিল্লার সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, তিনি সেই ডাকে সাড়া দিয়েছেন
১৯৯৫ সালের নভেম্বরে সেলিনা আক্তার এর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। সেলিনা আক্তার এর সাথে কচিকাঁচার সূত্রে পরিচয়। সেলিনা আক্তার সহকারী তথ্য অফিসার। তাদের দুই পুত্র সন্তান আজরান কবীর সামিন, শঅহরান বিন নওশাদ সানিল। তার সংসার ছিল সুখী সমৃদ্ধ আনন্দময়।
নওশাদ কবীর নির্দিষ্ট কোনো কর্মজীবন কখনো নির্ধারণ করেননি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছেন। তবে সাংবাদিকতা দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৮৬ সালে দৈনিক বাংলার বাণীতে জেলা সংবাদদাতা হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন। তবে তার সাংবাদিক জীবনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল অনেক আগেই। শিল্পী আইনুল হক মন্ডল মতে; নওশাদ কবীর ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসর কুমিল্লা মধুমিতা কচিকাঁচার মেলা সংবাদ পাঠাতেন। এভাবে তার সাংবাদিকতা চর্চা শুরু হাজার ১৯৭৫-১৯৭৬ সালের কুমিল্লা পূর্বাশা কচিকাঁচার মেলা সদস্য হয়। নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে নিয়োজিত ছিলেন।
তার সাংবাদিক জীবন সম্পর্কে নিতিশ সাহা বলেছেন নিয়েছে বলে মনে হবে কিন্তু তিনি এভাবে করতেন। সাংস্কৃতিক জীবন নওশাদ কবীর মূলত কচি-কাঁচার মেলার একজন একনিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিল। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার বিকাশ এ সংগঠনের মাধ্যমে। কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি ছিলেন ক্রীড়ালেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, তিন নদী পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র কুমিল্লার পরিচালক। এতকিছুর পরও তার শিল্পীসত্তা প্রধান হয়ে উঠত, বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ কার্ডের ডিজাইন ইত্যাদি ছিল শখের কাজ। বস্তুতপক্ষে এসব কাজ করে তিনি অপার আনন্দ অনুভব করতেন। তখন তিনি সৃষ্টির নেশায় বিভোর থাকতেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে পোলিও টিকা প্রদান, শীতবস্ত্র প্রদান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার সুযোগ, রক্তদান কর্মসূচীতে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন । সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ: সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা চৌধুরী লিখেছেন- বছরব্যাপী কচি-কাঁচার মেলার অনুষ্ঠান গুলো তার সহযোগিতায় সম্পাদিত হত। মঞ্চসজ্জা হতে শুরু করে রিহার্সেল এবং যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনে সে ছিল অতুলনীয়। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে সফলতার জন্য তার পরিশ্রম কারো দৃষ্টির আড়াল থাকত না বস্তুত সংস্কৃতি তাকে সংস্কৃতিচর্চা আকৃষ্ট করেছিল। তিনি জানতেন সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
অল্প বয়স থেকেই নওশাদ কবীরের শিল্পের প্রতি ঝোঁক ছিল। ছবি আঁকার জন্য তার মায়ের সূচিকর্ম তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার কনিষ্ঠ বোন জেসমিন সুলতানা শৈশবে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, বিকেল বেলা টা আমি যখন খেলার মাঠে বা ঘরের আশপাশে খেলায় মত্ত নিয়ে ব্যস্ত। তখন অনেকে বলে তাকে মাঠে নামানো যেত না, বলতো আমার জন্য না। এই সময়টা আমার ছবি আঁকবো। আম্মার সূচিকর্মের কাজগুলো নামিয়ে সেগুলোর মত করে এঁকে রং তুলি দিয়ে রাঙিয়ে নিত। আমি খেলা শেষে ঘরে ফিরে সন্ধ্যায় সেগুলো আমাকে দেখতে দিয়ে বলতো, দেখতো কেমন আঁকলাম। আমিও যত দ্রুত উত্তর বলতাম, ঠিক যেন আমার লেখার উন্নত সংস্করণ। তিনি কিশোরকাল থেকেই সাহিত্যচর্চার দিকে মনোযোগী হন। তাঁর হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো। তিনি ছড়া, কবিতা লিখেছেন প্রবন্ধ, অনুসন্ধানী ফিচার, যা তার শিল্পের মনের পরিচয় বহন করে। মোদ্দাকথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মত লেখালেখির মাধ্যমে তার উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছেন
নওশাদ কবীর ছিলেন স্নিগ্ধ স্বভাবের মানুষ। আন্তরিক ব্যবহার পরিহার প্রিয়তা, কৌতুক প্রবণ, দায়িত্বশীলতা ছিল তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তিনি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। এই সম্পর্কে কবি ইকবাল আনোয়ার লিখেছেন; আমরা হরহামেশা বলে থাকি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নাই, সব মানুষ সমান। কিন্তু এসব আমরা বলার জন্যই বলি, নওশাদ লোক দেখানোর জন্য এসব বলত না, বরং বাস্তবে তার আচার আচরণের মধ্যে দেখেছি সে মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ভেদাভেদ করতে না। চা দোকানদার, দিনমজুর, রিক্সাওয়ালা এমন ধরনের লোকদের সঙ্গে তার আপন জনের মত সম্পর্ক ছিল। তাদের সাথে এমন ভাবে কথা বলতো, এমন ভাবে মিশে যেত, এমনভাবে ঘোরাঘুরি করতে যেন, মনে হতো না তাদেরই একজন। তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বদরুল হুদা জেনু লিখেছেন; সকল কাজেই ছিল তার আন্তরিকতার ছাপ। ভাবনায় ছিল অন্তরঙ্গ, মানুষের মঙ্গল কামনা ওর একটা সংবেদনশীল মানসিকতা ছিল। সৃষ্টি আর সেবা সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর অনন্য দৃষ্টান্ত নওশাদ।
নওশাদ কবিরের জীবনের শেষ দিনগুলোতে ‘যুগান্তরের’ সংবাদ সংগ্রহ। অনুসন্ধানী রিপোর্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তার আন্তরিক ব্যবহার ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের জন্য তার বাসাটি মিনি প্রেসক্লাবে পরিণত হয়েছিল। সন্ধ্যায় তার সাংবাদিক বন্ধু ও সহকর্মীরা। তার বাসায় এসে জগতের সব সাংবাদিক এর সাথে ছিল তার হৃদয় পূর্ণ সম্পর্ক। তিনি ২০০৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দাউদকান্দিতে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল যাচ্ছিল।হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা দেয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এভাবে একটি প্রাণ নীরব নিথর হয়ে পড়ে। এভাবেই সাঙ্গ হয়ে যায় নওশাদ কবীরের জীবন। কিন্তু নিষ্প্রভ করতে পারেনি তার কীর্তিকে। তিনি ছিলেন সংস্কৃতি অঙ্গনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রভূত। তিনি কখনো হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি রয়ে গেছেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে, অন্তরে ভালোবাসায়।(সংগ্রহ : নওশাদ কবীর স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা : মামুন সিদ্দিকী)


এই বিভাগের আরো সংবাদ
Translate »
Translate »