পাকশিমুলের আতংক আকবর গ্রেফতার

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধিঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুলের আতংকের নাম আকবর আলী (৪৫)। যার নাম শুনলেই আতকে ওঠেন ওই এলাকার মানুষ।
অনেক অপকর্মের হোতা এই আকবর। ওই এলাকায় ত্রাস আকবর নামেই পরিচিত সে। প্রাণনাশের ভয়ে অনেকে মুখ খোলার সাহস পায় না।

সম্প্রতি পাকশিমুলে দেলোয়ার নামের এক যুবকের খুনকে পুঁজি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে সে। রয়েছে নারী নির্যাতনেরও অভিযোগ। মামলার চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় সপ্তাহ দিন আগে মলু মিয়া (৩০) নামের এক লোককে তার অফিসে এনে পিটিয়েছে।

আকবরের কু দৃষ্টির কারণে ২ বোনের ইজ্জত রক্ষায় চরম বেকায়দায় থাকার কথা জানিয়েছেন এক ভাই। আকবরের বিরূদ্ধে ১ কোটিরও বেশী টাকা মূল্যের মালামাল লুটের অভিযোগে থানায় মামলা করেছেন আয়েশা নামের এক মহিলা।

অবশেষে সরাইল থানা পুলিশ গত শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে সেই আকবরকে গ্রেপ্তার করেছে। আকবর গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছেন পাকশিমুল ও অরুয়াইলের নারী পুরুষ।

পুলিশ, মামলার এজহার ও স্থানীয় ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, রহমত আলীর ছেলে আকবর। লেখাপড়া করেছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেপরোয়া হতে থাকে সে। একসময় সালিসকারকের তকমা লাগান। ফাঁকে সুদের ব্যবসায়ও ছিলো রমরমা । জুয়ার আসরে চড়া সুদে টাকা দেয়াতেও আকবরের জুড়ি নেই। একসময় মোতালিব মেম্বারের নেতৃত্বে আকবর গড়ে তুলে শক্তিশালী একটি গ্রুপ । ডাকাত দলের একাধিক সদস্যের সাথে তার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। পুলিশের সাথে সখ্যতার দোহাই দিয়ে দালালি তার আরেক পেশা।

দীর্ঘ দিন ধরে নদী দখল করে প্রকাশ্যে করছে বালুর ব্যবসা। গত ৭ মার্চ এক ঘটনায় মোতালিব মেম্বারের গোষ্ঠীর সিএনজি চালক দেলোয়ার খুন হয়। ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ৩৮ জনের বিরূদ্ধে দেয়া হয় হত্যা মামলা। গ্রামছাড়া হয়ে পড়ে আসামি ও তাদের স্বজনরা।

এই সুযোগে আকবর ও ইউপি সদস্য মোতালিবের নেতৃত্বে আসামি ও তাদের স্বজনদের বাড়ি ঘরে চলছে ভাংচুর লুটপাট। পুরুষ শুন্য পরিবারের নারীদের প্রতি মূহুর্ত কাটছে নিরাপত্তাহীনতায়। ইতোমধ্যে একজন নারীকে নির্যাতনের অভিযোগও ওঠেছে।

প্রতিপক্ষের তান্ডবের ভয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার এখন বাড়ি ঘর ছাড়া। মামলার ভয় দেখিয়ে চলছে টাকা কামাই।

তবে সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম বলেন, এসব মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনার দিন উত্তেজিত লোকজন সামান্য ভাংচুর করেছিল। এরপর আর কিছু হয়নি।

সরজমিনে দেখা যায়, জনমানব শুন্য বসত ঘর গুলোতে অগণিত ক্ষত চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা জানালা ভাঙ্গা। বেড়ার টিন গুলো কোথাও কাটা কোথাও ফুটো। কোন মালামাল নেই। কাঁচের ভাঙ্গা টুকরোতে সয়লাব মেঝগুলো। অনেক কক্ষে কুকুর ঘুমোচ্ছে।

দেলোয়ার নিহত হওয়ার পরই রাতে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে ফেলে। সকল মালামাল লুটে নেয় প্রতিপক্ষের । ছেলে এবং বাড়ির বউরা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কোন রকমে পালিয়ে বাঁচে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নারী পুরুষ বলেন, আসামি হওয়া ও বাড়িঘর রক্ষার দোহাই দিয়ে ইউপি সদস্য মোতালিব, নদী দখল করে বালুর ব্যবসায়ি আকবর ও শাহেদ আলীর নেতৃত্বে চলছে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজী। আকবরকে অনেকে পুলিশের সোর্স হিসেবে চিনেন। চাঁদার পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত। প্রকাশ করলে দেয়া হচ্ছে মারধরের হুমকি। কয়েকজন গৃহবধূকে পানিতে ফেলে স্বাস্তিও দেয়া হয়েছে। একাধিক নারীর উপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। অনেক নিরীহ লোকজনকেও বাড়িতে আসতে টাকা গুণতে হচ্ছে। অনেকে টাকা দিয়েও আসতে পারছেন না।

ছাদেক মিয়া নামের এক ব্যক্তি তার ভাগিনা রেজাউলের মাধ্যমে মোতালিব মেম্বারের কাছে ৬০ হাজার টাকা পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। এমন আরো অনেকেই রয়েছেন তারা ভয়ে মুখ খুলছেন না।

৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোতালিব বলেন, চাঁদাবাজী ও ভাংচুরের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। আমাদের কোন লোক এ ঘটনার সাথে যুক্ত নয়। তারা নিজেদের মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে ভূয়া অভিযোগ করছেন।
হত্যা মামলার বাদী নাজমা বেগম বলেন, আসামীর সংখ্যা আমি বলতে পারব না। আমি অসুস্থ্য।

অবশেষে আয়েশা বেগম নামের এক মহিলা ১৭ বাড়ি ভাংচুর লুটপাট করে ২ কোটিরও অধিক টাকা মূল্যের মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগে আকবরকে প্রধান আসামি করে মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে সরাইল থানায় একটি এজহার জমা দিয়েছেন। এজহার জমা দেয়ার পরই গত শুক্রবার রাতে পাকশিমুলে অভিযান চালিয়ে ত্রাস আকবরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আকবর তান্ডবে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন যারা। তারা হলেন- লম্বাহাটি এলাকার নোয়াজ আলী, মহব্বত আলী ও তাজু মিয়া। আগুনে পুড়িয়েছে বালুর মাঠ এলাকার আবুল মিয়া ও পলা মিয়া। সড়কের পাশের তমিজ উদ্দিন, আজম উদ্দিন, জাহেদ আলী, মুস্তব আলী, শের আলী, হরজত আলী, মাসুক মিয়া, আসিদ মিয়া ও আবদুর রশিদের বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে।

উল্লেখ্য : ইউপি সদস্য মোতালিব ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান সাইফুলের ঘনিষ্টজন। বছর দিন আগে বিরোধপূর্ণ কোটি টাকা মূল্যের ২৫ শতক জায়গা ক্রয় করে ঝামেলার সৃষ্টি করেন। এ ঘটনায় চেয়ারম্যন সঠিক কথা বলায় বেঁকে বসেন মোতালিব মেম্বার। তিনি চলে যান আবুল কাশেমের দলে। আধিপত্য ও নির্বাচনকে ঘিরে সাইফুল ইসলাম ও কাশেমের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। গত ৭ মার্চ এক সংঘাতে মোতালিব মেম্বারের গোত্রের দেলোয়ার খুন হয়। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান সাইফুলকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৮ জনের বিরূদ্ধে হত্যা মামলা হয়। রয়েছে গংও। চেয়ারম্যান এখন এলাকা ছাড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *