বিজ্ঞাপন
মুক্তিকামী জনতার দৈনিক 'মুক্তির লড়াই' পত্রিকার জন্য জরুরী ভিত্তিতে দেশের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে ব্যুরো চীফ, প্রতি জেলা ও উপজেলার একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহীরা আবেদন করুন। যোগাযোগের ঠিকানাঃ কামরুজ্জামান জনি- সম্পাদক, মুক্তির লড়াই। ইমেইলঃ jobmuktirlorai@gmail.com । ধন্যবাদ ।

বিশ্ববিদ্যালয়সমুহে ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত ও এককেন্দ্রিক করা সময়ের দাবী.মু. নজরুল ইসলাম তামিজী

Muktir Lorai / ২৪ বার ভিউ করা হয়েছে
বাংলাদেশ সময় রবিবার, ১২ জুন, ২০২২

শিক্ষায় কিছু দৃশ্যমান সাফল্য বাংলাদেশের বড় অর্জন। এই অর্জন এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। আফ্রিকা বা অনগ্রসর দেশগুলো যখন শিক্ষায় ছেলেমেয়ের সমতা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুই স্তরেই ছেলেমেয়ের সেই সমতা অর্জন করে ফেলেছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, এখন প্রাথমিকে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫১ শতাংশ, যা মাধ্যমিকে প্রায় ৫৪ শতাংশ। এটি বিশ্বে নজর কেড়েছে। আশার বিষয়, এই অর্জনের ধারা অব্যাহত আছে। এখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে।

শিক্ষার অনেক বিষয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ১৫ বছর আগেও প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা মূলধারায় ছিল না, সেটি মূলত উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডারগার্টেনেই কেবল প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হতো। এখন প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়েছে।

কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা মুুলত ভর্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। এটা এককেন্দ্রিক হলে আমাদের অর্জনের পাল্লা আরো ভারী হবে।

সমন্বিত ও এককেন্দ্রিক পদ্ধতির পরীক্ষার দাবি মূলত একই প্রশ্নপত্রে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার দাবি । এ পদ্ধতিতে কোনো শিক্ষার্থী তার পছন্দমত যে কোন একটিতে কিংবা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে তার নিজ জেলা বা সুবিধামতো একটি স্থান বেছে নিতে পারবে। অর্থাৎ, কেউ চাইলে কুমিল্লায় বসেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ঢাকায় বসেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। কে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আবেদন করেছেন, সেই হিসাবে আলাদা আলাদা মেধাতালিকা করা হবে। ফলাফল যাচাই ও ফল নির্ধারণ করা হবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেদের মানদণ্ড অনুযায়ী। এর মাধ্যমে যেমন শিক্ষার্থীরা পাবেন সুবিধাজনকভাবে কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ, একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদের নিয়মনীতি ও ফলাফল নির্ধারণের পদ্ধতির কোনো রকম পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে না। এ পদ্ধতির পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কর্তৃপক্ষ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দায়িত্ব পালন করবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত ও এককেন্দ্রিক করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান ব্যবস্থায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষকদের এ বিষয়ে ভাববার সময় এখনই।

এ যুগের অসহায় অভিভাবক আর উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশীদের বড় অংশ এ অবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই দায়ী করেন। সাধারণ অভিভাবক আর শিক্ষার্থী যতই করুণ দশায় নিপতিত হোক না কেন, অনেকের মতে আমরা শিক্ষকরা কল্পতরু আর সুবিধার বৃক্ষ থেকে নিচে নামতে চাই না। অবশ্য অনেক শিক্ষক মনে করেন তারা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রতিটি পরীক্ষার্থীর নাড়ি টিপে টিপে যোগ্যজনকে খুঁজে বের করবেন।

ভর্তি পরীক্ষার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কাব্য গ্রন্থের পরিচিত লাইনটি বারবার মনে পড়ে। ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী।’ যেখানে আমাদের ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের ধারণ করতে হলে মাঝ সমুদ্রে নোঙর করা মাদারশিপের দরকার, সেখানে আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণক্ষমতা এক করলেও একটি ছোট ফিডার জাহাজ ভরবে না। এখন মেধা নয়- লটারির মতো হয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টিকিট পাওয়া।

কেউ কেউ মনে করেন,প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। শিক্ষকরা তাদের প্রয়োজনীয় মেধাবী শিক্ষার্থী বেছে নেবেন। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় সেই সুযোগ থাকবে না। পৃথক ভর্তি যুদ্ধের নানা ক্ষতি থাকলেও তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ গ্রহণ করে নিজ পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় সে সুযোগ থাকবে না বলে কেউ কেউ মনে করেন ।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেকগুণ বেশি ভর্তির সুযোগ রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি কলেজগুলোতে। সেখানেও প্রতিযোগিতা খুব কম নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এত ছোটাছুটি করতে হয় না। কিন্তু বাস্তবতা বুঝতে না পেরে অনেক ভর্তি যুদ্ধে নামা শিক্ষার্থী ভুল করে দু’কূলই হারায়।

স্বাভাবিকভাবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আশা করে, স্বপ্ন দেখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বে। তাই অবহেলা করে কলেজের ফরম তোলে না। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে সে সময়ও উতরে যায়। শেষ পর্যন্ত দু’কূল হারিয়ে হতাশায় নিপতিত হয়। তখন দরজা অবারিত থাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। এখানেও অভিভাবকদের সাধ্যের প্রশ্ন রয়েছে।

যাদের অগাধ সাধ্য তারা প্রথম শ্রেণির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে না হয় ভর্তি হতে পারে; কিন্তু কম সাধ্যের অভিভাবক বাধ্য হন মাঝারি ও নিু মাঝারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি করাতে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশের লেখাপড়ার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও সবাই ঠাঁই পায় না। অনেকেই হতাশ হয়ে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে।

ভর্তি পরীক্ষায় ফরম তোলার যোগ্যতা যাদের আছে, আমি বিশ্বাস করি তাদের যে কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দিলে সে সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে পারবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দোকানের ঝাপ খুলে প্রত্যেকের নাড়ি-নক্ষত্র জেনে ভর্তি করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

এর ভেতর বাস্তব চিন্তা যতটা না আছে তার চেয়ে বেশি আছে অমানবিক বাণিজ্য চিন্তা। আর আমাদের রাজনীতির বলয়বন্দি মানসিকতায় শিক্ষাবিদের চেয়ে আমলা আর নেতা-মন্ত্রীদের বিবেচনায় এক এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারিত হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে। এখন শিক্ষার নীতিনির্ধারণে সবাই রাজা। তাই ইচ্ছামতো পাল্টে যাচ্ছে পরীক্ষা পদ্ধতি।

প্রতিযোগিতা দিয়ে জিপিএ-৫ আর স্বর্ণখচিত পাঁচের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পিইসি-জেএসসির মতো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষায় শিশু শিক্ষার্থীদের ফেলে দিয়ে কোচিং আর গাইড বইয়ে অভ্যস্ত করে ফেলা হচ্ছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত ও এককেন্দ্রিক করার বিষয়টি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় এনে বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

প্রাবন্ধিক : মু. নজরুল ইসলাম তামিজী, সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকার তাত্ত্বিক, শিকড়সন্ধানী লেখক ও চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটি


এই বিভাগের আরো সংবাদ
Translate »
Translate »