বিজ্ঞাপন
মুক্তিকামী জনতার দৈনিক 'মুক্তির লড়াই' পত্রিকার জন্য জরুরী ভিত্তিতে দেশের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে ব্যুরো চীফ, প্রতি জেলা ও উপজেলার একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহীরা আবেদন করুন। যোগাযোগের ঠিকানাঃ কামরুজ্জামান জনি- সম্পাদক, মুক্তির লড়াই। ইমেইলঃ jobmuktirlorai@gmail.com । ধন্যবাদ ।

শিক্ষায় পরিবর্তন, শিক্ষাক্রমের রূপরেখা অনুমোদন : প্রাসংগিক ভাবনা

Muktir Lorai / ৮৫ বার ভিউ করা হয়েছে
বাংলাদেশ সময় বুধবার, ১ জুন, ২০২২

মু.নজরুল ইসলাম তামিজীঃ

গত ৩০ মে সোমবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) যৌথ সভায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় রকমের পরিবর্তন এনে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখার অনুমোদন দেওয়া হয়। যদিও এই অনুমোদন কেবলই আনুষ্ঠানিকতা। কারণ, ইতিমধ্যেই মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নও শুরু হয়ে গেছে। এমনকি প্রাথমিক স্তরে বিস্তারিত শিক্ষাক্রমও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) বাস্তবায়ন শেষে আগামী বছর থেকে বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম পর্যায়ক্রমে চালু হবে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি; ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণি; ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে চালু হবে নতুন শিক্ষাক্রম। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের একাদশ শ্রেণিতে ২০২৬ সালে এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ২০২৭ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে।

নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিদ্যমান পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (শিখনকালীন) বেশি হবে। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা হবে না, পুরোটাই মূল্যায়ন হবে সারা বছর ধরে চলা বিভিন্ন রকমের শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। পরবর্তী শ্রেণিগুলোর মূল্যায়নের পদ্ধতি হিসেবে পরীক্ষা ও ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রম—দুটোই থাকছে।

নতুন শিক্ষাক্রমে এখনকার মতো এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে না। শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে হবে এসএসসি পরীক্ষা। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে এখন থেকে শিক্ষার্থীরা দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন সিলেবাসে পড়বে। আর শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, মানবিক না বাণিজ্য বিভাগে পড়বে, সেই বিভাজন হবে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে। খুবই ভালো কথা; তাহলে সবাই মিলে অভিন্ন কারিকুলাম, অভিন্ন শিক্ষাক্রমের আওতায় আসবে। কিন্তু তার জন্য আমাদের শিক্ষকরা প্রস্তুত হচ্ছেন কিনা, তার প্রশিক্ষণটা যথাযথ কিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনমাফিক বিজ্ঞানাগার আছে কিনা, পাঠাগার আছে কিনা এগুলো দেখতে হবে। একই সঙ্গে বারবার এটাও বলা হচ্ছে, এক্সট্রা কারিকুলার বা কো-কারিকুলার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে- তার জন্য খেলার মাঠ আছে কিনা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছেন কিনা, চারু ও কারুকলার জন্য শিক্ষক আছেন কিনা ইত্যাদি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। আর শিক্ষা ব্যবস্থাপনা যেটি আছে সেটি যদি অসম্ভব রকমের কেন্দ্রীভূত হয়, বিকেন্দ্রীকরণ না থাকে, সেখানে শিক্ষকদের দক্ষতা বা কর্মনিষ্ঠার অভাব না থাকলেও; তার জবাবদিহিতার ব্যাপারে স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের তেমন কিছু করার থাকে না। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে শিক্ষাক্রম অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।

শিক্ষার যে গুণগত মানের কথা বলা হচ্ছে তা নিশ্চিত করতে হলে একটি অগ্রসরমুখী শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তকেও যথাযথভাবে আসতে হবে। এমনভাবে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে একেবারে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ধারাবাহিকতাটা বজায় রাখা যায়। প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী যখন ক্লাস ওয়ানে পড়বে, তখন তাকে যেন হোঁচট খেতে না হয়। এখন পঞ্চম শ্রেণির পরে যারা যষ্ঠ শ্রেণিতে যায় তাদের একটা বিশাল লংজাম্প দিতে হয়। এর কারণ এখানে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। তবে এর একটি প্রয়াস নতুন শিক্ষাক্রমে রয়েছে। বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের বয়স উপযোগী, মেধা ও মননের উপযোগী বইপুস্তক তৈরি করতে হবে। এখানে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার একটি প্রয়াস আমরা লক্ষ করছি।

উন্নত দেশগুলোতে ক্রমাগত কারিকুলাম সংস্কার করা হয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, জনগোষ্ঠীর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রমাগত পরিবর্তন করা হয়। সেখানে একটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়, যেমন- শিক্ষার্থীদের বয়স যদি দশ বছর হয়, তাহলে তাকে পনেরো বছরের শিক্ষা উপাদান দেয়া যাবে না।নতুন এ জাতীয় শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তোলা। একই সাথে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়া কমানো। শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ পাঠগ্রহণ শেষ করতে পারা নিশ্চিত করা; অর্থাৎ পুরো শিক্ষাক্রম হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। এ প্রসঙ্গে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘আনন্দময় পড়াশোনা হবে। বিষয়বস্তু ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও চাপ কমানো হবে। গভীর শিখনে গুরুত্ব দেয়া হবে। মুখস্থ নির্ভরতার বিষয়টি যেন না থাকে, এর বদলে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শেখাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে খেলাখুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ক্লাস শেষে যেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা বা অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ কমে গেছে, এটি যেন না হয়। জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাক্রমের আওতায় যে পাঠ্যপুস্তকগুলো আছে- সেগুলো অনেক সময় শিক্ষার্থীদের কেবল ভারাক্রান্তই করে না; তাদের জন্য রীতিমতো বোঝা হয়ে যায় এবং বহন করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। এর জন্য মহামান্য আদালতকে পর্যন্ত নির্দেশনা দিতে হয় যে, একজন শিক্ষার্থীর ওজনের দশ পার্সেন্টের বেশি বইপুস্তক দেয়া যাবে না। বয়স উপযোগী, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তকের বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে; তবে সেটা কোন বয়সে করতে হবে, কতটুকু করতে হবে- সুনির্দিষ্ট করে যদি প্রতিফলিত না হয়, তাহলে যে পরিবর্তনটা ইতিবাচক মনে করা হচ্ছে, সেটা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে পারে।

নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১০ ধরনের শেখার ক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলো ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। প্রাক্-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য আলাদা বই থাকবে না, শিক্ষকেরাই শেখাবেন। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে। প্রতি বর্ষ শেষে বোর্ডের অধীনে এই পরীক্ষা হবে। এরপর এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক শিক্ষা প্রশাসন এ পদ্ধতি কতটা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন সে বিষয়ে কোন সার্ভে কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে কিনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি।

১০ বছর পুর্বে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হলো। এটি ছিল সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষানীতি, যেটি জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছিল এবং আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে, এটি বাস্তবায়ন হবে, কিন্তু তা হয়নি। জাতীয় শিক্ষা কমিশন করার যে দিকনির্দেশনা ছিল, তা যদি আমরা করতে পারতাম, তাহলে আজ আমরা এই যে শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা এবং পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি- এর মূল দায়িত্বটা নিতে পারত শিক্ষা কমিশন।

লেখক : মু. নজরুল ইসলাম তামিজী, চেয়ারম্যান : জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটি। শিকড় সন্ধানী লেখক, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিশ্লেষক ও মানবাধিকার তাত্ত্বিক।


এই বিভাগের আরো সংবাদ
Translate »
Translate »