মানবিক জীবনে ফিতরা বা ফিতরের যাকাতের গুরুত্ব… মুফতী মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ী

ফিতরা আরবী শব্দ অর্থ ভাঙ্গা বা ভঙ্গ করা। বাংলা উচ্চারণে ফিতরাকে ফেতরা বলা হয়। রোজার সমাপনের দিন বা উপবাস ভঙ্গের দিন সকালে দান (সদকা) দেওয়া হয় বলে এর নাম ফিতরা। অর্থাৎ যাকাতুল ফিতর (ফিতরের যাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) নামে পরিচিত ফিতর বা ফাতুর বলতে ভোরের খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয়, যা দ্বারা রোজাদারগণ রোজা ভঙ্গ করেন। যাকাতুল ফিতর বলতে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হতদরিদ্র গরীব দুঃস্থদের মাঝে রোজাদারদের বিতরণ করা দানকেই বুঝানো হয়। রোজা বা উপবাস পালনের পর সন্ধ্যায় ইফতার বা সকালের খাদ্য গ্রহণ করা হয়। সেজন্য রমজান মাস শেষে এই দানকে যাকাতুল ফিতর বা সকাল‌ের আহারের যাকাত বলা হয়। ফিতরা দ্বারায় রোজার ত্রুটিবিচ্যুতি মার্জন হয় এবং গরীব মানুষ ঈদের আনন্দে সামিল হতে পারে। তবে ফিতরার ভিন্ন অর্থও আরবী অভিধানে লক্ষনীয়-যথা ফিতর অর্থ মূল, সৃষ্টি ও ব্যক্তিসত্তা। যেহেতু সব মুসলিম ব্যক্তিকেই সদকা আদায় করতে হয়, তাই এর নাম সদকাতুল ফিতর। তাছাড়াও মানবতায় ফিতরা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। রমজানের রোজা পালন করতে পারার শুকরিয়াস্বরূপও বটে। পরিভাষায় সদকা মানে দান ফিতরা রোজার সমাপন।অর্থাৎ সদকাতুল ফিতর হলো রোজা সমাপনান্তে ঈদুল ফিতরের সকালবেলায় শুকরিয়া অনন্দ উৎসবের নির্ধারিত দান(সদকা)।

নারী-পুরুষ, স্বাধীন-পরাধীন, শিশু-বৃদ্ধ, ছোট-বড় সকল মুসলিমের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। ইবনে উমর থেকে জানা যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক স্বাধীন-ক্রতদাস, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় মুসলমানের যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন এক ‘ছা ‘পরিমাণ খেজুর বা যব ওয়াজিব করেছেন। তিনি লোকদের ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। সাদকাতুল ফিতর সম্পাদনা করা প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সকলের জন্য ফরয। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, ইবনে ওমর বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতের ক্রীতদাস ও স্বাধীন, নারী ও পুরুষ, ছোট ও বড় সকলের উপর মাথা পিছু এক ছা‘ পরিমাণ খেজুর বা যব যাকাতুল ফিৎর হিসাবে ওয়াজিব করেছেন এবং তা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন’। ঈদের দিন সকালেও যদি কেউ মৃত্যুবরণ করেন, তার জন্য ফিৎরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। আবার ঈদের দিন সকালে কোন বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হ’লে তার পক্ষ থেকে ফিৎরা আদায় করা ওয়াজিব। ছাদাক্বাতুল ফিতর হ’ল জানের ছাদাক্বা, মালের নয়। বিধায় জীবিত সকল মুসলিমের জানের ছাদাক্বা আদায় করা ওয়াজিব। কোন ব্যক্তি ছিয়াম পালনে সক্ষম না হ’লেও তার জন্য ফিৎরা ওয়াজিব। ফিতরা পাবে, গরীব, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্থ ব্যক্তিকে ফিতরা প্রদান করা যাবে। বেতনভুক্ত কাজের ব্যক্তির পক্ষে ফিতরা প্রদান করা মালিকের উপর আবশ্যক নয়। তবে মালিক ইচ্ছে করলে কাজের লোককে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন। তবে তিনি বেতন বা পারিশ্রমিক হিসেবে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন না । যা দিয়ে ফিতরা দেয়া যাবে তা সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ বলেন, “আমরা-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যাকাতুল ফিতর বের করতাম এক সা খাদ্য দ্রব্য কিংবা এক সা যব কিংবা এক সা খেজুর কিংবা এক সা পনীর কিংবা এক সা কিশমিশ। এই হাদীসে খেজুর ও যব ছাড়া আরও যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হল: কিশমিশ, পনীর এবং খাদ্য দ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিগত হওয়ার পরে মুআবীয়া (রাযিঃ)-এর খেলাফতে অনেকে গম দ্বারাও ফিতরা দিতেন। তাই মানবিক জীবনে ফিতরা বা ফিতরের যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম।

সাদকাতুল ফিতরের পরিমাণ প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু এক ছা‘ খাদ্যশস্য যা তুল্য ফিৎর হিসাবে বের করতে হবে। ‘ছা’ হচ্ছে তৎকালীন সময়ের এক ধরনের ওযন করার পাত্র। নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগের ছা‘ হিসাবে এক ছা‘-তে সবচেয়ে ভাল গম ২ কেজি ৪০ গ্রাম হয়। বিভিন্ন ফসলের ছা‘ ওযন হিসাবে বিভিন্ন হয়। এক ছা‘ চাউল প্রায় ২ কেজি ৫০০ গ্রাম হয়। তবে ওযন হিসাবে এক ছা‘ গম, যব, ভুট্টা, খেজুর ইত্যাদি ২ কেজি ২২৫ গ্রামের বেশি হয়। ইরাকী এক ছা‘ হিসাবে ২ কেজি ৪০০ গ্রাম অথবা প্রমাণ সাইজ হাতের পূর্ণ চার অঞ্জলী চাউল। বর্তমানে আমাদের দেশে এক ছা‘তে আড়াই কেজি চাউল হয়। অর্ধ ছা‘ ফিতরা আদায় করা সুন্নাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *