যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে নির্যাতন

পাভেল মিয়া, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ কিশোর বয়সে পরিণয়। সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে পরিণয় থেকে বিয়ে। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর ভাঙতে বেশিদিন সময় লাগেনি। মুক্ত বাতাসে প্রেমিকের বিভোর করা স্বাপ্নিক জীবনের আশ্বাস যে প্রলোভন ছিল তা বিয়ের কয়েক মাসেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আচরণ পাল্টে যায় প্রেমিক থেকে স্বামী হওয়া মানুষটির। মানসিক নির্যাতনের সঙ্গে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। তারপরও দাঁতে দাঁত চেপে সয়ে যাওয়ার পণ করেন ওই নববধূ। এরই মধ্যে বছর ঘুরতে না ঘুরতে গর্ভে আরও এক প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করেন তিনি। মা হওয়ার স্বপ্নে আবারও বিভোর হয়ে পড়েন। কিন্তু থেমে থাকেনি নির্যাতন। তারপরও ভেবেছেন, হয়তো সন্তানের জন্ম হলে মায়ায় পড়ে নির্যাতন বন্ধ হবে। ফুটফুটে ছেলে সন্তানের জন্ম হলে খুশির ঝলকে নির্যাতনে কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে যায় সবকিছু। যৌতুকের দাবিতে কথায় কথায় চলতে থাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, নষ্ট করা হয় গর্ভের সন্তান।

এমনই রোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষমেশ আইনের আশ্রয় নিয়েছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণী ইউনিয়নের স্কুল শিক্ষক মেসবাহুল আজমের মেয়ে তামান্না বেগম (২২)। তার অভিযোগ, মামলা করলেও আসামি গ্রেফতারে টালবাহানা করছে পুলিশ। এ নিয়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তামান্না বেগমের স্বামীর নাম নাইমুল ইসলাম লিমন (২৬)। তিনি উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের দাড়িকা গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে।

নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূ জানান, প্রেমের বিয়ে হলেও বিয়ের কিছুদিনের মাথায় তিনি জানতে পারেন তার স্বামী মাদকাসক্ত। এ নিয়ে বাধা দিতে গেলে তার ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। তারপর শুরু হয় যৌতুকের চাপ। প্রথম সন্তানের জন্ম হলে মুখ বুজে সব সহ্য করলেও যৌতুকের চাপে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। স্বামীর সঙ্গে যোগ দেন শ্বশুরও। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাবার বাড়িতে ফিরে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে চাইলে উভয় পরিবারের আলোচনায় ‘মীমাংসা’ করে আবারও সংসার শুরু করেন তিনি। কিন্তু সাময়িক বিরতি দিয়ে আবারও নির্যাতন শুরু হয়।

তামান্না বলেন, ‘স্বামী তো মারেই, সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়িও ছাড় দেন না। একদিন শ্বশুর রড দিয়ে আঘাত করে আমার বাঁ হাতের হাড় ভেঙে দেন। অসহনীয় নির্যাতনে বাবার বাড়ি চলে গেলে পরবর্তী সময়ে আবারও লিখিত অঙ্গীকারনামায় সমঝোতা করে আমাকে স্বামীর সংসারে নিয়ে আসা হয়। তারপর কিছুদিন পর আবারও যৌতুক চেয়ে নির্যাতন শুরু হয়। এর মধ্যে আমি দ্বিতীয় বারের মতো অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা জানার পর আমার স্বামী আমাকে সন্তান নষ্ট করার চাপ দিতে থাকে। আমি রাজি না হলে গত ২১ এপ্রিল আমাকে মারতে শুরু করে। এ সময় আমার শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে বাধা না দিয়ে উল্টো তাকে সহায়তা করতে থাকেন। আমার স্বামী তলপেটে আঘাত করলে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তারা আমাকে চিকিৎসার কথা বলে উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একজন ধাত্রীর মাধ্যমে জোর করে গর্ভপাত করায়। আমার গর্ভের সন্তানকে হত্যা করে।’

নির্যাতনের শিকার এই গৃহবধূ আরও বলেন, ‘গর্ভপাতের কারণে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে আমি বিষয়টি আমার বাবা-মাকে জানাই। খবর পেয়ে আমার বাবা আমাকে ওই নরক থেকে উদ্ধার করে উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে গত ২৬ এপ্রিল আমি থানায় মামলা করি।’

‘কিন্তু এখন মামলা তুলে নিতে আমাকে ও আমার পরিবারকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলা হলেও আসামি গ্রেফতারে টালবাহানা করছে পুলিশ। তাহলে কোথায় আশ্রয় চাইবো!’ অভিযোগ করেন এই গৃহবধূ।

স্ত্রীকে নির্যাতনের ব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত স্বামী নাইমুল ইসলাম লিমনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল ভুক্তভোগী গৃহবধূ বাদী হয়ে উলিপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলা নং-২২। এতে আসামি হিসেবে গৃহবধূর স্বামী নাইমুল ইসলাম লিমন ও শ্বশুর আব্দুল হামিদসহ চার জনের নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার পর প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনও কোনও আসামিকে গ্রেফতার করেনি। ভুক্তভোগী গৃহবধূর অভিযোগ, আসামিপক্ষ টাকার বিনিময়ে পুলিশকে থামিয়ে রেখেছে।

উলিপুর থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) ইমতিয়াজ কবির মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আসামি গ্রেফতারে গড়িমসির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত চলছে। সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য নেওয়ার পাশাপাশি আসামি গ্রেফতারে চেষ্টা করছে পুলিশ।’

গর্ভপাতের বিষয়ে সত্যতা পাওয়ার প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। তাদের মতামত পেলে এ নিয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *