২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের অবসান একদিনে ঘটেনি। ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক সংগ্রাম আর অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করেছে স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ, যার প্রতীক আজকের লাল-সবুজ পতাকা। এই ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় অধ্যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-যা বাঙালির কাছে চিরকাল ‘কালো রাত’ হিসেবে পরিচিত।
১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বাঙালি জাতির ওপর চালায় সুপরিকল্পিত গণহত্যা। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আকাশ ভারী হয়ে ওঠে গোলাগুলি, আগুন আর মানুষের আর্তচিৎকারে। একযোগে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট-বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
এই হত্যাযজ্ঞের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ জনগণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চালানো হয় সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ। জগন্নাথ হল, ইকবাল হলসহ বিভিন্ন ছাত্রাবাসে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। শিক্ষকদের বাসভবনেও হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় বহু গুণীজনকে। জ্ঞানচর্চার এই পীঠস্থান রাতারাতি পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।
একই সময়ে আক্রমণ হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস-এ। বাঙালি পুলিশ সদস্যরা সীমিত অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ভারী অস্ত্রের মুখে তারা শহীদ হন। পিলখানা-এ ইপিআর সদস্যদের ওপরও চালানো হয় নির্মম হামলা। প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা ধ্বংস করে দেওয়া হয় পরিকল্পিতভাবে।
পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও চলে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। ঘরবাড়িতে আগুন, রাস্তায় লাশের সারি-এক রাতেই ঢাকাকে পরিণত করা হয় মৃত্যুপুরীতে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, শুধু এই রাতেই কয়েক হাজার থেকে এক লক্ষ পর্যন্ত মানুষ নিহত হতে পারেন। যদিও সঠিক সংখ্যা আজও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবে এ কথা নিশ্চিত-এই রাত ছিল মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ।
এই হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়েই শুরু হয় দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। এই সময়ে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালি প্রাণ হারান, অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হন এবং কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে দেশত্যাগে বাধ্য হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই গণহত্যার ব্যাপকতা হলোকাস্ট কিংবা রুয়ান্ডার গণহত্যা-এর মতোই ভয়াবহ।
২৫ মার্চের আগে থেকেই চলছিল উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও ক্ষমতা না পাওয়ায় বাঙালির মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। মার্চজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গোপনে প্রস্তুতি নেয় বাঙালিকে দমনে চূড়ান্ত অভিযানের।
২৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। রাত নামতেই শুরু হয় অভিযান। ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ভারী অস্ত্রের মুখে তা ভেঙে যায়। এরপরই ছড়িয়ে পড়ে আগুন, গুলি আর মৃত্যুর মিছিল।
এই রাতেই ধানমন্ডি ৩২ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমান-কে। তবে গ্রেপ্তারের আগেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান, যা পরবর্তীতে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘোষণাই বাঙালিকে সংগঠিত করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে।
পাকিস্তানি বাহিনী চেষ্টা করেছিল এই হত্যাযজ্ঞের খবর বিশ্ব থেকে গোপন রাখতে। কিন্তু বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিশ্ববাসী জানতে পারে এই নির্মমতার কথা। আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয় প্রতিবাদ, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ স্বীকৃতি বা পদক্ষেপ আসেনি।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সাল থেকে ২৫ মার্চকে জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এই দিনটি এখনো গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। এর প্রধান কারণ হলো-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিভিন্ন দেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি।
২৫ মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়-এটি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের সূচনা। এই রাতের বিভীষিকা বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং ঐক্যবদ্ধ করেছে স্বাধীনতার লড়াইয়ে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
আজও সেই শহীদদের রক্তের দাগ বহন করে আমাদের জাতীয় পতাকা। তাই ২৫ মার্চ আমাদের শোকের দিন, স্মরণের দিন এবং প্রতিজ্ঞার দিন-যেন ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় কখনো বিস্মৃত না হয়, এবং বিশ্ব একদিন এই গণহত্যাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেয়।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মার্চ ২০২৬
২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের অবসান একদিনে ঘটেনি। ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক সংগ্রাম আর অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করেছে স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ, যার প্রতীক আজকের লাল-সবুজ পতাকা। এই ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় অধ্যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-যা বাঙালির কাছে চিরকাল ‘কালো রাত’ হিসেবে পরিচিত।
১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বাঙালি জাতির ওপর চালায় সুপরিকল্পিত গণহত্যা। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আকাশ ভারী হয়ে ওঠে গোলাগুলি, আগুন আর মানুষের আর্তচিৎকারে। একযোগে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট-বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
এই হত্যাযজ্ঞের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ জনগণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চালানো হয় সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ। জগন্নাথ হল, ইকবাল হলসহ বিভিন্ন ছাত্রাবাসে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। শিক্ষকদের বাসভবনেও হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় বহু গুণীজনকে। জ্ঞানচর্চার এই পীঠস্থান রাতারাতি পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।
একই সময়ে আক্রমণ হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস-এ। বাঙালি পুলিশ সদস্যরা সীমিত অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ভারী অস্ত্রের মুখে তারা শহীদ হন। পিলখানা-এ ইপিআর সদস্যদের ওপরও চালানো হয় নির্মম হামলা। প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা ধ্বংস করে দেওয়া হয় পরিকল্পিতভাবে।
পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও চলে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। ঘরবাড়িতে আগুন, রাস্তায় লাশের সারি-এক রাতেই ঢাকাকে পরিণত করা হয় মৃত্যুপুরীতে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, শুধু এই রাতেই কয়েক হাজার থেকে এক লক্ষ পর্যন্ত মানুষ নিহত হতে পারেন। যদিও সঠিক সংখ্যা আজও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবে এ কথা নিশ্চিত-এই রাত ছিল মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ।
এই হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়েই শুরু হয় দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। এই সময়ে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালি প্রাণ হারান, অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হন এবং কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে দেশত্যাগে বাধ্য হন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই গণহত্যার ব্যাপকতা হলোকাস্ট কিংবা রুয়ান্ডার গণহত্যা-এর মতোই ভয়াবহ।
২৫ মার্চের আগে থেকেই চলছিল উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও ক্ষমতা না পাওয়ায় বাঙালির মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। মার্চজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গোপনে প্রস্তুতি নেয় বাঙালিকে দমনে চূড়ান্ত অভিযানের।
২৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। রাত নামতেই শুরু হয় অভিযান। ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ভারী অস্ত্রের মুখে তা ভেঙে যায়। এরপরই ছড়িয়ে পড়ে আগুন, গুলি আর মৃত্যুর মিছিল।
এই রাতেই ধানমন্ডি ৩২ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমান-কে। তবে গ্রেপ্তারের আগেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান, যা পরবর্তীতে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘোষণাই বাঙালিকে সংগঠিত করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে।
পাকিস্তানি বাহিনী চেষ্টা করেছিল এই হত্যাযজ্ঞের খবর বিশ্ব থেকে গোপন রাখতে। কিন্তু বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিশ্ববাসী জানতে পারে এই নির্মমতার কথা। আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয় প্রতিবাদ, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ স্বীকৃতি বা পদক্ষেপ আসেনি।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সাল থেকে ২৫ মার্চকে জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এই দিনটি এখনো গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। এর প্রধান কারণ হলো-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিভিন্ন দেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি।
২৫ মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়-এটি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের সূচনা। এই রাতের বিভীষিকা বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং ঐক্যবদ্ধ করেছে স্বাধীনতার লড়াইয়ে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
আজও সেই শহীদদের রক্তের দাগ বহন করে আমাদের জাতীয় পতাকা। তাই ২৫ মার্চ আমাদের শোকের দিন, স্মরণের দিন এবং প্রতিজ্ঞার দিন-যেন ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় কখনো বিস্মৃত না হয়, এবং বিশ্ব একদিন এই গণহত্যাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেয়।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন