প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
বাবাহীন ২৫ বছর: সময় এগিয়েছে, শূন্যতা রয়ে গেছে
মোহাম্মদ আলী সুমন ||
সময় কখনো থামে না। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫টি বছর। কিন্তু কিছু শূন্যতা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না—বরং আরও গভীর হয়। ঠিক তেমনই এক শূন্যতার নাম বাবা।১৯৯৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর। দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভারী ক্ষতের দিন। সেদিন লিভার ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে আমাদের ছেড়ে চলে যান আমাদের বাবা। তখন আমি, মোহাম্মদ আলী সুমন, দশম শ্রেণির ছাত্র। বয়সে ছোট হলেও দায়িত্বের বোঝা হঠাৎ করেই কাঁধে এসে পড়ে। বাবার হাতটা মাথার ওপর থেকে সরে যেতেই যেন পুরো আকাশটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গিয়েছিল।বাবা চলে যাওয়ার পর মা-ই হয়ে ওঠেন আমাদের পৃথিবী। মা, আমি—দুই ভাই ও দুই বোন; পারুল আক্তার, রোকেয়া আক্তার পাখি আর ছোট ভাই গোলাম মোস্তফা—এই পরিবারটাকে আগলে রাখার লড়াই শুরু হয় সেদিন থেকেই। ছিল না কোনো সহজ পথ, ছিল শুধু চরাই-উতরাই, অনিশ্চয়তা আর নীরব কান্না।তবে বাবা মারাযাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও আগলেরাখার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পাশে ছিলেন আমার বাবার এক চাচা মরহুম আবদুর রব এবং তাহার বড় ছেলে আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ মরহুম রফিকুল ইসলাম কাকা। ওইদিন রফিক কাকা আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাহার উছিলায় প্রথম কর্মজীবন শুরু হয়, ঢাকার মাওলানা ভাষানী স্টেডিয়াম, তাহার মামার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি মেসার্স শাহনুর ট্রেডার্সে, কিন্তু সেই চাচা রফিকুল ইসলাম ও বাবার মত মরণব্যাধি লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৯ সালে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন।এভাবে এক এক করে ২৫ বছর পেরিয়ে আজ আমরা অনেক দূর এসেছি। পর্যায়ক্রমে বোনদের (সাধ্যমত) পড়াশোনা শেষে বিয়ে দিয়েছি, আমি এবং ছোট ভাইসহ প্রত্যকেই সংসারী হয়েছি। আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা সবাই আজও মাকে নিয়ে এক ছাদের নিচে বসবাস করছি, সবাই মিলে আমরা একটি সুখময় যৌথ পরিবার, যেখানে আছে হাসি, ভালোবাসা, সফলতার গল্প। সত্যিই আল্লাহ আমাদের সকলকে অনেক সুখেই রেখেছেন। কিন্তু সুখের মাঝেও প্রতিদিনই বাবার শূন্যতা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।কিছু কিছু মুহূর্তে বাবার অভাবটা সবচেয়ে বেশি অনুভব হয়—যখন কোনো সাফল্য আসে, যখন সংসারের বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যখন মায়ের চোখে ক্লান্তি দেখি, কিংবা নিঃশব্দ রাতে হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ে যায়। তখন বুঝি, বাবারা কখনো শুধু মানুষ নন—তারা ছায়া, সাহস আর নির্ভরতার নাম।২৫ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে, কিন্তু বদলায়নি বাবার স্মৃতি। আজও মনে হয়, বাবা যদি পাশে থাকতেন—আমাদের এই সংসার, এই হাসি, এই সংগ্রাম দেখে কতটা গর্ব করতেন! কত কথা বলতেন, কত পরামর্শ দিতেন!এই ২৫ বছরে আমরা শিখেছি দাঁড়িয়ে থাকতে, লড়তে, এগিয়ে যেতে। কিন্তু বাবাহীন জীবনের যে কষ্ট—তা শেখার বিষয় নয়, তা বহন করার বিষয়।আজ বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর ২৫ বছর পূর্তিতে শুধু একটাই কথা মনে পড়ে—বাবা, আমরা ভালো থাকার চেষ্টা করেছি। তোমার রেখে যাওয়া পরিবারটা আগলে রেখেছি। কিন্তু তোমার জায়গাটা কেউ নিতে পারেনি। পারবেও না।সময় হয়তো অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু বাবার শূন্যতা—আজও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত