প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
বিদেশের সিল পড়লেই কি সিনেমা ‘ভালো’ হয়ে যায়?
পায়েল বিশ্বাস ||
ইদানীং একটা ট্রেন্ড খুব চোখে পড়ছে। কোনো সিনেমা ইউরোপের কোনো ফেস্টিভ্যালে সিলেক্ট হলেই আমরা ধুমধাম করে বলে ফেলি—“দেশের নাম উজ্জ্বল হলো!” ফেসবুকে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু স্যার, হাততালি দেওয়ার আগে একটু থামেন। কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার সময় এসেছে।কারণ, আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল মানেই ‘সেরা’—এই ধারণাটা সব সময় খাটে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ওইসব ফেস্টিভ্যালের জুরিদের ‘রুচি’ আর ‘এজেন্ডা’র সাথে আমাদের সিনেমাটা মিলে গেছে বলেই সেটা সিলেক্ট হয়েছে।১. এটা কি সিনেমা, নাকি এনজিও প্রোজেক্ট?সোজাসুজি বলি—ইউরোপের ফেস্টিভ্যালগুলোর একটা নিজস্ব ‘চেকপয়েন্ট’ আছে। এরা তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে সাধারণত এমন সিনেমাই খোঁজে যেখানে—দারিদ্র্য থাকবে, পলিটিক্যাল ক্যাচাল থাকবে, রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তির হাহাকার থাকবে।সমস্যা এই টপিকগুলো নিয়ে না, সমস্যা হলো ট্রিটমেন্ট নিয়ে। মনে হয় পরিচালকরা দেশের দর্শকের জন্য গল্প না বলে, বিদেশের জুরিদের খুশি করার জন্য একটা ‘এক্সপোর্ট কোয়ালিটি ন্যারেটিভ’ বানাচ্ছেন। সিনেমার প্রাণ বা গল্পের চেয়ে সেখানে ‘ইস্যু’ বিক্রি করাটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এটা কি সিনেমা, নাকি ফেস্টিভ্যালের জন্য বানানো প্যাকেজ?২. থ্রিলারের নামে ‘ঘুমপাড়ানি’ লেকচারযে ছবিটা নিয়ে এত কথা হচ্ছে, সেটা নাকি ‘পলিটিক্যাল থ্রিলার’। ভাই, থ্রিলার মানে তো বুঝি—বুকের ধড়ফড়ানি বাড়বে, ঘটনার ঘনঘটা থাকবে, টানটান উত্তেজনা থাকবে।কিন্তু আমাদের তথাকথিত ‘আর্ট ঘরানার’ থ্রিলারে কী দেখি?গল্প আগায় না, খালি লম্বা লম্বা শট, আর রূপকের আড়ালে পরিচালকের ভারী ভারী স্টেটমেন্ট। আপনি সিনেমা দেখতে বসলেন বিনোদনের জন্য, আর পেলেন রাজনৈতিক ভাষণ। মেসেজ থাকুক, কিন্তু সেটা গল্পের ঘাড় মটকে কেন?৩. সেই এক মুখ, সেই এক অভিনয়কাস্টিং নিয়ে কথা বলতেও ক্লান্তি লাগে। সেই পরিচিত মুখ, সেই চেনা ভঙ্গি। ওই অভিনেতা নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু তাকে দিয়ে আর কতবার একই ধরনের ‘সিরিয়াস/গম্ভীর’ চরিত্র করাবেন? পর্দায় তাকে দেখলে এখন আর চরিত্র মনে হয় না, মনে হয়—‘ওহ, উনি তো এমনই করেন’।থ্রিলারে যদি দর্শক দেখেই বুঝে ফেলে অভিনেতা এখন কী এক্সপ্রেশন দেবেন, তাহলে সাসপেন্স থাকে কোথায়? নিরাপদ কাস্টিংয়ের এই আলসেমি থেকে পরিচালকরা কবে বের হবেন?৪. সিলেকশন নাকি কানেকশন?আমরা সাধারণ দর্শকরা ভাবি, সিনেমা ভালো তাই সিলেক্ট হয়েছে। কিন্তু পর্দার পেছনের ‘লবিং’ বা ‘নেটওয়ার্কিং’-এর খবর কজন রাখি? ফেস্টিভ্যাল প্রোগ্রামারদের সাথে খাতির আর বর্তমান ট্রেন্ডের সাথে খাপ খাওয়ানো—এগুলো অনেক সময় সিনেমার মানের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়।শেষ কথা:বিদেশের মাটিতে দেশের ছবি যাওয়া অবশ্যই গর্বের। কিন্তু সেটা যেন শুধু ‘ফেস্টিভ্যাল ফ্রেন্ডলি’ ডার্ক বাংলাদেশ না হয়। আমরা চাই এমন সিনেমা যা ফেস্টিভ্যালের জুরিদের জন্য না, বরং আমাদের মাটির গল্পের জন্য বানানো।সিনেমা যেন ‘প্রোডাক্ট’ না হয়ে, সত্যি সত্যিই ‘সিনেমা’ হয়ে ওঠে—এই আশাটা কি খুব বেশি?
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত