প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শহিদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড জাতিসংঘের তত্বাবধানে তদন্তে আমাদের লাভ ক্ষতি
জয়নাল মাযহারী ||
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড একটি গভীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের রূপ নিয়েছে। ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া এই নেতার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়কে (OHCHR) আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে এই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার আইনি ফলাফল এবং বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির মধ্যে যে বৈপরীত্য রয়েছে, তা নিয়ে একটি আইনি বিশ্লেষণ অপরিহার্য।১. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পারিবারিক আর্তি: শহিদ ওসমান হাদি কেবল একজন অরাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন জুলাই বিপ্লবের একজন সম্মুখসারির সংগঠক এবং এক বিপ্লবী চেতনার নাম। তার হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তার স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা, ইনকিলাব মঞ্চ এবং ওসমান হাদি ভক্তরা রাজপথে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তার হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তশূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে। এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের জীবন নাশের রায় কার্যকর করা ব্যাতিত অন্য কোন সাজা যথাযথ নয়। বিগত ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যমুনার সামনে এবং শাহবাগ এলাকায় যে গণ-অবস্থান ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তা প্রমাণ করে যে জনগণের মধ্যে দেশীয় তদন্ত সংস্থার ওপর গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। হাদির পরিবারের একমাত্র দাবি হলো—তদন্ত হতে হবে সরাসরি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। তবে এই দাবির পেছনে লুকিয়ে থাকা আবেগ এবং জাতিসংঘের ‘মৃত্যুদণ্ড বিরোধী’ কঠোর অবস্থানের মধ্যে যে আইনি ব্যবধান রয়েছে, তা পরিবার বা সমর্থকদের কাছে কতটা স্পষ্ট তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।২. জাতিসংঘের সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল ও আইনি কাঠামো: জাতিসংঘ যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সহায়তা করে, তখন তারা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রোটোকল ও সনদ দ্বারা পরিচালিত হয়। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আইনি কাঠামোসমূহ প্রাসঙ্গিক: ক. ইন্টারন্যাশনাল কভনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (ICCPR)জাতিসংঘের এই সনদের অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী জীবনের অধিকারকে পরম অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যদিও এতে বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের অবকাশ রাখা হয়েছে, কিন্তু এর দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রোটোকল (1989) মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ বিলোপের ডাক দেয়। বাংলাদেশ প্রথমোক্ত সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হলেও দ্বিতীয় প্রোটোকলটি এখনও গ্রহণ করেনি, যা একটি আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। খ. মিনেসোটা প্রোটোকল (২০১৬)বেআইনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ক্ষেত্রে এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘের তদন্তকারী দল এই প্রোটোকল অনুসরণ করে ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করবে, যা দেশীয় তদন্তের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য হবে।গ. প্রমাণের সুরক্ষা ও সাক্ষ্য প্রদান সংক্রান্ত প্রোটোকল (UNITAD/IIIM Policy)জাতিসংঘের তদন্ত মেকানিজম যেমন UNITAD (ইরাকের জন্য) বা IIIM (সিরিয়ার জন্য) এর একটি অলঙ্ঘনীয় নীতি হলো—তারা এমন কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় তথ্য বা প্রমাণ শেয়ার করবে না যেখানে আসামির মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।৩. মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আইনি সংঘাত: একটি গভীর বিশ্লেষণশহিদ ওসমান হাদির পরিবার এবং এ দেশের সাধারণ জনতা খুনিদের ফাঁসি চায়। কিন্তু জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা এই প্রত্যাশা পূরণে প্রধান আইনি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তথ্য শেয়ারিংয়ের শর্ত: জাতিসংঘ যদি এই তদন্তে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে, তবে জেনেভাস্থ বাংলাদেশের মিশনকে (Note Verbale-এর মাধ্যমে) এই মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, এই তদন্তের ওপর ভিত্তি করে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না।ট্রাইব্যুনালের সীমাবদ্ধতা: যদি এই বিচারের জন্য কোনো হাইব্রিড বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়, তবে সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’। কম্বোডিয়ার খেমার রুজ নেতাদের বিচারের ক্ষেত্রে (ECCC) আমরা দেখেছি যে, মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘের চাপে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তন করা হয়েছিল।আইনি ম্যাক্সিম অনুযায়ী, "Nulla poena sine lege" (আইন ছাড়া কোনো দণ্ড নয়)। বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ড থাকলেও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ফলে দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে এক ধরণের ‘সার্বভৌম আপস’ করতে হতে পারে। উপসংহার ও সুপারিশশহিদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা সত্য উদঘাটনের জন্য একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে আইনি বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, যদি সরকার ও পরিবার খুনিদের ফাঁসি নিশ্চিত করতে চায়, তবে জাতিসংঘের তদন্তের শর্তসমূহ তাদের প্রত্যাশার পরিপন্থী হতে পারে।"Fiat justitia ruat caelum" (ন্যায়বিচার সম্পন্ন হোক, তাতে আকাশ ভেঙে পড়লেও ক্ষতি নেই)। এই নীতির আলোকে যদি কেবল ‘সঠিক অপরাধী শনাক্তকরণ’ এবং ‘আন্তর্জাতিকভাবে দায়মুক্তি বন্ধ করা’ই মূল লক্ষ্য হয়, তবে জাতিসংঘের তদন্তই শ্রেষ্ঠ পথ। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় ‘সর্বোচ্চ দণ্ড কার্যকর করা’, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের এই জটিল মারপ্যাঁচটি পরিবার ও সমর্থকদের পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করতে হবে। বিশ্লেষক: জয়নাল মাযহারী, আইনজীবি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত