প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬
১৭ই এপ্রিল: মুজিবনগর সরকার দিবস; রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
মোহাম্মদ আলী সুমন ||
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৭ই এপ্রিল এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুজিবনগর-এর বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা পরবর্তীতে “মুজিবনগর সরকার” নামে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধকে সংগঠিত ও বৈধতা দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত এই সরকারই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সূচনা।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের বর্বর হামলা, অপারেশন সার্চলাইট এর পরপরই বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রূপ নেয় পূর্ণমাত্রার মুক্তিযুদ্ধে। এর প্রেক্ষাপটে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল সেই ঘোষণার সাংবিধানিক রূপ দিতে শপথ নেয় সরকার। এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-কে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয় এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।সরকারের নির্বাহী নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি শুধু সরকার পরিচালনাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক কৌশল, প্রশাসনিক সমন্বয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতা দেখান। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভায় ছিলেন এম মনসুর আলী (অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য), এ এইচ এম কামরুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ, কৃষি) এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, যার পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা ইতিহাসে বিতর্কিত ও সমালোচিত।মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় রূপ দেওয়া। এই সরকারের অধীনে সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে পরিচালনা করা হয়, যা সামরিক কৌশলগত দিক থেকে ছিল অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে প্রায় এক কোটি শরণার্থীর মানবিক সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ, কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন, সবকিছুই পরিচালিত হয় এই সরকারের নেতৃত্বে। বিশেষ করে ভারতসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে এই সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে অনেকেই “অস্থায়ী সরকার” হিসেবে উল্লেখ করলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বৈধ প্রথম সরকার। “অস্থায়ী” শব্দটি মূলত রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত একটি পরিস্থিতিগত বর্ণনা, সরকারব্যবস্থার পরিচয় নয়। এই সরকারই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম রাজনৈতিক ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠে।১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এবং ১২ জানুয়ারি নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকার কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন এই সরকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বৈধতা কোনোভাবেই কমে না। বরং এই সরকারই স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত ও সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।আজকের এই দিনে, মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত স্মরণ করে বলা যায়, এটি শুধু একটি সরকারের জন্ম নয়, বরং একটি জাতির আত্মপ্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা। ইতিহাসের এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংগঠিত নেতৃত্ব, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই পারে একটি জাতিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে।লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত