প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ফারুকীর নাশতায় একদিনে খরচ ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা
ডেস্ক রিপোর্ট ||
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আবেগকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠিত জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসে ভিভিআইপি আপ্যায়ন ও ‘নাশতার বিল’ দেখিয়ে ১ কোটি ২ লাখ টাকারও বেশি উত্তোলন করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দরপত্রবিহীন সংস্কার, ভুয়া নির্মাণকাজ এবং গায়েবি প্রদর্শনীর নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ।জাদুঘরের নথিপত্র ঘেঁটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ২৫ দিনে আপ্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট খাতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬০ টাকা, যা দৈনিক গড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার ১৯০ টাকা। ছয় মাসের মোট হিসাব করলে আপ্যায়ন বাবদ ১ কোটি ২ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যেখানে দৈনিক গড় প্রায় ৫৬ হাজার ৬৬৬ টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূলত ‘ফারুকীর নাশতার বিল’ নামেই পরিচিত এই খাতে ভিভিআইপি আপ্যায়নের আড়ালে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।একই সময়ে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবকের আপ্যায়ন বাবদ প্রায় ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৩১ হাজার ৬৬৬ টাকা। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসেসকোর মহাপরিচালক ড. সেলিম এম আল মালিকের একদিনের জাদুঘর পরিদর্শনে আপ্যায়ন বিল দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। ‘আড্ডা প্রবর্তনা রেস্টুরেন্ট’-এর নামে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য বিল করা হয়েছে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৫১৫ টাকা এবং বিভিন্ন কর্নার উদ্বোধনের নামে একদিনেই ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকার নাশতার বিল দেখানো হয়েছে।সংস্কারের নামেও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারি সংস্কারের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই প্রায় দেড় কোটি টাকার বিল তোলা হয়েছে। ১৪টি ছোট এসি স্থাপনের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ৪৯ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৭ টাকা, যেখানে প্রতিটি এসির দাম দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩২৩ টাকা। শুধু লাইট স্থাপনের খরচই দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ২ হাজার ১৭৪ টাকা। ‘জিজিবি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাগজে-কলমে কাজ দেওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো কাজ করার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে।অন্যদিকে, জুলাই জাদুঘরের সড়কের পাশে টিনের বাউন্ডারি নির্মাণের নামে জাতীয় জাদুঘরের তহবিল থেকে ৬৪ লাখ ৩৮ হাজার ৪৭০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে সেখানে কোনো বাউন্ডারির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একইভাবে শীতলপাটির ছবি সরবরাহ ও ইতিহাস বিভাগের প্রদর্শনীর নামে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৩৭০ টাকা বিল করা হয়েছে, যা কখনোই অনুষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ৫৩ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিজনের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে মোট প্রায় ৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়েছে। ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে এক কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, “১৩ লাখ দিলে কাজ হয়ে যাবে, এটা টোটাল প্যাকেজ।” তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।এদিকে, জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজীম ইবনে ওহাবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি নিয়ে দুর্নীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।সব মিলিয়ে ‘ফারুকীর নাশতার বিল’ এখন শুধু একটি হিসাব নয়, বরং জাদুঘরকেন্দ্রিক একটি বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের নীরবতা ও জবাবদিহিতার অভাব পুরো ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হয় কিনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত