প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা: একটি অন্তহীন নাগরিক সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ
মোহাম্মদ আলী সুমন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ||
প্রকৃতি ও ভূ-প্রাকৃতিক অকৃত্রিম দানে চট্টগ্রাম হওয়ার কথা ছিল প্রাচ্যের রানি, কিন্তু গত কয়েক দশকের চরম অবহেলা আর অপরিকল্পিত নগরায়ন এই বাণিজ্যিক রাজধানীকে আজ 'জলাবদ্ধতার নগরী' হিসেবে পরিচিত করেছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের এই সংকট এখন আর কেবল মৌসুমি কোনো দুর্ভোগ নয়; বরং এটি রূপ নিয়েছে এক গভীর প্রশাসনিক ও কাঠামোগত ব্যাধিতে। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প যখন রাজপথের জলজট কমাতে ব্যর্থ হয়, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে আমাদের নগর পরিকল্পনা এবং তার প্রয়োগিক সততা নিয়ে। প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রাম যেন এক স্থবির জনপদ-যেখানে থমকে যায় অর্থনীতির চাকা, স্থবির হয় শিক্ষা কার্যক্রম আর সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার নাম। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ইতিহাস কেবল পলি জমে থাকা খালের গল্প নয়, এটি স্বজন হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাসেরও উপাখ্যান। ২০১৭ সালের পাহাড় ধসের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও নগরবাসীকে তাড়া করে ফেরে, যেখানে পাহাড় কাটার নির্মম পরিণতিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দেড় শতাধিক মানুষ। সেই ঘটনার পর পাহাড় কাটা রোধে কঠোর প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন আজও অধরা। ফলে প্রতি বর্ষাতেই পাহাড় ধসের আশঙ্কা এক স্থায়ী আতঙ্কে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই বারবার সামনে নিয়ে আসে।একইসঙ্গে এই জলাবদ্ধতা এখন এক 'নীরব ঘাতক' হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া রাস্তায় খোলা ম্যানহোল কিংবা ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তার একেকটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রেনে পড়ে শিশু ও পথচারীর মৃত্যু কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার যেসব করুণ চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা আধুনিক কোনো নগরীতে মেনে নেওয়া অসম্ভব। একটি বাসযোগ্য শহরে যেখানে নাগরিক নিরাপত্তা সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, সেখানে ড্রেনে পড়ে নাগরিকের মৃত্যু স্পষ্টত কর্তৃপক্ষের অবহেলাজনিত ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। গত এক দশকে এই জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে; মেগা প্রকল্পের অধীনে খাল খনন, ড্রেনেজ সম্প্রসারণ আর স্লুইস গেট স্থাপনের কাজ চলেছে ঘটা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রামের প্রধান ৫৭টি খালের অনেকগুলোই আজ ভূমিদস্যুদের থাবায় অস্তিত্ব হারিয়েছে। খাল উদ্ধারে যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, তা চসিক, সিডিএ এবং ওয়াসার মতো সেবা সংস্থাগুলোর পারস্পরিক রশি টানাটানির কবলে পড়ে ম্লান হয়ে গেছে। এক সংস্থা রাস্তা সংস্কার করে তো অন্য সংস্থা তা কাটতে শুরু করে-এমন সমন্বয়হীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ করদাতা নাগরিকদের।এই জলাবদ্ধতা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের মতো দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাণিজ্য কেন্দ্রটি আজ ধ্বংসের মুখে। জোয়ারের পানি আর বৃষ্টির যমজ আক্রমণে শত শত কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হওয়া এখানকার ব্যবসায়ীদের জন্য এক নিয়মিত ট্র্যাজেডি। অন্যদিকে আগ্রাবাদ, হালিশহর, চকবাজার কিংবা বাকলিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার সময় জলাবদ্ধ সড়ক আর যানজটের কারণে তাদের যে মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা জাতীয়ভাবে উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের এই সংকট নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সমস্যাটিকে একটি গভীর ক্ষত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার সেই ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সময়েও পরিকল্পিত জলাধার নির্মাণ ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সহমর্মিতা নগরবাসীর মনে আশার আলো দেখালেও, বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।প্রকৃতপক্ষে, চট্টগ্রামকে বাঁচাতে হলে কেবল প্রকল্প-নির্ভর চিন্তার বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত এবং বৈজ্ঞানিক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন অপরিহার্য। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী দখল হওয়া খালগুলো উদ্ধার করা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে এই বিপুল বিনিয়োগ কেবল অর্থের অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে। নাগরিক সচেতনতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে; ড্রেন বা খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে নাগরিকদের যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি স্থানীয় প্রশাসনের কাজে জবাবদিহিতা আদায়েও তাদের সক্রিয় হতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি একটি নীতিগত ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নের গালভরা বুলি নয়, চট্টগ্রামের মানুষ এখন চায় বাস্তব ও টেকসই সমাধান। কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক শহরটি যদি আজ সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তলিয়ে যায়, তবে তা কেবল একটি অঞ্চলের ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও এক দীর্ঘস্থায়ী আঘাত হিসেবে দেখা দেবে। তাই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত