প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
২৫তম চীন সফরে পুতিনের বার্তা—সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নেওয়ার অঙ্গীকার
আন্তর্জাতিক: ||
১৯ থেকে ২০ মে পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীন সফর করেন। এটি ছিল পুতিনের ২৫তম চীন সফর। সফরে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর নিবিড় আলাপ-আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রথমত, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির মেয়াদ বেড়েছে। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বই চীন-রাশিয়া সম্পর্কের উচ্চস্তরের উন্নয়নের জন্য সর্বদা সবচেয়ে বড় সুবিধা এবং মৌলিক নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিভিন্ন মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং বিভিন্ন উপলক্ষে ৪০ বারেরও বেশি পরস্পরের সঙ্গে দেখা করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উচ্চস্তর এবং বিশেষত্বকে সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরে। চলতি বছর চীন-রাশিয়া কৌশলগত সমন্বয় অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার ৩০তম বার্ষিকী এবং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। সি চিন পিং উল্লেখ করেন, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আরও সক্রিয় ও দ্রুত উন্নয়নের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পুতিন বলেন, রাশিয়া চীনের সাথে ‘দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করতে’ কাজ করতে ইচ্ছুক। দুই রাষ্ট্রপ্রধান সর্বসম্মতিক্রমে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে সম্মতও হয়েছেন এবং ব্যাপক কৌশলগত সমন্বয় আরও জোরদার করা ও সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একটি যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষর করেছেন। চায়না ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরেশিয়ান ইনস্টিটিউটের পরিচালক লি চি কুও মনে করেন, এই চুক্তির মেয়াদ ক্রমাগত বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, চীন-রাশিয়া সম্পর্কের একটি দৃঢ় রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দু’দেশের মধ্যে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাস্তবসম্মত সহযোগিতাই চীন-রাশিয়া সম্পর্কের স্থিতিশীল উন্নয়নের অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি। টানা তিন বছর ধরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে; গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা আরও গভীর ও বাস্তবসম্মত হয়েছে; এবং সংযোগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলো বিকশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা পরিমাণগত সঞ্চয় থেকে গুণগত উল্লম্ফনের দিকে এগিয়েছে। চীন সফরে পুতিনের সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন পাঁচ জন উপ-প্রধানমন্ত্রী, আট জন মন্ত্রী, স্থানীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা। আলোচনার সময় সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেন, উভয় পক্ষের উচিত ‘সর্বাঙ্গীণ সহযোগিতার সামগ্রিক পরিকল্পনা ও নকশাকে শক্তিশালী করা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানিসম্পদ, পরিবহন ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বাস্তবসম্মত সহযোগিতার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।’ আলোচনার পর দুই রাষ্ট্রপ্রধান বাণিজ্য, শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ২০টি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হন। এই সফরকালে উভয় পক্ষ অন্যান্য ক্ষেত্রেও ২০টি সহযোগিতা চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। বিশ্বের প্রধান দুইটি শক্তি হিসেবে, চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতার একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। আলোচনা চলাকালে দুই রাষ্ট্রপ্রধান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির মতো প্রধান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন। এই সফরকালে উভয় পক্ষ একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব এবং নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পক্ষে একটি যৌথ বিবৃতিও প্রকাশ করেন। ফুতান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের রুশ ও মধ্য এশীয় অধ্যয়ন কেন্দ্রের উপ-পরিচালক মা পিন উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন ও রাশিয়ার উচিত আঞ্চলিক শান্তির জন্য গঠনমূলক সমাধান প্রদান করা এবং বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে যুক্তিসঙ্গত ও স্থিতিশীল শক্তি সঞ্চার করা। তৃতীয়ত, ‘চীন-রাশিয়া শিক্ষাবর্ষ’-র সূচনা হয়েছে। চীন ও রাশিয়ার বন্ধুত্ব উভয় দেশের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। পুতিনের চীন সফরকালে একটি বিশেষ আয়োজন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সম্পর্কিত ছিল। ২৬ বছর আগে চীন সফরের সময়, বেইহাই পার্কে যে ‘চীনা ছেলেটির’ সাথে পুতিন ছবি তুলেছিলেন, সেই পেং পাইয়ের সঙ্গে তাঁর আবার দেখা হয় এবং তাঁরা দু’জনে হাত মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সময় গড়িয়েছে, এবং সেই ছেলেটি এখন একজন প্রকৌশলী। পুতিনের সঙ্গে এই সাক্ষাতই রাশিয়াকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য তাঁর আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে, যা তাঁকে মস্কোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছিল। এটি চীন-রাশিয়া শিক্ষাগত সহযোগিতার এক জীবন্ত ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আজ, চীন-রাশিয়া শিক্ষাগত সহযোগিতা সমৃদ্ধি লাভ করছে, যেখানে উভয় দেশে ৮০,০০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনা করছে। উভয় পক্ষ যৌথভাবে ১৫০টিরও বেশি সহযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেছে এবং উভয় দেশের তরুণ-তরুণীরা ক্রমবর্ধমান হারে পারস্পরিক শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হচ্ছে ও দুই জাতির বন্ধুত্বের উত্তরাধিকারী হয়ে উঠছে।‘চীন-রাশিয়া শিক্ষাবর্ষ’-র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সি চিন পিং ও ভ্লাদিমির পুতিন উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাষণে সি চিন পিং বলেন, ‘চীন-রাশিয়া শিক্ষাবর্ষ’-কে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, উভয় পক্ষের উচিত, সহযোগিতার বিষয়ে ঐকমত্যকে আরও সুসংহত করা; সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করা; এবং সহযোগিতার স্তরকে উন্নত করা। দুই রাষ্ট্রপ্রধান যৌথভাবে ‘চীন ও রাশিয়ার প্রজন্মের পর প্রজন্মের বন্ধুত্বের উত্তরাধিকার এবং বড় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের জন্য একটি মডেল স্থাপন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীও ঘুরে দেখেন। সি চিন পিং ও পুতিন প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া বিভিন্ন ছবি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আদান-প্রদান ও সহযোগিতার মুহূর্তগুলো আনন্দের সাথে স্মরণ করেন। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের কৌশলগত নির্দেশনা থেকে শুরু করে, সহযোগিতার সাফল্য এবং সময় ও স্থানের ব্যবধান পেরিয়ে উষ্ণ আলাপচারিতা পর্যন্ত—এই সফরটি বহির্বিশ্বকে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতিকে সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দিয়েছে। সূত্র:স্বর্ণা-আলিম-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই