প্রিন্ট এর তারিখ : ২৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
ঈদ আসে, ঈদ যায়… কিন্তু বাবা আর ফিরে আসে না
মোহাম্মদ আলী সুমন , ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ||
ঈদ প্রতি বছরই আসে। মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দের আলো জ্বলে, নতুন পোশাকের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, পরিবারের সবাই একসাথে বসে সুখের মুহূর্ত ভাগাভাগি করে। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনে ঈদ মানেই এক গভীর শূন্যতার নাম। আনন্দের ভিড়েও বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে—কারণ সেই মানুষটি আর নেই, যাকে ঘিরেই ছিল একসময় পুরো পৃথিবী।আমার জীবনেও ঈদ মানেই বাবাকে নতুন করে মনে পড়া।আজ থেকে ২৬ বছর আগে, ১৯৯৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে, দীর্ঘদিন লিভার ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। তখন আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। আমি পরিবারের বড় সন্তান। ছোট দুই বোন আর এক ভাইকে নিয়ে হঠাৎ করেই যেন বিশাল এক অন্ধকার নেমে এলো আমাদের জীবনে।বাবা চলে যাওয়ার পর মা আর আমরা চার ভাইবোন কত কষ্টের সময় পার করেছি, তার হিসাব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। জীবনের প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের, প্রতিটি রাত ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু আজ আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। সংসার হয়েছে, জীবন গুছেছে, সবার বিয়ে হয়েছে। তবুও একটি শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি-বাবার শূন্যতা।বিশেষ কোনো দিন এলেই বাবার কথা আরও বেশি মনে পড়ে। ঈদ, আরাফা, কিংবা পারিবারিক কোনো আনন্দের মুহূর্ত-সবকিছুতেই মনে হয়, “আহা! বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন!”আজও মাঝে মাঝে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে শিশুর মতো কাঁদি। মনে হয়, মা-বাবা কি সত্যিই আর কখনও ফিরে আসবে না?বাবার অসংখ্য স্মৃতি এখনো স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বাজারে যাওয়ার স্মৃতি, খাল-বিলে মাছ ধরার স্মৃতি, জমিতে কাজ করার দৃশ্য-সব যেন এখনো জীবন্ত। বাবা মাছ ধরতে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া ছিল আমার শৈশবের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি।চায়ের দোকানে বাবাকে বসে থাকতে দেখলে চুপচাপ গিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাবা বুঝে ফেলতেন। হাসিমুখে কিছু কিনে দিতেন। সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আজ জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে আছে।তবে বাবার সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলোর একটি ছিল ঘুড়ি ওড়ানো। প্রতি বছর বাবা বড় বড় ঘুড়ি বানাতেন। মা মাঝে মাঝে রাগ করতেন, ঝগড়াও করতেন-তবুও বাবা থামতেন না। ঘুড়ি বানানোর সময় বাবার চোখেমুখে যে আনন্দ দেখতাম, তা আজও ভুলতে পারিনি। আমি, মা আর বোন পারুলকে নিয়ে বাবা মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতেও যেতেন। তখন কে জানত, এত অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের এতিম করে বাবা চলে যাবেন!আমার ছোট বোন পারুলের এখনো বাবার অনেক স্মৃতি মনে আছে। ছোট বোন পাখিরও হয়তো বাবার মুখ কিছুটা মনে আছে। কিন্তু আমার ছোট ভাই মোস্তাফার তো বাবাকে মনে রাখার সুযোগই হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র দুই বছর।তবে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির নাম-মা।একজন মা কতটা শক্ত হতে পারেন, তা আমি নিজের চোখে খেছি। নিজের শত কষ্ট, দুঃখ আর অভাব বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে মা আমাদের আগলে রেখেছেন। কখনো বুঝতে দেননি, তিনি ভেতরে কতটা ভেঙে পড়েছেন। নিজের কষ্ট ভুলে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।আমরা হয়তো বাবাহীন বড় হয়েছি, কিন্তু মায়ের সাহস আর ভালোবাসা আমাদের কখনো ভেঙে পড়তে দেয়নি।ছোটবেলায় যখন অন্যদের বাবাদের সন্তানদের জন্য নতুন জামা কিনতে দেখতাম, তাদের সঙ্গে ঘুরতে বা খেতে যেতে দেখতাম, তখন বুকের ভেতর কষ্ট জমে থাকত। মনে হতো, আমাদের বাবাও যদি থাকতেন!আজ এত বছর পরও সেই অভাবটুকু ঠিক একই রকম রয়ে গেছে।মানুষ সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু ভুলে যায়, কিন্তু বাবার অভাব কোনোদিন পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে আরও বেশি বুঝতে শেখা যায়, আরও বেশি অনুভব করা যায়।আজ পবিত্র আরাফার দিনে আমি আমার বাবার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করি-হে আল্লাহ, আপনি আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন। পৃথিবীতে তিনি যে কষ্ট করেছেন, তার উত্তম প্রতিদান আপনি আখিরাতে দান করুন।ঈদ আসে, ঈদ যায়…কিন্তু কিছু মানুষ আর কখনও ফিরে আসে না।তবুও তাদের স্মৃতিগুলো আজীবন বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীরে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই