প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
কানাডার স্বপ্ন দেখিয়ে কোটি টাকার প্রতারণা
স্টাফ রিপোর্টার ||
কানাডায় পাঠানোর প্রলোভন, জাল ভিসার আশ্বাস, কোটি কোটি টাকার লেনদেন এবং পরে রহস্যজনক আত্মগোপন— এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত জাকির হোসেন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ প্রকাশ্যে আনছেন ভুক্তভোগীরা।স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করত একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেবীদ্বারের বাসিন্দা জাকির হোসেন।“৫৫ লাখ টাকা নিয়েও কাউকে পাঠায়নি”প্রতারণার শিকার দাবি করা সোহেল মাঝি জানান, কানাডায় পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে তার পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়।তার ভাষায়,“আমাকে জিম্মাদার বানিয়ে আমার আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময় পার হলেও কেউ বিদেশ যেতে পারেনি। পরে বুঝতে পারি আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি।”সোহেল মাঝির দাবি, তার পরিবারের চার সদস্য— কামরুন নাহার, মোঃ মিঠুন, জুবায়ের হাওলাদার ও মোঃ সাইমুনকে কানাডা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুরো কার্যক্রমটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত।তাদের দাবি অনুযায়ী—প্রথম স্ত্রী আয়শা আক্তার নগদ অর্থ গ্রহণ করতেন।দ্বিতীয় স্ত্রী শামিমা আক্তারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর টাকা জমা নেওয়া হতো।ছেলে শাহাতাৎ হোসেন (আরিন) বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন।দুলাল আহম্মেদ পাসপোর্ট ও অর্থ বহনকারী হিসেবে কাজ করতেন।শ্যালক রাসেল আহমেদও চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।ভুক্তভোগীদের মতে, সম্পর্ক তৈরি, বিশ্বাস অর্জন এবং বিদেশে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েই মানুষকে ফাঁদে ফেলা হতো।প্রভাব খাটিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগঅভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত জাকির হোসেনের পিতা জমসের আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য হওয়ায় সেই পরিচয়ের প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা হতো।ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। এমনকি প্রতারণার অভিযোগ তোলার পর উল্টো অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।ভিসা দেওয়ার পরই আত্মগোপন?সোহেল মাঝির অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে লেনদেন শুরু হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে কথিত ভিসা দেওয়া হলেও বিদেশ যাত্রার কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। এরপর অভিযুক্ত পরিবার আত্মগোপনে চলে যায় বলে দাবি করা হয়।আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালে পুনরায় যোগাযোগ করে নতুন করে অর্থ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে আগের টাকার কোনো সমাধান করা হয়নি।“সব হারিয়ে নিঃস্ব”চোখে কানাডার স্বপ্ন, হাতে জাল ভিসা আর শেষে সর্বস্বান্ত জীবন— এমনই বর্ণনা দিয়েছেন ভুক্তভোগী সোহেল মাঝি।তিনি বলেন,“সবকিছু হারিয়ে আজ আমি নিঃস্ব। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।”আরও অনেক ভুক্তভোগীর সন্ধানস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু একটি পরিবার নয়— বিভিন্ন জেলা ও এলাকার আরও বহু মানুষ একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।এলাকাবাসীর মতে, দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও ভয় ও প্রভাবের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে পারেননি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ব্যক্তি প্রকাশ্যে অভিযোগ করায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবিভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নিএ বিষয়ে অভিযুক্ত জাকির হোসেন বা তার পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।সচেতন মহলের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ও সরকারি অনুমোদন যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।মানুষের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে যদি প্রতারণা হয়ে থাকে, তবে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই