প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
শতবর্ষী বাংগরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়: পুনর্মিলনীর নামে 'ফান্ড রাইজিং', ৮ বছরেও মিলল না লাখ লাখ টাকার হিসাব
মাহফুজুর রহমান,,, মুরাদনগর (কুমিল্লা) ||
১৫০ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুমিল্লার মুরাদনগরের 'বাংগরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়'। কিন্তু সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যে এবার দাগ লাগতে বসেছে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের নামে অর্থ আত্মসাতের এক ধোঁয়াশাপূর্ণ ঘটনায়। বিদ্যালয়ের ১৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১৮ সালে একটি জাঁকজমকপূর্ণ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করার কথা থাকলেও, দীর্ঘ ৮ বছর পার হয়ে গেলেও তা আজো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান আয়োজনের লক্ষ্যে কয়েক হাজার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ রেজিস্ট্রেশন ফি আদায় করা হয়। সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১,০০০ টাকা এবং তৎকালীন অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি বিদ্যালয়টিতে পড়ুয়া ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর কোনো শিক্ষার্থীই এর বাইরে ছিল না; তাদের জন্য এই রেজিস্ট্রেশন ছিল সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। দেশ ছাড়িয়ে প্রবাসে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আসার সুস্পষ্ট আলামত মিলেছে।কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সুদীর্ঘ ৮টি বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত মোট কত টাকা উঠেছে তার সঠিক কোনো হিসাব খোদ অনুষ্ঠান কমিটির ট্রাস্টি মিজানুর রহমানও জানেন না। কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতায় আদৌ এই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান কোনোদিন হবে কি না, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। সাম্প্রতিক সময়ে এই অর্থ আদায় ও অনুষ্ঠান না হওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপর থেকেই সংশ্লিষ্ট মহলে শুরু হয় তোলপাড়। একে অপরকে ফোন দেওয়া এবং নিজের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর এক নোংরা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।এদিকে ঘটনাটি নিয়ে ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হয়েছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান সেলিমের বক্তব্যে। তিনি জানান, বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা ব্যাংকে জমা আছে। তবে অন্যদের সংগৃহীত কোনো টাকা তার হাতে আসেনি।প্রধান শিক্ষক সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, "বাংগরা গ্রামের গাজী আক্তার, প্রাক্তন শিক্ষার্থী সাদেক ও মিজানসহ বেশ কয়েকজন এই টাকা সংগ্রহ করেছে। তাদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বা হিসাব আমরা পাইনি।" কাঙ্ক্ষিত এই অনুষ্ঠানের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না।অনুষ্ঠান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী আক্তার টাকা তোলার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,"আমার কাছে সংগৃহীত মোট ৩৭ হাজার টাকা গচ্ছিত আছে। আরও কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আসার কথা থাকলেও তা আমরা শেষ পর্যন্ত পাইনি। তাছাড়া, এতদিন পর্যন্ত কমিটির কেউ বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ বা কথা বলেনি। যে কারণে সংগৃহীত অর্থ এবং রেজিস্ট্রেশনের বই এখনো কাউকে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।" তিনি আরও বলেন, "আমরা চাই দ্রুত এই অনুষ্ঠানটি সফল করার লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।"এ বিষয়ে ট্রাস্টি মিজানুর রহমান জানান, অনুষ্ঠান কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক অগ্রণী ব্যাংকে একটি যৌথ হিসাব খোলা আছে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত সেই অ্যাকাউন্টে বিদ্যালয় কর্তৃক উত্তোলনকৃত টাকা ছাড়া আর কোন টাকা জমা হয়নি! উল্টো তিনি নিজের পকেট থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে রেখেছেন বলে দাবি করেন।দীর্ঘ ৮ বছর ধরে অনুষ্ঠান না হওয়া এবং লাখ লাখ টাকার হিসাব না পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। ক্ষুব্ধ প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা বলেন, "বিদ্যালয়ের প্রতি আবেগের জায়গা থেকে আমরা দূর-দূরান্ত ও প্রবাস থেকেও রেজিস্ট্রেশন ফি পাঠিয়েছিলাম। অথচ সুনির্দিষ্ট হিসাব না দিয়ে এখন একে অপরের ওপর দায় চাপানোর নাটক চলছে। আমরা এই আর্থিক অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত, টাকার সঠিক হিসাব এবং যেকোনো মূল্যে দ্রুত এই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের বাস্তবায়ন চাই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই