প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
মোহাম্মদ আলী সুমন। ||
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং সেই অবকাঠামো কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সেবা দিতে পারছে-তার ওপর নির্ভর করে। বিদ্যুৎ খাত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কারণ বিদ্যুৎ আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাণশক্তি, অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ এবং নাগরিক জীবনের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। অথচ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আজ এমন এক দ্বৈত সংকটের মধ্যে পড়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ একই সঙ্গে দুই ধরনের শাস্তি ভোগ করছেন-একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অন্ধকার, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও গুনতে হচ্ছে অস্বাভাবিক বা তথাকথিত ‘ভুতুড়ে’ বিল। এমন পরিস্থিতি শুধু জনদুর্ভোগ নয়; এটি জনসেবা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।গত জুন মাসে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল থেকেই বিদ্যুৎ সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় দিনে আট থেকে দশবার লোডশেডিং, ভালুকায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, নরসিংদীর রায়পুরায় টানা দশ থেকে বারো ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের প্রায় সর্বত্র একই চিত্র। শহরে অনিশ্চিত সরবরাহ, গ্রামে দীর্ঘ বিদ্যুৎহীনতা-এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, সংকটটি আর আঞ্চলিক নয়; এটি জাতীয় চরিত্র ধারণ করেছে।আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ না থাকলেও বিল কমছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। হাজারো গ্রাহক অভিযোগ করছেন, গত জুন মাসের বিল পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা তাদের প্রকৃত ব্যবহারের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের পরও যখন অতিরিক্ত বিল পরিশোধের নোটিশ আসে, তখন মানুষ শুধু আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি তাদের আস্থাও ভেঙে পড়ে। সেবা না দিয়ে মূল্য আদায় কোনো সভ্য গণসেবার নীতি হতে পারে না।বিদ্যুৎ বিভাগ অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। হটলাইন নম্বরও চালু রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-কেন একই ধরনের অভিযোগ বছরের পর বছর ফিরে আসে? যদি একটি সমস্যা নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে সেটি আর বিচ্ছিন্ন ভুল নয়; সেটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। জনগণের দায়িত্ব অভিযোগ জানানো নয়; জনগণের অধিকার হলো নির্ভুল সেবা পাওয়া। ভুল বিল সংশোধনের জন্য মানুষকে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হবে-এমন ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই আধুনিক বা ডিজিটাল সেবা বলা যায় না।এখানেই বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহু বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। কাগজে-কলমে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি সংকট, কয়লা সরবরাহের অনিশ্চয়তা, গ্যাসের ঘাটতি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে। অথচ চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করায় প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা ব্যবহারের সামর্থ্য নেই। এটি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির সম্মিলিত প্রতিফলন।বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক বাস্তবতাও কম উদ্বেগজনক নয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিপুল বকেয়া, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, ডলার সংকট এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয় পুরো খাতকে আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলেছে। বিদ্যুতের মূল্য উৎপাদনের আগেই রাষ্ট্রকে বিপুল ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। এই চাপ শেষ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের ওপরই এসে পড়ে। একদিকে করের অর্থ দিয়ে ভর্তুকি, অন্যদিকে বাড়তি বিল-অর্থাৎ জনগণ একই সংকটের মূল্য দুইবার পরিশোধ করছেন।এই সংকটকে আরও গভীর করেছে বিদ্যুৎ চুরি। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের হাজার হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ এবং হুকিংয়ের মাধ্যমে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, তা শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতিই করছে না; ট্রান্সফর্মারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, ভোল্টেজের ওঠানামা বাড়াচ্ছে এবং নিয়মিত লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় অন্যায় হলো, যারা নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন, তারাই এই চুরির অর্থনৈতিক বোঝা বহন করছেন।একটি রাষ্ট্রে আইন মানা নাগরিক যদি শাস্তি পান আর আইন ভঙ্গকারী যদি সুবিধা ভোগ করেন, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; সেটি ন্যায়বিচারেরও সংকট। বিদ্যুৎ চুরি রোধে অভিযান পরিচালনার খবর মাঝেমধ্যে শোনা গেলেও বাস্তবে অবৈধ চার্জিং নেটওয়ার্ক দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে-এই চক্রের পেছনে কারা? কেন বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে বিদ্যুৎ চুরি চললেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু অভিযান চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।বিদ্যুৎ সংকটের অর্থনৈতিক অভিঘাত বহুমাত্রিক। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কারখানাগুলোকে জেনারেটর চালিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমছে। তৈরি পোশাক, সিরামিক, স্টিল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব সরাসরি রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর পড়ে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেকেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।কৃষিক্ষেত্রেও এর প্রভাব ভয়াবহ। গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো জমিতে পানি না পৌঁছালে উৎপাদন কমে যায়, কৃষকের ব্যয় বাড়ে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্য নষ্ট হওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পণ্য বিনষ্ট হওয়া এবং ঘরোয়া অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ-সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সংকট এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব গভীর। পরীক্ষার্থীরা রাতের পর রাত অন্ধকারে পড়াশোনা করছে। হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চিকিৎসা সেবাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন সেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নয়নের কোনো লক্ষ্যই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ খাতে নীতিগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি। স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ, রিয়েল-টাইম বিলিং, স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ভুতুড়ে বিল ও বিদ্যুৎ চুরির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বাস্তববাদ প্রয়োজন। উৎপাদন সক্ষমতার পরিসংখ্যান দিয়ে আত্মতুষ্টির পরিবর্তে জ্বালানি সরবরাহ, আর্থিক সক্ষমতা এবং পরিচালন দক্ষতার বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। কারণ জনগণকে তথ্য গোপন করে নয়, সত্য জানিয়ে আস্থা অর্জন করা যায়।আজ বিদ্যুৎ সংকট কেবল একটি খাতের সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি এবং জনঅসন্তোষের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা প্রশাসনের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। জনসেবামূলক খাতে আস্থার সংকট দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ে।সরকারের এখন দায়িত্ব শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা আশ্বাস দেওয়া নয়; দৃশ্যমান ফল নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, অস্বাভাবিক বিলের দ্রুত সংশোধন, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ-এসব পদক্ষেপ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।কারণ বিদ্যুৎ কেবল একটি পণ্য নয়; এটি নাগরিকের অধিকার, অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং উন্নয়নের ভিত্তি। জনগণ অন্ধকারে বসে উন্নয়নের গল্প শুনতে চায় না। তারা চায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, স্বচ্ছ বিলিং এবং জবাবদিহিমূলক সেবা। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলবে, প্রতিটি বিল হবে নির্ভুল, প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুতের হিসাব হবে স্বচ্ছ এবং প্রতিটি নাগরিক বিশ্বাস করতে পারবেন-রাষ্ট্র তার প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম। সেই লক্ষ্য অর্জনই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।