প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
চান্দিনায় মহাসড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় চুরি-ছিনতাই বৃদ্ধি;
টি. আর. দিদার, , চান্দিনা (কুমিল্লা) ||
আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা যার পেশা, তার নিজের ঘরের মানুষই যদি হয় দুর্ধর্ষ অপরাধীদের বড় ঢাল-তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? এই একটি প্রশ্নই এখন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। ঘর চুরি, সড়ক ডাকাতি এবং ছিনতাই হওয়া নামিদামি ব্র্যান্ডের মোবাইলগুলো পানির দামে কিনে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি নম্বর আইএমইআই (IMEI) পরিবর্তন করে মোটা অঙ্কের মুনাফায় অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কাজিম নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। চোরাই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত এই কাজিম চান্দিনা উপজেলার ১নং শুহিলপুর ইউনিয়নের গ্রামপুলিশের দাফাদার শাহিনার ছেলে।অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের এক সক্রিয় সদস্যের মাধ্যমে কাজিমের অন্ধকার সাম্রাজ্যের খুঁটিনাটি প্রকাশ পায়। শুহিলপুর গ্রামের প্রবাসী রোস্তম আলীর মাদকাসক্ত ছেলে সাগর গভীর রাতে বাতাঘাসী ইউনিয়নের সব্দলপুর গ্রামের এক বাসিন্দার ঘরে হানা দেয়। সেখান থেকে মোবাইল, ক্যামেরা ও কম্পিউটার চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয়রা।অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর মাত্র কয়েক মাস আগেও চুরির অভিযোগে জেলহাজত খেটেছিল এই সাগর। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে সে পুনরায় একই অপরাধে জড়ায়। আটক হওয়ার পর স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে সাগর কাজিমের চোরাই মোবাইল কেনাবেচার আদ্যোপান্ত তথ্য ফাঁস করে দেয়। সাগরের দেওয়া তথ্যমতে, "গ্রুপের সবাই সড়কে এবং মানুষের বাসা-বাড়িতে যত চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি করে-সব মোবাইল কাজিমের কাছেই এনে বিক্রি করে। কারণ ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় চোরাই মোবাইল কিনে রাখে একমাত্র কাজিম। পরবর্তীতে চুরির ঘটনায় জড়িত সাগরকে সংশোধনের শর্তে তার পরিবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠালেও কাজিমের চক্রের বিষয়টি এখন এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।অনুসন্ধানে কাজিমের অপরাধের আরও সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলেছে। তহিরুল ইসলাম (তহির) নামে স্থানীয় এক ভুক্তভোগী জানান, এর আগে আমার নিজের দুইটি চুরি হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোন খোদ গ্রামপুলিশ দফাদার শাহিনার ছেলের কাছ থেকে উদ্ধার করি। বিষয়টি আমি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকেও জানাই। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাজিমের কাছের আত্মীয়-স্বজনরা স্বীকার করেছেন তার এই চোরাই ব্যবসার কথা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইলের আইএমইআই (IMEI) নম্বর পরিবর্তন করে মোটা অঙ্কের মুনাফায় অন্যত্র বিক্রি করে দেয় এই চতুর কারবারি। এমনকি তার অপকর্ম নিয়ে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ-দরবার হলেও, গ্রামপুলিশ মায়ের ছায়ায় প্রতিবারই পার পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে সে।স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রটি শুধু বাসাবাড়িতে চুরি করেই ক্ষান্ত থাকে না, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা ও দাউদকান্দির অংশে ইলিয়টগঞ্জ, তীরচর, দড়ানিপাড়া ও কুটুম্বপুর অংশের খাদঘর এলাকায় গভীর রাতে দেশীয় অস্ত্র ধারালো ছুরি ঠেকিয়ে চালকদের সব কিছু ছিনিয়ে নেয়। ২০ হাজার টাকা দামের মোবাইল মাত্র ২ হাজার টাকায়, আর ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দামের ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলো মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় চোর ও ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে অনায়াসে কিনে রাখে কাজিম।ভুক্তভোগী চালকরা জানান, তারা দীর্ঘপথ গাড়ি চালিয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রামের জন্য গাড়ি থামান, তখনই ৪ থেকে ৫ জন এসে জানালার পাশে ছুরি ঠেকায়। মোবাইল-টাকা তো নেয়ই, লাইসেন্স আর কাগজপত্রও নিয়ে যায়। বাধা দিলে মারধর করে, পরে মালিককে ফোন দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। টাকা দিলে নির্দিষ্ট জায়গায় কাগজপত্র ফেলে রাখা হয়, আর না দিলে তা আর পাওয়া যায় না।এ ধরনের ঘটনায় শুধু চালকেরাই নন, উদ্বিগ্ন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারাও। মো. মাইনউদ্দিন স্বর্ণকার মেম্বার ও মো. কাউছার আলম সহ স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. হান্নান মিয়াজী মহাসড়কে নিয়মিত পুলিশ টহল এবং কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা পণ্যবাহী কাভারভ্যান-ট্রাক চালকেরা যখন ক্লান্ত হয়ে কিছুসময়ের জন্য গাড়ি পার্কিং করেন-ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে ধেয়ে আসে এই চক্রের যুবকেরা। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত কাজিম পলাতক থাকলেও, খোদ তার মা-গ্রামপুলিশ দাফাদার শাহিনা নিজের ছেলের অপকর্মের কথা স্বীকার করে বলেন, আমার ছেলে কাজিমের এই অপকর্মের বিষয়ে আমি অবগত আছি। এর আগেও এলাকার অনেকেই আমার কাছে এসে তার বিরুদ্ধে নানা নালিশ করেছেন। একজন মা হিসেবে আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু সে শোনেনি। আমি গ্রামপুলিশের চাকরি করি, আইনকে সম্মান করি। মা হতে পারি, কিন্তু ছেলের এই অপরাধের কারবার আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না।চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নুরুজ্জামান জানান, আইএমইআই (IMEI) পরিবর্তন করা এবং চোরাই মাল কেনাবেচা করা দন্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যেই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির শিকদার বলেন, ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানা পুলিশ মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ছিনতাই চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি যেহেতু আমাদের নজরে এসেছে, তাই এখন থেকে মহাসড়কে আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যাতে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো কোনো অপরাধ সংঘটিত না হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই