প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬
জয়নাল মাযহারী ||
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান উত্তর বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক পুনর্গঠনের ধারা সূচিত হয়েছে। এই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল সমাজে বিদ্যমান সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। এই বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দলিলে রূপ দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক সনদে স্বাক্ষর করে। এই সনদের একটি অন্যতম যুগান্তকারী দিক হলো—তাতে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের চাপিয়ে দেওয়া সেক্যুলার কাঠামোর পরিবর্তে “সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান” এবং “ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি” কে মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।একই সাথে, সংবিধান সংস্কার কমিশনের লব্ধ জনমত ও ইমেইল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের হাজার হাজার নাগরিক স্পষ্টভাবে কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে তাদের লিখিত প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর এই ঐতিহাসিক ঐকমত্য (জুলাই সনদ) এবং আমজনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আকাঙ্ক্ষার যুগপৎ মেলবন্ধন প্রমাণ করে—বাংলাদেশের ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক আইনি জঞ্জাল উপড়ে ফেলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকীদা ও মূল্যবোধের আলোকে আইন সংস্কার করার এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বা একটি ‘গোল্ডেন মোমেন্ট’। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস তথা ইসলামী শরীয়াহ আইনের সাথে প্রচলিত ব্রিটিশ-ঔপনিবেশিক সিভিল ও ক্রিমিনাল আইনগুলোর পদ্ধতিগত সমন্বয় সাধনের এই স্বর্ণালি সুযোগে গঠিত কোনো সংস্কার কমিশন বা সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে কোনো স্বীকৃত ইসলামী আইনবিদ বা শরীয়াহ বিশেষজ্ঞকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নীতি নির্ধারণী স্তরের এই পদ্ধতিগত শূন্যতা দূর করতে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের এই মহতী উদ্যোগকে সফল করতে কোনো গতানুগতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাভিত্তিক প্রায়োগিক ব্লুপ্রিন্ট প্রয়োজন। আর এখানেই পথ দেখাতে পারে আমার গবেষনার ফসল 'শরীয়া বনাম প্রচলিত আইন: সংঘাত ও সমন্বয়' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থটি।বিদ্যমান সংস্কার রূপরেখা ও সদস্য বিন্যাস: একটি কাঠামোগত শূন্যতাবাংলাদেশের চলমান শাসনতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে গভীর রাজনৈতিক ও পদ্ধতিগত দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। প্রথম স্তরে ২০২৪ সালে গঠিত সংস্কার কমিশনসমূহ এবং দ্বিতীয় স্তরে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে গঠিত ১২ সদস্য বিশিষ্ট ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি’র নীতিনির্ধারণী পদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে আধুনিক আইনজীবী, আমলা ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য রয়েছে।অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৪-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবীরা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কোনো শরীয়াহ আইন বিশেষজ্ঞ বা ইসলামী আইনবিদ স্থান পাননি। অনুরূপভাবে, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন (আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন (ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংস্থাতেও একই ধরনের প্রতিনিধিত্বমূলক শূন্যতা বজায় রয়েছে।এই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতেও দেশের শীর্ষ কোনো ওলামা বা ফকীহর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত আপত্তির কারণে ৫টি পদ এখনো শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। এই শূন্যতা সংস্কার প্রক্রিয়ার গতিকে শ্লথ করতে পারে এবং জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে একটি পশ্চিমা সেক্যুলার আইনি মডেল পুনরায় চাপিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।যদিও কমিটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরগুনা-১ আসন থেকে নবনির্বাচিত আলেম সংসদ সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, তবে প্রাতিষ্ঠানিক ফিকহ ও শরীয়াহ আইন সংস্কারের জন্য কোনো স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ প্যানেল বা উপদেষ্টা বোর্ড গঠন না করা শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি বড় সীমাবদ্ধতা। ‘সংঘাত ও সমন্বয়’ গবেষণা গ্রন্থ: এই গোল্ডেন মোমেন্টের জন্য প্রস্তুত ব্লুপ্রিন্টআইন সংস্কার বা ইসলামী আইনের পদ্ধতিগত একীভূতকরণ কোনো তাত্ত্বিক ফ্যান্টাসি বা তাৎক্ষণিক রূপান্তর নয়; এটি অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক, পর্যায়ক্রমিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। এই জটিল প্রক্রিয়াকে সহজ, নির্ভুল ও গতিশীল করতে শূন্য থেকে শুরু করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার দীর্ঘ গবেষণালব্ধ গ্রন্থ 'শরীয়া বনাম প্রচলিত আইন: সংঘাত ও সমন্বয়' ইতিমধ্যেই এই গোল্ডেন মোমেন্টে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি বাস্তবসম্মত ভিত্তি ও রেডিমেড ব্লুপ্রিন্ট সরবরাহ করেছে।এই গ্রন্থে অত্যন্ত নিপুণভাবে সংবিধান এবং প্রচলিত ১০০টি সিভিল ও ক্রিমিনাল আইনকে ধারা ভিত্তিক (Section-by-Section) ব্যবচ্ছেদ করে বিদ্যমান ঔপনিবেশিক সাধারণ আইনের (Common Law) কোন কোন ধারা সরাসরি ইসলামী শরীয়ার মূল নীতি ও ফিকহী দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সাথে, প্রতিটি সাংঘর্ষিক ধারার বিপরীতে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মৌলিক মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী বাস্তবতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি যুগোপযোগী ও বৈজ্ঞানিক সমন্বয় প্রস্তাব (Reconciliation Model) পেশ করা হয়েছে।‘সংঘাত ও সমন্বয়’ গ্রন্থ থেকে ১০টি মারাত্মক সংঘাত ও সমন্বয় প্রস্তাবউক্ত গ্রন্থ থেকে চিহ্নিত প্রচলিত সাধারণ আইনের ১০টি মারাত্মক আইনি সংঘাত এবং সেগুলোর বিপরীতে শরীয়াহ-সম্মত প্রায়োগিক সমন্বয়ের রূপরেখা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:ক্রমিকআইন ও সুনির্দিষ্ট ধারাবিদ্যমান ঔপনিবেশিক সাধারণ আইনের সংঘাতশরীয়াহ-সম্মত বৈজ্ঞানিক সমন্বয় প্রস্তাব (Reconciliation Model)তথ্যসূত্র১দণ্ডবিধি, ১৮৬০ - ধারা ৩০২খুনের শাস্তি হিসেবে কেবল মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; নিহতের উত্তরাধিকারীদের অধিকার উপেক্ষিত।কিসাস ও দিয়তের (রক্তপণ) আইনি ধারা যুক্ত করা, যার ফলে নিহতের পরিবার চাইলে আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে বা নিঃশর্তভাবে খুনিকে ক্ষমা করতে পারবে।-২সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ - ধারা ১১২বিবাহের পর যে কোনো সময় জন্ম নেওয়া সন্তানকে বৈধ ঘোষণা করা, যা শরীয়াহর ন্যূনতম গর্ভধারণকালের পরিপন্থী।ন্যূনতম ৬ মাস গর্ভধারণের মূলনীতি যুক্ত করা এবং ডিএনএ (DNA) টেস্টের মাধ্যমে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণের সংশোধিত ধারা প্রণয়ন।-৩মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১ - ধারা ৪দাদা জীবিত থাকা অবস্থায় মৃত সন্তানের সন্তানদের সরাসরি সমান মিরাস প্রদান, যা ফারায়েজের মূল নীতি লঙ্ঘন করে।ধারা ৪ সংশোধন করে শরীয়াহ-সম্মত ‘অসিয়তে ওয়াজিবাহ’ (Obligatory Bequest)-এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ $\frac{1}{3}$ অংশ নিশ্চিত করা।৪তামাদি আইন, ১৯০৮ - অনুচ্ছেদ ১০৩ ও ১০৪দেনমোহর আদায়ে তালাক বা মৃত্যুর পর মাত্র ৩ বছরের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় অধিকার তামাদি হয়ে যায়।দেনমোহরকে স্ত্রীর একটি অপরিশোধ্য চিরস্থায়ী ঋণ (Debt) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ৩ বছরের আইনি তামাদির সীমাবদ্ধতা বিলুপ্ত করা।৫দণ্ডবিধি, ১৮৬০ - ধারা ৪৯৭পরকীয়া ও ব্যভিচারকে চরম বৈষম্যমূলক ও লিঙ্গ-অসমভাবে সংজ্ঞায়িত করা, যেখানে নারীর সাজার কোনো বিধান নেই।ব্যভিচারকে একটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নৈতিক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে ধারা ৪৯৭ সম্পূর্ণরূপে সংস্কার ও যৌক্তিক শাস্তি কাঠামো স্থাপন করা।৬অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩খেলাপি ঋণের ওপর চক্রবৃদ্ধি বা দণ্ড সুদ আরোপের আইনি বৈধতা রয়েছে, যা শরীয়াহর ‘রিবা’ (সুদ) নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী।চক্রবৃদ্ধি সুদের পরিবর্তে প্রকৃত ক্ষতিপূরণ বা ‘তাউইদ’ (Ta'widh) এবং সংগৃহীত জরিমানা দাতব্য বা সামাজিক কল্যাণ তহবিলে প্রদানের বাধ্যবাধকতা।-৭দণ্ডবিধি, ১৮৬০ - ধারা ৩০০ (ব্যতিক্রম ১)'চরম ও আকস্মিক উত্তেজনার' অজুহাতে স্ত্রীকে হত্যার ক্ষেত্রে পুরুষদের সাজা এড়ানোর বা লঘু সাজার সুযোগ রাখা হয়েছে।ব্যক্তিপর্যায়ে আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ বাতিল করা এবং বৈবাহিক অসততার ক্ষেত্রে কুরআনের ‘লিয়ান’ (Li'an) আইনি প্রক্রিয়া যুক্ত করা।৮চুক্তি আইন, ১৮৭২ - ধারা ২৩ফাটকাবাজি, চরম অস্পষ্টতা ও জুয়াসদৃশ বাণিজ্যিক চুক্তিকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে।ধারা ২৩ সংশোধন করে চুক্তিতে চরম অনিশ্চয়তা বা ‘ঘোরার’ (Gharar) এবং ‘মাইসির’ (জুয়া) উপাদান নিষিদ্ধকরণের ধারা যুক্ত করা।-৯সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ - ডিজিটাল প্রমাণভিডিও, অডিও রেকর্ড বা ডিএনএ টেস্টের মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রমাণের গভীরতা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণকে শরীয়াহর ‘কারীনাহ’ (Circumstantial Evidence) এবং ‘বাইয়্যিনাহ’ (স্পষ্ট প্রমাণ)-এর মূলনীতির সাথে সমন্বয় করে ফ্রেমওয়ার্ক গঠন।-১০তামাদি আইন, ১৯০৮ - অনুচ্ছেদ ৫৬-৫৭পাওনাদার ৩ বছরের মধ্যে ঋণের টাকা আদায়ের আইনগত ব্যবস্থা না নিলে সেই ঋণ আদায়ে মামলা করার অধিকার নষ্ট হয়ে যায়।মুসলিমদের পারস্পরিক ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দেনা-পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে আইনি তামাদির সময়সীমা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা।-১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ - ধারা ৩০২ (খুন/হত্যা) বনাম কিসাস ও দিয়তপ্রচলিত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের শাস্তি হিসেবে কেবল মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইনটি ভুক্তভোগীর পরিবারের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এখানে মামলার মূল পক্ষ হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র বনাম আসামি, যেখানে নিহতের প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের অধিকার ও মানবিক অনুভূতি উপেক্ষিত থাকে।ইসলামী ফৌজদারি বিধিমালা (কিসাস ও দিয়ত) অনুযায়ী, খুনের মামলায় অপরাধীর শাস্তি মওকুফ করা বা রক্তপণ (দিয়ত) গ্রহণের চূড়ান্ত অধিকার নিহতের উত্তরাধিকারীদের দেওয়া হয়েছে। সমন্বয় প্রস্তাবের আওতায় ৩০২ ধারায় কিসাস ও দিয়তের আইনি বিধান যুক্ত করা উচিত। এর ফলে নিহতের পরিবার চাইলে আদালতের মধ্যস্থতায় আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে বা নিঃশর্তভাবে খুনিকে ক্ষমা করতে পারবে। এটি পারিবারিক ও সামাজিক শত্রুতা হ্রাস করার পাশাপাশি অপরাধীর প্রকৃত সংশোধনের পথ সুগম করবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।২. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ - ধারা ১১২ (সন্তানের বৈধতা) বনাম শরীয়ার গর্ভধারণকালবিদ্যমান সাক্ষ্য আইনের ১১২ ধারা অনুযায়ী, বিয়ের পর বা বিবাহবিচ্ছেদের ২৮০ দিনের মধ্যে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ বলে গণ্য হয় (যদি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শারীরিক মিলনের সুযোগ প্রমাণিত থাকে)। এমনকি বিয়ের ১ দিন পর সন্তান জন্ম নিলেও তা আইনত বৈধ হয়ে যায়। অথচ শরীয়া আইনশাস্ত্র এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান উভয় মতেই, গর্ভধারণের ন্যূনতম স্বাভাবিক সময়কাল ৬ মাস। তাই বিয়ের পর ৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বাভাবিক গর্ভধারণের নিয়মে বৈধ হতে পারে না।এই চরম অসঙ্গতি দূরীকরণে ধারা ১১২ সংশোধন করে শরীয়ার ন্যূনতম ৬ মাস গর্ভধারণের মূলনীতি যুক্ত করতে হবে। একই সাথে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ডিএনএ (DNA) টেস্টের বিধানকে আইনগত ও পদ্ধতিগত বৈধতা দিয়ে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণের একটি সংশোধিত ধারা প্রণয়ন করতে হবে, যা অন্যায় অপবাদ এবং সামাজিক নৈরাজ্য থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করবে।৩. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ - ধারা ৪ (উত্তরাধিকার) বনাম শরীয়ার মিরাস নীতি১৯৬১ সালের বিতর্কিত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা অনুযায়ী, মৃত সন্তানের ছেলে-মেয়েরা তাদের দাদা জীবিত থাকা অবস্থায় উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের মৃত মা-বাবার সমপরিমাণ অংশ সরাসরি লাভ করে। এটি শরীয়ার প্রধানতম ঐকমত্যপূর্ণ মিরাস নীতি "নিকটবর্তী উত্তরাধিকারীর উপস্থিতিতে দূরবর্তী উত্তরাধিকারী বঞ্চিত হবে" (nearer excludes remote)-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং মিরাস ব্যবস্থার সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্টকারী।এই সমস্যার একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক সমন্বয় প্রস্তাব হলো—ধারা ৪ বাতিল করে এর স্থলে ইসলামী আইনশাস্ত্রের ‘অসিয়তে ওয়াজিবাহ’ (Obligatory Bequest)-এর আইনি বিধান প্রবর্তন করা। এর মাধ্যমে এতিম নাতি-নাতনিদের জন্য মৃত দাদা তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ($\frac{1}{3}$) বাধ্যতামূলক অসিয়ত হিসেবে রেখে যাবেন। এটি এতিম শিশুদের যথাযথ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেবে এবং আল্লাহর নির্ধারিত মূল মিরাস ব্যবস্থার সামগ্রিক ভারসাম্যও অক্ষুণ্ন রাখবে।৪. তামাদি আইন, ১৯০৮ - দেনমোহর আদায়ের সময়সীমা বনাম শরীয়ার দেনমোহর নীতিপ্রচলিত তামাদি আইনের অনুচ্ছেদ ১০৩ ও ১০৪ অনুযায়ী, দেনমোহর দাবির বা বিবাহবিচ্ছেদের মাত্র ৩ বছরের মধ্যে মামলা না করলে স্ত্রীর দেনমোহর পাওয়ার আইনি অধিকার তামাদি বা তামাদি আইনে বার (Time-barred) হয়ে যায়। কিন্তু শরীয়া আইন ও ফিকহের অমোঘ নীতি অনুযায়ী, দেনমোহর স্ত্রীর একটি অপরিশোধ্য চিরস্থায়ী ঋণ (Debt)। এটি স্বামীর মৃত্যুর পরও তার উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের পূর্বে সর্বাগ্রে শোধ করতে হয়।সমন্বয় প্রস্তাবের আওতায়, তামাদি আইনের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো সংশোধন করে দেনমোহর সংক্রান্ত মামলায় ৩ বছরের সময়সীমার বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে। এটিকে আজীবন দাবিযোগ্য এবং অলঙ্ঘনীয় ঋণ হিসেবে রাষ্ট্রীয় দেওয়ানি আইনে স্বীকৃতি দেওয়া আবশ্যক, যাতে কোনো মুসলিম নারী আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তার মোহরানা থেকে বঞ্চিত না হন।৫. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ - ধারা ৪৯৭ (পরকীয়া ও ব্যভিচার) বনাম শরীয়ার জেনা নীতিবিদ্যমান দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাটি চরম বৈষম্যমূলক ও অবৈজ্ঞানিক। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো বিবাহিত পুরুষ অন্য কোনো বিবাহিত নারীর সাথে তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক করলে তা কেবল পুরুষটির জন্য অপরাধ (যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর)। কিন্তু পুরুষটি যদি কোনো অবিবাহিত নারীর সাথে সম্পর্ক করে, তবে তা প্রচলিত আইনে কোনো অপরাধই নয়। তদুপরি, এই ধারায় ব্যভিচারে লিপ্ত নারীদের শাস্তির কোনো বিধানই রাখা হয়নি。 এটি শরীয়ার সর্বজনীন জেনা (ব্যভিচার) আইনের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং লিঙ্গ-সমতার সাংবিধানিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক।সমন্বয় প্রস্তাবের মাধ্যমে পরকীয়া ও ব্যভিচারকে একটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাকে সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করে শরীয়ার জেনা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নৈতিক ও শাস্তি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন, যা পারিবারিক কাঠামোর পবিত্রতা রক্ষা করবে।৬. অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ - চক্রবৃদ্ধি সুদ বনাম রিবা (Riba) নিষেধাজ্ঞাপ্রচলিত ব্যাংকিং ও দেওয়ানি আইনে খেলাপি ঋণের ওপর চক্রবৃদ্ধি বা দণ্ড সুদ আরোপের আইনি বৈধতা রয়েছে। কিন্তু ইসলামী আইন ও ফিকহে ‘রিবা’ (সুদ) সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং গ্রহীতার ওপর সুদের ওপর সুদ চাপানো চরম জুলুম ও শোষণের নামান্তর।সমন্বয় প্রস্তাবের মাধ্যমে অর্থ ঋণ আদালত আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধন করে শরীয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে চক্রবৃদ্ধি সুদের পরিবর্তে প্রকৃত ক্ষতিপূরণ বা ‘তাউইদ’ (Ta'widh) নীতি প্রবর্তন করতে হবে। একই সাথে, খেলাপিদের ওপর আরোপিত জরিমানা বা জরিমানা সংগৃহীত অর্থ সরাসরি ব্যাংকের আয়ের অংশ না করে তা দাতব্য বা সামাজিক কল্যাণ তহবিলে প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা উচিত, যা শোষণমুক্ত কল্যাণকামী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।৭. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ - ধারা ৩০০-এর ব্যতিক্রম ১ বনাম শরীয়ার লিয়ান বিধিদণ্ডবিধির ধারা ৩০০-এর ব্যতিক্রম ১ অনুযায়ী, 'চরম ও আকস্মিক উত্তেজনার' কারণে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটলে তা 'খুন' হিসেবে গণ্য না হয়ে লঘু দণ্ডযোগ্য অপরাধ হয়। এই আইনি ফাঁকটি পরকীয়ার অভিযোগে স্ত্রীকে হত্যার ক্ষেত্রে পুরুষদের সাজা এড়ানোর বা সাজা কমানোর একটি নোংরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু শরীয়া আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বিচারিক কর্তৃপক্ষ ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হত্যা করার কোনো সুযোগ নেই। স্ত্রীর চারিত্রিক স্খলনের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘লিয়ান’ (Li'an) ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।সমন্বয় প্রস্তাবের মাধ্যমে দণ্ডবিধির ৩০০ ধারার এই ব্যতিক্রমী সুযোগটি সম্পূর্ণ বাতিল বা কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে। বৈবাহিক অসততার ক্ষেত্রে কুরআনিক ‘লিয়ান’ প্রক্রিয়াকে সিভিল কোডে সুনির্দিষ্ট করে ব্যক্তিপর্যায়ে বিচারহীন হত্যাকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে হবে।৮. চুক্তি আইন, ১৮৭২ - ধারা ২৩ বনাম শরীয়ার ঘোরার (Gharar) নীতিপ্রচলিত চুক্তি আইনের ২৩ ধারায় স্পষ্ট অবৈধ চুক্তির কথা থাকলেও অতিরিক্ত ফাটকাবাজি (Speculation), চরম অস্পষ্টতা বা জুয়াসদৃশ আধুনিক বাণিজ্যিক চুক্তি (যেমন ভবিষ্যৎ বিক্রয় বা শর্ট সেলিং) আইনিভাবে বৈধ। কিন্তু শরীয়া অনুযায়ী এগুলো 'ঘোরার' (চরম অনিশ্চয়তা) এবং 'মাইসির' (জুয়া) এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ফাসিদ বা বাতিলযোগ্য চুক্তি।সমন্বয় প্রস্তাবের আওতায়, চুক্তি আইনের ধারা ২৩ সংশোধন করে বাণিজ্যিক চুক্তিতে চরম অনিশ্চয়তা, ধোঁকাবাজি এবং জুয়াসদৃশ উপাদান নিষিদ্ধ করার শর্তারোপ করতে হবে। এটি মুক্ত, স্বচ্ছ এবং বাস্তব সম্পদ-ভিত্তিক বাজার অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করবে এবং আর্থিক খাতের চরম মন্দা বা সংকট প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।৯. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ - ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা বনাম শরীয়ার কারীনাহ২০২২ সালের সংশোধনের পরও প্রচলিত সাক্ষ্য আইনে ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণের (যেমন ভিডিও, অডিও রেকর্ড, ডিএনএ টেস্ট) বিশ্বাসযোগ্যতার গভীরতা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে শরীয়াভিত্তিক মানদণ্ডের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।সমন্বয় প্রস্তাবের আওতায়, সাক্ষ্য আইনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলোকে শরীয়া আইনশাস্ত্রের ‘কারীনাহ’ (পারিপার্শ্বিক বা পরোক্ষ প্রমাণ) এবং ‘বাইয়্যিনাহ’ (স্পষ্ট প্রমাণ)-এর মূলনীতির সাথে সমন্বয় করে একটি ‘সমন্বিত ডিজিটাল এভিডেন্স ফ্রেমওয়ার্ক’ (Shariah-Compliant Digital Evidence Framework - SCDEF) দাঁড় করানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রমাণাদির সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্যতা ও আইনি উপযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।১০. তামাদি আইন, ১৯০৮ - ঋণ পরিশোধের সীমাবদ্ধতা বনাম শরীয়ার অমোঘ ঋণ নীতিতামাদি আইনের অনুচ্ছেদ ৫৬-৫৭ অনুযায়ী, পাওনাদার ৩ বছরের মধ্যে ঋণের টাকা আদায়ের আইনগত ব্যবস্থা না নিলে সেই ঋণ আদায়ে দেওয়ানি মামলা করার আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলে। অথচ শরীয়া অনুযায়ী, ঋণ কখনও তামাদি বা মাফ হয় না। এটি পরিশোধ করা ইমান ও পরকালের সাথে সম্পৃক্ত অমোঘ নৈতিক দায়িত্ব, যা মৃত্যুর পরও মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে সর্বাগ্রে উসুল করতে হবে।সমন্বয় প্রস্তাবের মাধ্যমে তামাদি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে মুসলিমদের পারস্পরিক ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দেনা-পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে আইনি তামাদির সময়সীমা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে পাওনাদার যেন তার আইনগত ও নৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐতিহাসিক অঙ্গীকারের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে এবং ইসলামী মূল্যবোধ বান্ধব সরকার প্রধান পেয়েছে। এই গোল্ডেন মোমেন্টকে কাজে লাগিয়ে ঔপনিবেশিক আইনি জঞ্জাল থেকে মুক্তি লাভ এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকীদা ও মূলবোধের প্রতিফলন ঘটানোই হবে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের একমাত্র সার্থক পথ।লেখক: জয়নাল মাযহারীআইনজীবি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট কুমিল্লা।শরীয়া আইনের তুলনা গবেষক, লেখক বিশ্লেষক ও চিন্তক।ই-মেইল: joinalmajhari@gmail.com