প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
প্রতিদিন দশটি কফিন: এই মৃত্যুর মিছিল কি আমাদের ভাগ্যে লেখা?
মোহাম্মদ আলী সুমন ||
রংপুরের মচুয়াপাড়ায় শিক্ষক পরিবারের চারজনকে এক রাতে গলা কেটে হত্যা। লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন কন্যাকে কুপিয়ে খুন। ভৈরবে রাজনৈতিক নেতাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে মৃত্যু। এগুলো আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো এখন আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বলছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দশজন মানুষ খুন হচ্ছেন। মে থেকে জুলাই-মাত্র তিন মাসে ৯৩৪টি হত্যা মামলা। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ২ হাজার ৭৬টি। জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মেতে ৩১০, জুনে ৩২৬, জুলাইয়ে ২৯৮। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়-প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবারের চিরস্থায়ী অন্ধকার।নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। জনগণ আশা করেছিল পরিবর্তন। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের ছয় মাসে খুনের মামলা আগের ছয় মাসের তুলনায় বেড়েছে ৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি। চুরি-ডাকাতি কিছুটা কমলেও প্রাণহানির ধারাবাহিকতা অপরিবর্তিত। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছরের প্রথম সাত মাসে হত্যা মামলা বেড়েছে ১২৯টি। আর গত ছয় মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার ১৮টি ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। বাড়ির ভেতরেও আর নিরাপত্তা নেই।কেন এই রক্তপাত থামছে না? অস্ত্র এখন হাতের নাগালে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা খুনিদের বেপরোয়া করে তুলেছে। রাজনৈতিক কোন্দল চলছেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সাত মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মব সহিংসতায় মারা গেছেন ১৩৪ জন। জমি বিরোধ, মাদক, পারিবারিক কলহ-সব মিলে এক ভয়াবহ মিশ্রণ তৈরি করেছে। অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক উমর ফারুক স্পষ্ট বলেছেন, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই এই হত্যাকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি।পুলিশ বলছে, স্থানীয় বিবাদ আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো-বিশেষ অভিযান কোথায়? অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জোরালো উদ্যোগ কোথায়? দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা কোথায়? মিরপুরের শিশু রামিসা হত্যার বিচার ১৯ দিনে হয়েছে। সেই গতি যদি হাজার হাজার মামলায় দেখানো যেত, তাহলে অপরাধীরা এত নির্লজ্জভাবে খুন করতে সাহস পেত না। মানবাধিকারকর্মীরা ঠিকই প্রশ্ন তুলছেন-নির্বাচিত সরকারের আমলেও কেন এই দায় এড়ানো হচ্ছে?এই সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ। নাগরিকের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রথম কর্তব্য। সেই কর্তব্য পালিত হচ্ছে না। ফলে মানুষ বাড়ির দরজা বন্ধ করেও নিরাপদ বোধ করছে না। সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। আস্থা ভেঙে পড়ছে।এখন সময় এসেছে কঠোর সিদ্ধান্তের। দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে-ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে প্রাণহানির কারণ হতে দেওয়া যাবে না। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশকে নিরপেক্ষ ও সাহসীভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।প্রতিদিন দশটি কফিন তৈরি হচ্ছে এই দেশে। প্রতিটি কফিন এক একটি পরিবারের স্বপ্নকে মাটি চাপা দিচ্ছে। এই মৃত্যুর মিছিল থামানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি এখনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আগামীকালের সংবাদপত্রেও একই শিরোনাম দেখতে হবে-প্রতিদিন গড়ে দশ খুন। আর সেই শিরোনাম হবে আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার চিরস্থায়ী সাক্ষ্য।লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই