প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চীন-কিরগিজস্তান সম্পর্কের ‘স্বর্ণযুগ’ আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়
আন্তর্জাতিক: ||
কিরগিজস্তান সময় ৩১ আগস্ট সকালে, কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ বিশকেকের হারমনি প্রাসাদে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বিশকেকের শরতের আকাশ ছিল পরিষ্কার ও মনোরম। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী ফেং লি ইউয়ান গাড়িতে করে হারমনি প্রাসাদে পৌঁছালে প্রেসিডেন্ট জাপারভ ও তাঁর স্ত্রী আইগুল জাপারোভা তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
প্রেসিডেন্ট জাপারভ সি চিন পিংয়ের জন্য স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সি চিন পিং জাপারভের সঙ্গে মঞ্চে আরোহণ করেন। সামরিক ব্যান্ড চীন ও কিরগিজস্তানের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে। দুই রাষ্ট্রপ্রধান গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন। সি চিন পিং গার্ড অব অনারের মাঝ বরাবর এসে কিরগিজ ভাষায় গার্ড সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান। গার্ড সদস্যরা এর জবাবে বলেন, ‘অগ্রসর! অগ্রসর!’ পরে দুই রাষ্ট্রপ্রধান সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। এরপর দুই রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁদের স্ত্রীরা হারমনি প্রাসাদের মূল অংশে প্রবেশ করে দুই দেশের জাতীয় পতাকার সামনে যৌথ ছবি তোলেন।
স্বাগত অনুষ্ঠান শেষে দুই রাষ্ট্রপ্রধান বৈঠকে বসেন।
প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রথমে চীনা সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে কিরগিজস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানান।
সি চিন পিং বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পক্ষের যৌথ নেতৃত্বে চীন-কিরগিজস্তান সম্পর্ক দ্রুত উন্নত হয়েছে। সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়েছে, যা দুই দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি বছর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ১০৫তম বার্ষিকী এবং চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’র উদ্বোধনী বছর। চীন চীনা বৈশিষ্ট্যের আধুনিকীকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী দেশ গঠন ও জাতীয় পুনর্জাগরণের মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। কিরগিজস্তানও পূর্ণ শক্তিতে ‘২০৩০ সালের আগে জাতীয় উন্নয়ন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন করছে।
চীন কিরগিজস্তানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় জোরদার, শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় গভীর এবং আরও বাস্তবমুখী ও জনগণের কাছে দৃশ্যমান সহযোগিতার ফলাফল সৃষ্টি করতে প্রস্তুত বলে জানান সি চিন পিং। এর মাধ্যমে চীন-কিরগিজস্তান অভিন্ন ভবিষ্যৎ কমিউনিটি নির্মাণ আরও গভীর ও বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেন, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা ও দৃঢ় পারস্পরিক সমর্থন চীন-কিরগিজস্তান সম্পর্কের সুস্থ ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। চীন কিরগিজস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ় সমর্থন জানায় এবং দেশটির নিজস্ব জাতীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়াকে সমর্থন করে।
তিনি বলেন, দুই দেশের মূল স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে চীন কিরগিজস্তানের সঙ্গে দৃঢ় পারস্পরিক সমর্থন অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। চীন-কিরগিজস্তান চিরস্থায়ী শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর দুই দেশের চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব ও দৃঢ় পারস্পরিক সমর্থনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি প্রদান করবে।
সি চিন পিং আরও বলেন, দুই দেশের বাস্তবমুখী সহযোগিতা গভীর করতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা পরিকল্পনা ভালোভাবে বাস্তবায়ন, বাণিজ্যপণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল বাণিজ্য ও আন্তসীমান্ত ই-বাণিজ্যের মতো নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
তিনি চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথকে আঞ্চলিক জনগণের উন্নয়নের প্রত্যাশা বহনকারী ‘পরিবহনের প্রধান ধমনী’ হিসেবে উল্লেখ করে এর উচ্চমানের নির্মাণ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বন্দর আধুনিকীকরণ, ব্যবস্থাপনা, মান ও নিয়মের মতো ‘নরম সংযোগ’ গভীর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সম্পদ পুনর্ব্যবহার ও সবুজ খনিজ সহযোগিতায় আরও প্রকল্প বাস্তবায়ন, সমগ্র শিল্পশৃঙ্খলে সহযোগিতা, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ যৌথ পরীক্ষাগার নির্মাণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বানও জানান তিনি।
সি চিন পিং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যাতায়াত বাড়ানো এবং যুবসমাজ, গণমাধ্যম, পর্যটন, খেলাধুলা, চিকিৎসা ও স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন। এর মাধ্যমে চীন-কিরগিজস্তান বন্ধুত্বের সামাজিক ও জনসমর্থনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের উচিত আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণ, ‘তিনটি সন্ত্রাসী শক্তি’, মাদক পাচার ও আন্তসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে যৌথভাবে মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।
চীন কিরগিজস্তানকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে আরও বড় ভূমিকা পালনে সমর্থন জানায় এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার, চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ যৌথভাবে বাস্তবায়ন, আধিপত্যবাদ ও শক্তির রাজনীতির বিরোধিতা, প্রকৃত বহুপাক্ষিকতায় অটল থাকা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার রক্ষায় কিরগিজস্তানের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানান সি চিন পিং।
শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে চীন ও কিরগিজস্তানের থিয়েনচিন শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফল বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক যৌথ উন্নয়ন এবং সংস্থাটির উন্নয়নকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ বলেন, কিরগিজস্তানের ৩৫তম স্বাধীনতা দিবসে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে আতিথেয়তা করতে পেরে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছেন। এই সফর কিরগিজস্তান-চীনের গভীর বন্ধুত্ব ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থাকে আরও সুস্পষ্ট করেছে এবং দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
জাপারভ বলেন, কিরগিজস্তান ও চীন প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং প্রাচীন সিল্ক রোড দুই দেশকে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন যুগের সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্বের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশ করেছে এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, কিরগিজস্তানের উন্নয়নের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে চীন নিঃস্বার্থ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে এসেছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ১০৫তম বার্ষিকী এবং ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্বোধন উপলক্ষে তিনি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।
জাপারভ বলেন, চীনের শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ‘আমি আত্মনিবেদিত হয়ে জনগণকে কখনও হতাশ করব না’—এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মঙ্গোলিয়া শিখতে আগ্রহী। চীন কিরগিজস্তানের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার দিক এবং কিরগিজস্তানের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
তিনি বলেন, কিরগিজস্তান দৃঢ়ভাবে এক-চীন নীতি মেনে চলে এবং পারস্পরিক সম্মান, সাম্য ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে চীনের সঙ্গে চিরস্থায়ী শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক গভীর করতে প্রস্তুত।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, সবুজ অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও যুবসমাজের মধ্যে বিনিময় জোরদারের পাশাপাশি যৌথভাবে ‘তিনটি সন্ত্রাসী শক্তি’ মোকাবিলা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় চীনের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
কিরগিজস্তান-চীন-উজবেকিস্তান রেলপথ নির্মাণকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নিয়ে এটিকে নতুন যুগের ‘ইস্পাত রেশমপথ’ ও কিরগিজস্তান-চীন বন্ধুত্বের নতুন সেতুতে পরিণত করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন জাপারভ।
তিনি আরও বলেন, সি চিন পিংয়ের উত্থাপিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ যৌথ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আরও ন্যায্য ও স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে সহায়তা করছে। কিরগিজস্তান জাতিসংঘ, শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, চীন-মধ্য এশিয়া প্রক্রিয়া এবং বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থাসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করতে প্রস্তুত।
বৈঠকে জাপারভ কিরগিজ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে চীনের সিচাংয়ের জিরং এলাকায় ভূমিধসে সৃষ্ট দুর্যোগে গভীর সমবেদনা জানান। সি চিন পিং এ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকার দেশে-বিদেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার, দুর্যোগপীড়িতদের স্থানান্তর ও পুনর্বাসন, আহতদের চিকিৎসা এবং গৌণ দুর্যোগ প্রতিরোধে পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাজ করছে। চীন নেপালকেও জরুরি সহায়তা দিয়েছে বলেও তিনি জানান।
বৈঠকের পর দুই রাষ্ট্রপ্রধান যৌথভাবে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ও কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে নতুন যুগের সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্বের উচ্চমানের উন্নয়ন সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণা’ এবং ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ও কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে চিরস্থায়ী শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন।
এ ছাড়া বিনিয়োগ, পরিবহন, শুল্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ শহরসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা-সংক্রান্ত নথি বিনিময় প্রত্যক্ষ করেন দুই রাষ্ট্রপ্রধান। সফরকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, মানবিক বিষয় ও গণমাধ্যমসহ ২০টির বেশি ক্ষেত্রে সহযোগিতা-সংক্রান্ত নথি স্বাক্ষর করে দুই পক্ষ।
ঐদিন দুপুরে প্রেসিডেন্ট জাপারভ ও আইগুল জাপারোভা হারমনি প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও ফেং লি ইউয়ানের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন।
সাই ছি ও ওয়াং ই-সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: স্বর্ণা-তৌহিদ-লিলি, চায়না মিডিয়া গ্রুপ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই