প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাবেক রাষ্টপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ ছিলেন গণতন্ত্রের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু
মোহাম্মদ আলী সুমন। ||
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার খেলা যখন প্রায়শই প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করেছে, তখন কিছু মানুষ ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, ক্ষমতা তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করেনি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি শুধু দেশের ষষ্ঠ প্রধান বিচারপতি বা দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যিনি সংকটকালে রাষ্ট্রকে ভারসাম্যে রেখেছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-গণতন্ত্রের প্রকৃত রক্ষাকবচ কোনো দল বা নেতা নয়, বরং নীতিবোধসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি।১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পিতা তালুকদার রেসাত আহমেদ ভূঁইয়া ছিলেন স্থানীয় সমাজসেবী। শৈশবে নান্দাইলে বোনের বাড়িতে বেড়ে ওঠার সময় যে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তিনি আত্মস্থ করেছিলেন, তা পরবর্তী জীবনে তাঁর নৈতিক কম্পাস হয়ে উঠেছিল। পড়াশোনায় মেধার ছাপ স্পষ্ট-১৯৪৫ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, ১৯৪৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অক্সফোর্ডে উচ্চতর শিক্ষা-এসব অর্জন তাঁকে কেবল যোগ্য প্রশাসকই বানায়নি, গভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিও দিয়েছিল।প্রশাসন ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৬০ সালে বিচার বিভাগে স্থানান্তর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জেলা জজ থেকে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার, ১৯৭২ সালে হাইকোর্টের বিচারক, ১৯৮০ সালে আপিল বিভাগ-ধাপে ধাপে তিনি বিচারব্যবস্থার শীর্ষে পৌঁছান। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় শুধু পদোন্নতিতে নয়, রায়ে নিহিত। অষ্টম সংশোধনী মামলায় তাঁর পর্যবেক্ষণ আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা শুধু আইনি মতামত ছিল না-একটি রাজনৈতিক সতর্কবাণীও বটে। ১৯৮৩ সালের ছাত্রহত্যা তদন্ত কমিশন বা ১৯৮৪ সালের জাতীয় বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দেখিয়েছিলেন, দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতাই তাঁর মূলমন্ত্র।১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দেশ অস্থির হয়ে ওঠে। এরশাদের পতনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা এত গভীর ছিল যে, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নটি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তে সবাই একমত হয় সাহাবুদ্দীন আহমেদের নামে। ৬ ডিসেম্বর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তাঁর অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচন কেবল একটি ভোটগ্রহণ ছিল না-এটি ছিল গণতন্ত্রে ফিরে আসার প্রতীকী পদক্ষেপ। বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ কালো আইন সংশোধনের মাধ্যমে তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন শেষে তিনি আবার প্রধান বিচারপতির আসনে ফিরে যান-ক্ষমতার লোভ তাঁকে স্পর্শ করেনি।১৯৯৬ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েও তিনি নির্বাহী ক্ষমতার সীমা মেনে চলেন। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রতীকী হলেও, তিনি তা নীতিভিত্তিক করে তোলেন। বিতর্কিত জননিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানো তাঁর সাহসের উজ্জ্বল উদাহরণ। ক্ষমতাসীন দলের অসন্তোষের মুখেও তিনি সংবিধানের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখেন। ২০০১ সালে মেয়াদ শেষ করে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেন-গুলশানের বাসায় নির্জন জীবন, গণমাধ্যম থেকে দূরে।ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন সংযত। পাঁচ সন্তানের জনক, স্ত্রী বেগম আনোয়ারা সাহাবুদ্দীনের মৃত্যু (২০১৮) এবং জ্যেষ্ঠ কন্যা ড. সিতারা পারভীনের ট্র্যাজিক মৃত্যু (২০০৫) তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। তবু তিনি কখনোই ব্যক্তিগত দুঃখকে জনসমক্ষে প্রদর্শন করেননি। ২০২২ সালের ১৯ মার্চ ৯২ বছর বয়সে সিএমএইচ-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বনানীতে স্ত্রীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন।সাহাবুদ্দীন আহমেদের প্রকৃত অবদান তাঁর পদবীতে নয়, বরং ক্ষমতার প্রতি তাঁর মনোভাবে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন বিচারক বা রাষ্ট্রপ্রধান কীভাবে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবক হতে পারেন। আজ যখন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তাঁর জীবন আমাদের এক কঠোর স্মরণিকা। গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল ভোটের জোরে নয়-নীতিবোধসম্পন্ন মানুষের সাহসে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ সেই সাহসের প্রতীক। তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার মূল্য চিরস্থায়ী।লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই