ঢাকা ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রূপসায় আলাইপুর কাজীর পুকুরের অজানা রহস্য

নাহিদ জামান, খুলনা প্রতিনিধিঃ এক সময় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে সুদুর ইরান থেকে ১২ জন আওলিয়া বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাদের প্রচেষ্টাই এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ১২ আওলিয়ার মধ্যে খান জাহান আলী( রাঃ) অন্যতম। তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশের খুলনা বাগেরহাট অঞ্চল কে বেছে নিয়েছিলে। তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে, ইসলামী শরিয়াত মোতাবেক তার রাজ্য পরিচালনা করতেন। তার রাজ্যে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন কাজীগন। সেই সময় কাজীদের অনেক সম্পত্তি ছিলো এদের মর্যাদা ছিলো অনেক অনেক বেশী। তারা সম্পত্তি এবং মর্যাদার গৌরবে অহংকারী হয়ে উঠেছিল। অনেক কাজী ইসলামী শরিয়াতের বাইরে গিয়ে ভোগ বিলাসে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের ইচ্ছা মত আইন তৈরি করতো। কথিত আছে কাজীদের বাড়ীর সামনে দিয়ে যাতায়েত করতে হলে ছাতা বন্ধ করে জুতা হাতে নিয়ে চুল না আচড়িয়ে মাথা নিচু করে যেতে হতো। এদের ছিলো অনেক পাইক পেয়াদা। এর ব্যাতিক্রম হলেই পাইক পেয়াদা দিয়ে ধরে এনে শাস্তি দিত কাজী।
খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর গ্রামে কাজীদের বাড়ী ছিলো লোকমুখে শোনা এখানে যত জমি ছিলো সবই নাকি এদের ছিলো। ঐ আমলে কাচা রাস্তা ছিলো। যাতাতের জন্য এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়েত করতে হলে নৌকাই ছিলো প্রধান মাধ্যম। কাজীরা বাহিরে কোথা গেলে বা আসলে যেখানে এসে নৌকায় উঠতেন বা নামতেন সেই জায়গাটি কাজীঘাটার নদী নামে নামকরন রয়েছে। যদিও কালের বিবর্তনের সাথে সাথে নদীটি সংকোচিত হয়ে ধ্বংস হয়ে ছোট বদ্ধ জলাশয়ে পরিনত হয়েছে। পানি চলাচলের জন্য নেই কোন ব্যাবস্থা। কালের বিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছু ধ্বংস হলেও এখনো এখানে রয়েছি কাজীর পুকুর নামে একটি পুকুর। শোনা যায় কাজীদের দুইটি পুকুর ছিলো। বাড়ির মধ্যের পুকুরে মহিলারা গোসল করতেন। আর বাহিরের পুকুরে পুরুষরা গোসল করতেন। যদিও বাড়ির ভেতরের পুকুরের কোন অস্তিস্থ পাওয়া যায় না। কিন্তু বাহিরের পুকুরটি এখনো তার নিজ জায়গায় কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। এই এলাকার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় এই পুকুরের ইতিহাস। যখন পুকুরটি ক্ষনন করা হয়েছিল কোন ক্রমেই পানি উঠছিল না পুকুরে। ঐ সময় যে কাজীর দায়িত্ব নিয়োজিত ছিলেন, তিনি খান জাহান আলী (রাঃ) দিঘি থেকে পানি এনে রাতে ছিটিয়ে দিয়ে ঘুমাতে যান সকালে ঘুম থেকে উঠে পুকুর পাড়ে এসে দেখেন পুকুর পানিতে পরিপুর্ন হয়ে গেছে। এই অঞ্চলে কোন বিয়ে শাদী হলে কাজীদের বললে তারা পুকুরের সামনে আসলে বিয়ের জন্য সোনার থালা বাটি সহ সকল কিছু ভেসে উঠতো। কাজ শেষ হলে ভাসিয়ে দিলে আবার ডুবে যেত। কাজীর এক পেয়াদা সকালে পুকুর পাড়ে আসলে পুকুরে দুইটি কুমির পাথর মাথায় নিয়ে ভেসে আছে দেখতে পেয়ে, কাজী কে খবর দিলে কাজী বন্দুক দিয়ে একটি কুমির কে গুলি করে। কুমিরটি মাথার পাথরটি পুকুর পাড়ে ফেলে দিয়ে উধাও হয়ে যায়। আর বাকী কুমিরটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। পরের দিন পুকুরপাড়ে কুমিরের চলে যাওয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। যেখানে চিহ্ন পাওয়া যায় সেখানে নাকি কেহ বাধ দিয়ে, বেধে রাখতে পারতো না। বর্তমানে সেখানে একটি মসজীদ তৌরি হয়েছে। মসজিদের নাম করন করা হয়েছে আলাইপুর কাজী পাড়া জামে মসজীদ।
গুলি করার পর কাজী সপ্ন দেখেছিলো আমরা এখানে এসেছিলাম থাকতে এবং মাজার তৈরি করতে। আমাদের থাকতে দিলি না অভিশাপে তোরা ধ্বংস হয়ে যাবি। পরে কাজীদের বংস ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যে পাথর টি কুমিরে ফেলে রেখে গিয়েছিল সেই পাথরটি আজও কালের সাক্ষি হয়ে পুকুর পাড়ে আছে। যদিও যেখানে পাথরটি ফেলে রেখে গিয়েছিল কুমির। সেখান থেকে পাথরটি এলাকাবাসী সরিয়ে রাস্তার পাশে রেখেছে কাজী পাড়া জামে মসজীদ তৈরির সময়। পাথরটি দেখতে ছোট হলেও একজনের পক্ষে উচু করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই পাথরটি ঘিরে মানুষের নানান কৌতুহলের শেষ নেই। পাথরটির কাছে বিভিন্ন সময় মানুষ টাকা পয়সা দেয়, বিভিন্ন মানত করে, পাথরের গায়ে তেল দিয়ে সেই তেল নিয়ে যায়, পাথর কে দুধ দিয়ে যায়। এগুলি করার কারনে পাথরটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু পাথরটি আবার ও সেই জায়গায় দেখা যায়। এলাকা বাসির দাবি পাথরটি খান জাহান আলী (রাঃ) এর সময়ের। এটিকে ভালোভাবে সংরক্ষন করা প্রয়োজন। এছাড়া এখানে মাটির নিচে খুড়লে আগের সময়ের ছোট ছোট ইট পাওয়া যায়। যাহা চুন সুড়কি দিয়ে গাথা। মাটির নিচে আর অনেক অজানা কিছু থাকতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে। তাই এটা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রূপসায় আলাইপুর কাজীর পুকুরের অজানা রহস্য

আপডেট সময় ০৬:৫৫:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২২

নাহিদ জামান, খুলনা প্রতিনিধিঃ এক সময় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে সুদুর ইরান থেকে ১২ জন আওলিয়া বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাদের প্রচেষ্টাই এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ১২ আওলিয়ার মধ্যে খান জাহান আলী( রাঃ) অন্যতম। তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশের খুলনা বাগেরহাট অঞ্চল কে বেছে নিয়েছিলে। তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে, ইসলামী শরিয়াত মোতাবেক তার রাজ্য পরিচালনা করতেন। তার রাজ্যে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন কাজীগন। সেই সময় কাজীদের অনেক সম্পত্তি ছিলো এদের মর্যাদা ছিলো অনেক অনেক বেশী। তারা সম্পত্তি এবং মর্যাদার গৌরবে অহংকারী হয়ে উঠেছিল। অনেক কাজী ইসলামী শরিয়াতের বাইরে গিয়ে ভোগ বিলাসে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের ইচ্ছা মত আইন তৈরি করতো। কথিত আছে কাজীদের বাড়ীর সামনে দিয়ে যাতায়েত করতে হলে ছাতা বন্ধ করে জুতা হাতে নিয়ে চুল না আচড়িয়ে মাথা নিচু করে যেতে হতো। এদের ছিলো অনেক পাইক পেয়াদা। এর ব্যাতিক্রম হলেই পাইক পেয়াদা দিয়ে ধরে এনে শাস্তি দিত কাজী।
খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর গ্রামে কাজীদের বাড়ী ছিলো লোকমুখে শোনা এখানে যত জমি ছিলো সবই নাকি এদের ছিলো। ঐ আমলে কাচা রাস্তা ছিলো। যাতাতের জন্য এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়েত করতে হলে নৌকাই ছিলো প্রধান মাধ্যম। কাজীরা বাহিরে কোথা গেলে বা আসলে যেখানে এসে নৌকায় উঠতেন বা নামতেন সেই জায়গাটি কাজীঘাটার নদী নামে নামকরন রয়েছে। যদিও কালের বিবর্তনের সাথে সাথে নদীটি সংকোচিত হয়ে ধ্বংস হয়ে ছোট বদ্ধ জলাশয়ে পরিনত হয়েছে। পানি চলাচলের জন্য নেই কোন ব্যাবস্থা। কালের বিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছু ধ্বংস হলেও এখনো এখানে রয়েছি কাজীর পুকুর নামে একটি পুকুর। শোনা যায় কাজীদের দুইটি পুকুর ছিলো। বাড়ির মধ্যের পুকুরে মহিলারা গোসল করতেন। আর বাহিরের পুকুরে পুরুষরা গোসল করতেন। যদিও বাড়ির ভেতরের পুকুরের কোন অস্তিস্থ পাওয়া যায় না। কিন্তু বাহিরের পুকুরটি এখনো তার নিজ জায়গায় কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। এই এলাকার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় এই পুকুরের ইতিহাস। যখন পুকুরটি ক্ষনন করা হয়েছিল কোন ক্রমেই পানি উঠছিল না পুকুরে। ঐ সময় যে কাজীর দায়িত্ব নিয়োজিত ছিলেন, তিনি খান জাহান আলী (রাঃ) দিঘি থেকে পানি এনে রাতে ছিটিয়ে দিয়ে ঘুমাতে যান সকালে ঘুম থেকে উঠে পুকুর পাড়ে এসে দেখেন পুকুর পানিতে পরিপুর্ন হয়ে গেছে। এই অঞ্চলে কোন বিয়ে শাদী হলে কাজীদের বললে তারা পুকুরের সামনে আসলে বিয়ের জন্য সোনার থালা বাটি সহ সকল কিছু ভেসে উঠতো। কাজ শেষ হলে ভাসিয়ে দিলে আবার ডুবে যেত। কাজীর এক পেয়াদা সকালে পুকুর পাড়ে আসলে পুকুরে দুইটি কুমির পাথর মাথায় নিয়ে ভেসে আছে দেখতে পেয়ে, কাজী কে খবর দিলে কাজী বন্দুক দিয়ে একটি কুমির কে গুলি করে। কুমিরটি মাথার পাথরটি পুকুর পাড়ে ফেলে দিয়ে উধাও হয়ে যায়। আর বাকী কুমিরটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। পরের দিন পুকুরপাড়ে কুমিরের চলে যাওয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। যেখানে চিহ্ন পাওয়া যায় সেখানে নাকি কেহ বাধ দিয়ে, বেধে রাখতে পারতো না। বর্তমানে সেখানে একটি মসজীদ তৌরি হয়েছে। মসজিদের নাম করন করা হয়েছে আলাইপুর কাজী পাড়া জামে মসজীদ।
গুলি করার পর কাজী সপ্ন দেখেছিলো আমরা এখানে এসেছিলাম থাকতে এবং মাজার তৈরি করতে। আমাদের থাকতে দিলি না অভিশাপে তোরা ধ্বংস হয়ে যাবি। পরে কাজীদের বংস ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যে পাথর টি কুমিরে ফেলে রেখে গিয়েছিল সেই পাথরটি আজও কালের সাক্ষি হয়ে পুকুর পাড়ে আছে। যদিও যেখানে পাথরটি ফেলে রেখে গিয়েছিল কুমির। সেখান থেকে পাথরটি এলাকাবাসী সরিয়ে রাস্তার পাশে রেখেছে কাজী পাড়া জামে মসজীদ তৈরির সময়। পাথরটি দেখতে ছোট হলেও একজনের পক্ষে উচু করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই পাথরটি ঘিরে মানুষের নানান কৌতুহলের শেষ নেই। পাথরটির কাছে বিভিন্ন সময় মানুষ টাকা পয়সা দেয়, বিভিন্ন মানত করে, পাথরের গায়ে তেল দিয়ে সেই তেল নিয়ে যায়, পাথর কে দুধ দিয়ে যায়। এগুলি করার কারনে পাথরটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু পাথরটি আবার ও সেই জায়গায় দেখা যায়। এলাকা বাসির দাবি পাথরটি খান জাহান আলী (রাঃ) এর সময়ের। এটিকে ভালোভাবে সংরক্ষন করা প্রয়োজন। এছাড়া এখানে মাটির নিচে খুড়লে আগের সময়ের ছোট ছোট ইট পাওয়া যায়। যাহা চুন সুড়কি দিয়ে গাথা। মাটির নিচে আর অনেক অজানা কিছু থাকতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে। তাই এটা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন।