ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরল ৪০২ প্রাণ, দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই নিহত হয়েছেন ৪০২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৯৪ জন। বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার তালিকায় সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল মোটরসাইকেল।বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন।প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে কর্মস্থলে ফেরা ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে সারাদেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত ও ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হন। একই সময়ে ৩১টি রেল দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত এবং ১৭টি নৌ দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ জন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। ঈদের সময়ে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত ও ১৮০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের হার ছিল ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ২১ শতাংশ, বাস ১৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ, অবৈধ ব্যাটারিচালিত যান ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, কার ও মাইক্রোবাস ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ, নছিমন-করিমন ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং সিএনজি অটোরিকশা ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।গত বছরের ঈদুল আজহার তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত এবং ১ হাজার ১৮২ জন আহত হয়েছিলেন।দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৪ শতাংশ দুর্ঘটনা মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে, ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কার ঘটনায়, ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এবং বাকিগুলো অন্যান্য কারণে সংঘটিত হয়েছে।স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক ৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ ফিডার সড়কে ঘটেছে। এছাড়া ঢাকা মহানগরে ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম মহানগরে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ এবং রেলক্রসিংয়ে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে বৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হওয়া গর্ত, ভাঙাচোরা অবকাঠামো, চালকদের আইন অমান্যের প্রবণতা এবং বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল চলাচল দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়া চালক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একটানা ও বিশ্রামহীনভাবে চালানো হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।তিনি জানান, ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার পর ৮০ জন চালক জনরোষের শিকার হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী, ৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন শিক্ষক, ১ জন চিকিৎসক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে— জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অবাধ চলাচল, সড়কে রোড সাইন ও মার্কিংয়ের অভাব, মিডিয়ান ও ডিভাইডার না থাকা, নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, উল্টোপথে যান চলাচল, চাঁদাবাজি এবং দীর্ঘ সময় বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো।প্রাণহানি কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা চালু করা, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, ফিটনেস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবহন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সাবেক সচিব ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক, যাত্রী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম মহাসচিব অর্পনা রায় দাশ, অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল, দপ্তর সম্পাদক আলমগীর কবির লিটুসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড: মাত্র ১৯ দিনেই বিচার সম্পন্ন, নজিরবিহীন দ্রুততায় রায়
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বহুল আলোচিত এই মামলার রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ সচেতন নাগরিকরা।রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে আসামি স্বপ্না খাতুনকে আদালতে আনা হয়। পরে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে প্রিজনভ্যানে করে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় এবং রায় ঘোষণার আগে এজলাসে তোলা হয়। বেলা ১১টার পর বিচারক রায়ের বিস্তারিত অংশ পাঠ শুরু করেন।দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে, যা বিচারিক অঙ্গনে বিরল এক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত ১৯ মে সংঘটিত হয় হৃদয়বিদারক এ ঘটনা। পরদিন রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতা ও লাশ গুমে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়।ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে পুলিশ। মাত্র চার দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়। এরপর ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণে ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন আসামিরা। পরে ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।মামলার এজাহার অনুযায়ী, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার বাসা থেকে বের হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী স্বপ্না খাতুন তাকে কৌশলে নিজের বাসায় নিয়ে যান। কিছু সময় পর মেয়েকে স্কুলে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে সোহেলের বাসার সামনে রামিসার জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয় পরিবারের সদস্যদের। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বালতির ভেতরে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তারা।খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে।নৃশংসতা, বর্বরতা ও মানবিক মূল্যবোধকে নাড়িয়ে দেওয়া এই ঘটনার দ্রুত বিচার ও রায়ে একদিকে যেমন ক্ষতবিক্ষত পরিবার কিছুটা ন্যায়বিচারের আশ্বাস পেয়েছে, অন্যদিকে শিশু নির্যাতন ও নারী-শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা: ইতিহাসের অমোঘ মহাকাব্য
১৯৬৬ সালের ৭ জুন বাঙালির ইতিহাসে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর দিন নয়, এটি ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কৃত্রিম ও অন্যায্য কাঠামোর ভেতরে শোষিত এক জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। আজ সেই ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। ৬০ বছর আগের এই দিনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কেঁপে উঠেছিল স্বাধিকারের তীব্র দাবিতে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পদ্ধতিগত শোষণ, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো কিংবদন্তি নেতারা আজীবন লড়াই করেছেন। তবে ষাটের দশকে এসে সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে একটি সুনির্দিষ্ট, কাঠামোগত এবং আপসহীন রূপ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে তিনি উত্থাপন করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি, যা দ্রুতই রূপ নেয় বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক মুক্তির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির সনদে। এই কর্মসূচির মূল দর্শনটাই ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার-পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সম্পদ, রাজনীতি আর নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এ অঞ্চলের মানুষের হাতেই। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয়, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালে। সেই দিন স্বাধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসা হাজারো মানুষের ওপর টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তৎকালীন পুলিশ ও ইপিআর নির্বিচারে গুলি চালালে মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকসহ ১১ জন বীর বাঙালি শহীদ হন। এই রক্তের দাগই পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের চরিত্রকে চিরতরে ড্রয়িংরুমের রাজনীতি থেকে বের করে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও সাধারণ পেশাজীবীদের গণ-আন্দোলনে পরিণত করে এবং বাঙালি জাতিকে আপসহীন সংগ্রামের ধারায় ধাবিত করে।ইতিহাসের আলোকে এই ছয় দফার প্রতিটি দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত পাকিস্তানের সংবিধানের ভেতরে থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার এক চরম গণতান্ত্রিক লড়াই। কর্মসূচির প্রথম দফায় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়, যেখানে সরকার হবে সংসদীয় পদ্ধতির এবং আইনসভা নির্বাচিত হবে প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে; যা মূলত আইয়ুব খানের 'বেসিক ডেমোক্রেসি' বা নিয়ন্ত্রিত একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার মূল উৎস জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক চাবিকাঠি ছিল। দ্বিতীয় দফায় বলা হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়, এবং বাকি সব ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে; যার উদ্দেশ্য ছিল করাচি বা ইসলামাবাদে পুঞ্জীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে পূর্ব বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঔপনিবেশিক শাসন খর্ব করা। অত্যন্ত সংবেদনশীল অর্থনৈতিক দিকটি প্রতিফলিত হয়েছিল তৃতীয় দফায়, যেখানে দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা রাখার দাবি করা হয়, অথবা পুরো দেশের জন্য একটিই মুদ্রা থাকলে সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয় যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন বা পুঁজি পাচার হতে না পারে; কারণ ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার পাট ও চা বিক্রি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে গড়ে উঠছিল করাচি ও লাহোরের মতো শহর, আর এই দফাটি ছিল বাঙালির নিজস্ব অর্থ ব্যবস্থার এক অনন্য রক্ষাকবচ। চতুর্থ দফায় কর, শুল্ক বা রাজস্ব ধার্য এবং আদায়ের কোনো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে না রেখে তা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে দেওয়ার দাবি করা হয়, যেখান থেকে আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেল সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য তহবিল হিসেবে জমা হবে; কারণ তৎকালীন সময়ে সিংহভাগ রাজস্ব পূর্ব বাংলা থেকে আদায় হলেও তার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের পেছনে। পঞ্চম দফায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পৃথক হিসাব রাখার এবং স্বাধীনভাবে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়, যা কার্যকর হলে পূর্ব পাকিস্তান নিজের আয়ে নিজে সমৃদ্ধ হতে পারত এবং পশ্চিম পাকিস্তানের পরজীবী অর্থনীতি এক বড় ধাক্কা খেত। সর্বশেষ ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কার্যকরভাবে একটি আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন এবং নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করার দাবি জানানো হয়; যার সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়, যখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও ভারতের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছয় দফা আন্দোলনই ছিল মূলত বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি এবং এক দফায় অর্থাৎ স্বাধীনতায় পৌঁছানোর একটা সুনিপুণ কৌশলগত সাঁকো। বঙ্গবন্ধু জানতেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কখনোই এই ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেবে না, আর তা না মানার অর্থই হলো পূর্ব বাংলার মানুষের সামনে এটি পরিষ্কার হয়ে যাওয়া যে পাকিস্তানের অধীনে কোনোদিন স্বাধিকার মিলবে না। শাসকগোষ্ঠী এই জনপ্রিয় আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে না পেরে শেষ অস্ত্র হিসেবে ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে ফাঁসি দেওয়ার চক্রান্ত করে, কিন্তু তা উল্টো গণমানুষের ক্ষোভকে দাবানলে রূপ দিয়ে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। এই গণ-আন্দোলনের জোয়ারেই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছয় দফার পক্ষে তাদের ঐতিহাসিক ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়। কিন্তু যখন পাকিস্তানি শাসকরা সেই গণতান্ত্রিক রায়কে বুলেটের মুখে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে, তখনই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতের পর শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যার অনিবার্য পরিণতিতে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ ছয় দশক পরও বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ জুনের গুরুত্ব একটুও ম্লান হয়নি, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল গভীর অর্থনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই মহান মাইলফলককে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতকে উদযাপন করা নয়, বরং যে শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন বুকে নিয়ে শহীদরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই আদর্শকে বর্তমান ও ভবিষ্যতে অক্ষুণ্ণ রাখার জাতীয় শপথ নেওয়া। ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবসে সকল শহীদের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।