ঢাকা ০৫:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রচিন্তক মু. নজরুল ইসলাম তামিজী

হোমোক্রেসি: নেতৃত্বের নৈতিক রেনেসাঁর সূচনা

দৈনিক মুক্তির সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রচিন্তক মু. নজরুল ইসলাম তামিজী বলেন, হোমোক্রেসি: নেতৃত্বের নৈতিক রেনেসাঁর সূচনা।

মু. নজরুল ইসলাম তামিজী— কবি, সমাজতাত্ত্বিক, এবং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর উদ্ভাবিত রাষ্ট্রতত্ত্ব ‘হোমোক্রেসি’ ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তিনি বলছেন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক মোড়কে লুকিয়ে থাকা নেতৃত্বহীনতার যুগে হোমোক্রেসি হলো নৈতিক নেতৃত্ব ও জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রদর্শনের নাম।

মুক্তির লড়াই: আপনি যে হোমোক্রেসি তত্ত্ব দিয়েছেন, সেটিকে আপনি গণতন্ত্রের সংস্কার বলছেন না—বরং মৌলিক রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কেন?

তামিজী: কারণ হোমোক্রেসি কোনো প্যাঁচানো সংস্কার নয়, এটি নেতৃত্বের দর্শনে এক বৈপ্লবিক উত্তরণ। গণতন্ত্র বলে “কীভাবে শাসন করবেন”; হোমোক্রেসি বলে “কে শাসন করবেন”।
আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ভোট ও জনপ্রিয়তার জোরে এমন সব ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসছেন, যাদের মাঝে গুণ বা প্রজ্ঞার অভাব প্রকট।
আমি এই তত্ত্ব দিয়েছি একটি গভীর উপলব্ধি থেকে— রাষ্ট্র কেবল প্রক্রিয়া দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে মূল্যবোধ দিয়ে।
হোমোক্রেসি সেই মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্বের কাঠামো।

মুক্তির লড়াই: আপনি এই তত্ত্ব প্রথম দেন ২০০৪ সালে। তখন গণতন্ত্রকে নিয়ে এমন সরাসরি প্রশ্ন তোলা হত না। কী দেখেছিলেন আপনি?

তামিজী: হ্যাঁ, তখন ছিল এক নিঃশব্দ সংকটকাল। আমি দেখছিলাম—

ফর্ম ও কন্টেন্ট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

গণতন্ত্রের নামে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন (যেমন: ইরাক যুদ্ধ)।

যোগ্যতাহীন জনপ্রিয় নেতার উত্থান, যাদের হাতে ক্ষমতা নিরাপদ নয়।

নাগরিকদের বিচারবোধহীনতা, যেখানে মিডিয়া ও পুঁজি ভোটারকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমি উপলব্ধি করি, গণতন্ত্রের কাঠামোর ভিতরে থেকেই নতুন এক নৈতিক নেতৃত্বের তত্ত্ব প্রয়োজন— সেখানেই হোমোক্রেসির আবির্ভাব।

মুক্তির লড়াই: তাহলে হোমোক্রেসি গণতন্ত্রকে পুরোপুরি বাতিল করছে?

তামিজী: না, আমি গণতন্ত্র বাতিলের পক্ষে নই। বরং আমি গণতন্ত্রের আত্মাকে পুনরুদ্ধার করতে চাই।
যখন গণতন্ত্র গুণহীনতা, বংশবাদ, পেশিশক্তি আর মিথ্যার উৎসে পরিণত হয়— তখন সেটি জনগণের শাসন নয়, নাটক।
হোমোক্রেসি সেই নাটক ভেঙে সত্য নেতৃত্বের মঞ্চ নির্মাণ করে।

মুক্তির লড়াই: ‘হোমোক্রেসি’ শব্দটির উৎস কী?

তামিজী: এটি এসেছে গ্রিক শব্দ “Homo” (মানে মানুষ, তবে আমি তা মানবিকতা, নৈতিকতা, প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে নিয়েছি) এবং “Kratos” (শাসন) থেকে।
অতএব, হোমোক্রেসি মানে:

> “Those who are virtuous and wise — they shall govern.”
অর্থাৎ, নেতৃত্বের আসনে বসবে সেই ব্যক্তি, যিনি নৈতিক, গণমান্য ও জ্ঞানসম্পন্ন।

মুক্তির লড়াই: বাস্তবে কীভাবে এ তত্ত্ব কার্যকর হবে? রাজনীতিতে তো এখনো পেশিশক্তি আর টাকার দাপট।

তামিজী: এজন্য হোমোক্রেসি কেবল রাজনৈতিক নয়— এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও।
আমি একে বলি রাষ্ট্রের নৈতিক রেনেসাঁ।
যখন নাগরিকেরা মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠত্ব দেবে, তখনই নেতৃত্বের মান পাল্টাবে।
স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন— সবখানে নেতৃত্ব নির্বাচন হবে গুণ, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে। ধাপে ধাপে এটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রবেশ করবে।

মুক্তির লড়াই: আপনি কবি। কীভাবে কবিতা থেকে রাষ্ট্রচিন্তায় এলেন?

তামিজী: রাষ্ট্রে যদি কবিতা না থাকে, তাহলে তার শাসন হয় নিষ্ঠুর।
আর কবিতায় যদি রাষ্ট্র না থাকে, তবে সে কবিতা হয় আত্মমগ্ন।
আমার কবিতা, গবেষণা, এবং মাঠের অভিজ্ঞতা মিলেই আমাকে এই পথে এনেছে।
হোমোক্রেসি আসলে নেতৃত্বের কবিতা— আর রাষ্ট্রের জন্য এক শুদ্ধ গদ্য।

মুক্তির লড়াই: হোমোক্রেসি নিয়ে গবেষণা বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেমন?

তামিজী: ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বিদেশি গবেষণাপত্র হোমোক্রেসিকে post-democratic leadership theory হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশেও এটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
গঠন নয়, চেতনার বদল দরকার— হোমোক্রেসি সেই পরিবর্তনের দর্শন।

মুক্তির লড়াই: ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে হোমোক্রেসি কতটা সম্ভাবনাময়?

তামিজী: আমি বিশ্বাস করি, ২১শ শতকের মধ্যভাগে নৈতিক নেতৃত্বের বিপ্লব শুরু হবে।
যে পৃথিবী আজ দানবীয় জনপ্রিয়তায় নিমজ্জিত, সে একদিন গুণের পিপাসু হবে।
সেই দিন হোমোক্রেসি হয়ে উঠবে আলোকবর্তিকা।

মুক্তির লড়াই: তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা?

তামিজী: নিজেকে তৈরি করো— জ্ঞান, নৈতিকতা, ও মানবিকতা দিয়ে।
জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গুণ কখনও মুছে না।
হোমোক্রেসি সেই তরুণকেই চায়, যিনি নিজেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ।

ট্যাগস
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রচিন্তক মু. নজরুল ইসলাম তামিজী

হোমোক্রেসি: নেতৃত্বের নৈতিক রেনেসাঁর সূচনা

আপডেট সময় ০৩:১৩:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫

দৈনিক মুক্তির সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রচিন্তক মু. নজরুল ইসলাম তামিজী বলেন, হোমোক্রেসি: নেতৃত্বের নৈতিক রেনেসাঁর সূচনা।

মু. নজরুল ইসলাম তামিজী— কবি, সমাজতাত্ত্বিক, এবং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর উদ্ভাবিত রাষ্ট্রতত্ত্ব ‘হোমোক্রেসি’ ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তিনি বলছেন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক মোড়কে লুকিয়ে থাকা নেতৃত্বহীনতার যুগে হোমোক্রেসি হলো নৈতিক নেতৃত্ব ও জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রদর্শনের নাম।

মুক্তির লড়াই: আপনি যে হোমোক্রেসি তত্ত্ব দিয়েছেন, সেটিকে আপনি গণতন্ত্রের সংস্কার বলছেন না—বরং মৌলিক রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কেন?

তামিজী: কারণ হোমোক্রেসি কোনো প্যাঁচানো সংস্কার নয়, এটি নেতৃত্বের দর্শনে এক বৈপ্লবিক উত্তরণ। গণতন্ত্র বলে “কীভাবে শাসন করবেন”; হোমোক্রেসি বলে “কে শাসন করবেন”।
আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ভোট ও জনপ্রিয়তার জোরে এমন সব ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসছেন, যাদের মাঝে গুণ বা প্রজ্ঞার অভাব প্রকট।
আমি এই তত্ত্ব দিয়েছি একটি গভীর উপলব্ধি থেকে— রাষ্ট্র কেবল প্রক্রিয়া দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে মূল্যবোধ দিয়ে।
হোমোক্রেসি সেই মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্বের কাঠামো।

মুক্তির লড়াই: আপনি এই তত্ত্ব প্রথম দেন ২০০৪ সালে। তখন গণতন্ত্রকে নিয়ে এমন সরাসরি প্রশ্ন তোলা হত না। কী দেখেছিলেন আপনি?

তামিজী: হ্যাঁ, তখন ছিল এক নিঃশব্দ সংকটকাল। আমি দেখছিলাম—

ফর্ম ও কন্টেন্ট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

গণতন্ত্রের নামে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন (যেমন: ইরাক যুদ্ধ)।

যোগ্যতাহীন জনপ্রিয় নেতার উত্থান, যাদের হাতে ক্ষমতা নিরাপদ নয়।

নাগরিকদের বিচারবোধহীনতা, যেখানে মিডিয়া ও পুঁজি ভোটারকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমি উপলব্ধি করি, গণতন্ত্রের কাঠামোর ভিতরে থেকেই নতুন এক নৈতিক নেতৃত্বের তত্ত্ব প্রয়োজন— সেখানেই হোমোক্রেসির আবির্ভাব।

মুক্তির লড়াই: তাহলে হোমোক্রেসি গণতন্ত্রকে পুরোপুরি বাতিল করছে?

তামিজী: না, আমি গণতন্ত্র বাতিলের পক্ষে নই। বরং আমি গণতন্ত্রের আত্মাকে পুনরুদ্ধার করতে চাই।
যখন গণতন্ত্র গুণহীনতা, বংশবাদ, পেশিশক্তি আর মিথ্যার উৎসে পরিণত হয়— তখন সেটি জনগণের শাসন নয়, নাটক।
হোমোক্রেসি সেই নাটক ভেঙে সত্য নেতৃত্বের মঞ্চ নির্মাণ করে।

মুক্তির লড়াই: ‘হোমোক্রেসি’ শব্দটির উৎস কী?

তামিজী: এটি এসেছে গ্রিক শব্দ “Homo” (মানে মানুষ, তবে আমি তা মানবিকতা, নৈতিকতা, প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে নিয়েছি) এবং “Kratos” (শাসন) থেকে।
অতএব, হোমোক্রেসি মানে:

> “Those who are virtuous and wise — they shall govern.”
অর্থাৎ, নেতৃত্বের আসনে বসবে সেই ব্যক্তি, যিনি নৈতিক, গণমান্য ও জ্ঞানসম্পন্ন।

মুক্তির লড়াই: বাস্তবে কীভাবে এ তত্ত্ব কার্যকর হবে? রাজনীতিতে তো এখনো পেশিশক্তি আর টাকার দাপট।

তামিজী: এজন্য হোমোক্রেসি কেবল রাজনৈতিক নয়— এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও।
আমি একে বলি রাষ্ট্রের নৈতিক রেনেসাঁ।
যখন নাগরিকেরা মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠত্ব দেবে, তখনই নেতৃত্বের মান পাল্টাবে।
স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন— সবখানে নেতৃত্ব নির্বাচন হবে গুণ, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে। ধাপে ধাপে এটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রবেশ করবে।

মুক্তির লড়াই: আপনি কবি। কীভাবে কবিতা থেকে রাষ্ট্রচিন্তায় এলেন?

তামিজী: রাষ্ট্রে যদি কবিতা না থাকে, তাহলে তার শাসন হয় নিষ্ঠুর।
আর কবিতায় যদি রাষ্ট্র না থাকে, তবে সে কবিতা হয় আত্মমগ্ন।
আমার কবিতা, গবেষণা, এবং মাঠের অভিজ্ঞতা মিলেই আমাকে এই পথে এনেছে।
হোমোক্রেসি আসলে নেতৃত্বের কবিতা— আর রাষ্ট্রের জন্য এক শুদ্ধ গদ্য।

মুক্তির লড়াই: হোমোক্রেসি নিয়ে গবেষণা বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেমন?

তামিজী: ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বিদেশি গবেষণাপত্র হোমোক্রেসিকে post-democratic leadership theory হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশেও এটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
গঠন নয়, চেতনার বদল দরকার— হোমোক্রেসি সেই পরিবর্তনের দর্শন।

মুক্তির লড়াই: ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে হোমোক্রেসি কতটা সম্ভাবনাময়?

তামিজী: আমি বিশ্বাস করি, ২১শ শতকের মধ্যভাগে নৈতিক নেতৃত্বের বিপ্লব শুরু হবে।
যে পৃথিবী আজ দানবীয় জনপ্রিয়তায় নিমজ্জিত, সে একদিন গুণের পিপাসু হবে।
সেই দিন হোমোক্রেসি হয়ে উঠবে আলোকবর্তিকা।

মুক্তির লড়াই: তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা?

তামিজী: নিজেকে তৈরি করো— জ্ঞান, নৈতিকতা, ও মানবিকতা দিয়ে।
জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গুণ কখনও মুছে না।
হোমোক্রেসি সেই তরুণকেই চায়, যিনি নিজেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ।