ঢাকা ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী ১৬ হাজার ঘোষণার দাবি

শনিবার সকাল ১১টায় তোপখানা রোডস্থ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য নি¤œতম মজুরী বোর্ড গঠন এবং বেসিক ১৬,০০০ মোট ২৪,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরী ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন। বক্তব্য রাখেন, রফিকুল ইসলাম সুজন, বাহারাইনে সুলতান, কাজী মোহাম্মদ আলী, কামরুন নাহার, তপন সাহা, শফিকুল ইসলাম শামীম, শফিকুল ইসলাম, গোলাম কাদির, গোলাম রাব্বানী জামিল, আব্দুল্লাহ বাছির, আসাদ্জ্জুামান চৌধুরী, কাজী আবীর হোসাইন, রেহানা আক্তার ডলি, জাহাঙ্গীর মোল্লা, মোঃ মিলন শফিকুল আলম প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরে ২০১৮ সালের শেষে সর্বশেষ মজুরি ঘোষিত হয়েছিল। ইতিমধ্যে পাঁচ বছর শেষ হতে যাচ্ছে। এই পাঁচ বছরে দ্রব্যমূল্য ও গার্মেন্টসের রপ্তানি দুটোই বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি শ্রমিকের মজুরি। ফলে জীবন মানের উন্নয়ন তো দূরের কথা প্রয়োজনীয় খাদ্য কেনার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে শ্রমিকেরা।
আপনারা জানেন বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩৯ ধারা অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিম্নতম মজুরি নির্ধারনের বিধান এবং ১৪০ (ক) ধারায় বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুনভাবে মজুরি কাঠামো ঘোষণার বিধান আছে। কিন্তু কোন আইনের সুফলই গার্মেন্টস শ্রমিকরা পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকরাই নয়, সরকারি কর্মচারী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শিল্প সেক্টরের শ্রমিকরা মজুরি পুনঃনির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দেশের দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠনের জোট হিসেবে ‘গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ’ গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি ও ২০২৩ সালের গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য তাদের প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়।
করোনা পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রপ্তানিকারকদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু শ্রমিকরা এর কোনো সুফল পায়নি। অথচ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও নিত্যপণ্যের বর্ধিত মূল্যের বোঝার চেপেছে শ্রমিকদের ঘাঁড়ে। শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় জাতীয় মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির বিপরীতে শ্রমিকরা অপুষ্টি আর অনাহারে অমানবিকভাবে জীবন যাপন করছে।
আইএলও কনভেনশন ১৩১ এ বলা হয়েছে- সর্বনিম্ন মজুরি অবশ্যই আইন দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক ও তার পরিবারের প্রয়োজন, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। পাঁচ বছর পর পর মজুরি পুনঃনির্ধারণের আইন করা হয়েছে।
মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় আছে-জীবনযাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মুল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য, দেশের ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। শ্রম আইনে উল্লেখিত মানদন্ডসহ অন্যান্য গবেষণা বা তথ্যগুলো নিম্নরূপ:
১। সিপিডির রিপোর্ট অনুসারেঃ বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির হিসেব অনুসারে ৪ সদস্যের পরিবারের মাসিক খরচ ৪৭, ১৮২ টাকা। রেগুলার ডায়েট (মাছ, মুরগি/গরুর মাংস) অনুসারে বিবিএস খানা জরিপ অনুযায়ি ৪ জনের পরিবারের খাবার খরচ মাসিক পরবে বতর্মান বাজার দরে কমন ১৯ আইটেম ধরে ২৩, ৬৭৬ টাকা ও মাছ/মাংস ছাড়া শুধুমাত্র ডাল-ভাত, তেল-লবন-মরিচ (ঈড়সঢ়ৎবংংবফ উরবফ) গ্রহণে ঢাকা শহরে ৪ জনের পরিবারের খাবার খরচ ৯, ৫৫৭ টাকা লাগবে।
২। জাতিসংঘের হিসেবে পুষ্টিমান হিসেবে ১ জনের দৈনিক খাবার খরচ ২৭৬ টাকা। ৪ জনের পরিবার হলে ৩৩,১২০ টাকা। ৫ জনের পরিবার হলে লাগবে ৪১,৪০০ টাকা।
৩। ২০১৫ সালে সরকার ঘোষিত পে-স্কেল এর সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ৮২৫০ টাকা বেসিক ধরে সর্বমোট ১৩,৮০০ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল, বর্তমানে তা বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট ধরে ২১, ৫৭০ টাকা। মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতি ধরলে তা আরও বাড়বে।
৪। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন সকল তফসিল ব্যাংকের সর্বনিম্ন বেতন ২৯, ০০০ টাকা । শিক্ষানবীশকালিন ২৪ হাজার টাকা। এবং অফিস সহকারি, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সর্বনিম্ন বেতন ২৪ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
৫। গার্মেন্টস শিল্পে আমাদের প্রতিযোগি দেশসমুহের মজুরি মালয়েশিয়া -২৬৩ ডলার (২০২০), তুরস্ক -৩৫২ ডলার (২০২০), ভিয়েতনাম-১৯১ ডলার (২০২০), কম্বোডিয়া-২০০ ডলার (১ জানুয়ারি ২০২৩), চীন -২১৭ ডলার (২০২০), ভারত -১৬৮ ডলার (২০২০), পাকিস্থান-১১১ ডলার (২০২০), মিয়ানমার – ৯৪ ডলার (২০২০), বাংলাদেশ – ৭৫ ডলার (২০২০)।
৬। বিলসের গবেষণা: তাদের গবেষনায় এলাকা ভিত্তিক ৩ ধরনের মজুরি কাঠামো প্রস্তাব করেছে। বিলসের গবেষণা অনুযায়ী গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মান সম্পন্ন জীবনযাপনের জন্য মাসে ঢাকায় ২২, ৮০০ টাকা, ঢাকার পাশে স্যাটেলাইট সিটিতে ২১, ০০০ টাকা ও চট্রগ্রামে ২০, ৪০০ টাকা প্রয়োজন। তারা ৫ টি গ্রেড ও মহার্ঘ ভাতার প্রস্তাব করেছে।
৭। এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর গবেষণাঃ ২০২২ সালে বাংলাদেশে এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর গবেষণা অনুযায়ী একজন শ্রমিকের প্রতিদিন ৩০০০ কিলোক্যালরি গ্রহণের জন্য মাসিক খাদ্যদ্রব্যে খরচ হয় ১০,৭৫৪.০০ টাকা ও ব্যবহার্য দ্রব্যের খরচ হয় ১৩,৬১৯.০০ টাকা এবং সর্বমোট খরচ ২৪,৩৭৩.০০ টাকা। খাদ্যদ্রব্য ও ব্যাবহার্য্য দ্রব্যের আনুপাতিক হার ৪৪:৫৬। এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর উক্ত গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মানসম্মতভাবে বাঁচার মতো মজুরী হওয়া উচিৎ ৪০,৪৪২.০০ টাকা
৮। গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ’র প্রস্তাব: জীবনযাপন ব্যয় ও পুষ্টিমান, সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল-২০১৫, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলারে অফিস সহকারি ও শিক্ষানবিষের সর্বনিম্ন বেতন বিবেচনা করে (সিপিডি গবেষণা, এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর গবেষণা, গার্মেন্টস এর প্রতিযোগি দেশসমুহের সর্বনিম্ন মজুরি, সাম্প্রতিক ঘোষিত বিভিন্ন সেক্টরের মজুরি কাঠামো বিবেচনা করে) সর্বনিম্ন মজুরি ২৪ হাজার টাকা প্রস্তাব করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ। এই মজুরী আদায়ের জন্য ক্রেতা বা ব্র্যান্ডগুলোর সাথে সামাজিক সংলাপ অগ্রগতি লাভ করবে।
গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি ২৪ হাজার টাকার নিচে হলে কোনভাবে ন্যায্য মজুরি হবে না। আমরা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন ও শ্রমিকদের ন্যূনতম বেসিক ১৬ হাজার ও মোট মজুরি ২৪ হাজার টাকা ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি। আমরা মনে করি মজুরী নির্ধারিত হলে তৈরী পোশাক শিল্প নিয়ে দেশে বিদেশে যে নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে তাবন্ধ হবে এবং বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প গধফব ওহ ইধহমষধফবংয প্রচারণার দ্রুত সাফল্য অর্তিজত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নি¤েœাক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়। ১. অবিলম্বে মজুরী বোর্ড গঠন ও বেসিক ১৬ হাজার মোট ২৪ হাজার নূন্যতম মজুরী ঘোষণা। ২. গার্মেন্ট শ্রমিকদের বার্ষিক ১০% ইনক্রিমেন্ট ঘোষণা করতে হবে। ৩. গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৪. নূন্যতম মজুরী বোর্ডে অভিজ্ঞ সেক্টরল শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে। ৫. গার্মেন্টস শ্রমিকদের ৬ মাসের মাতৃকল্যাণ ছুটির আইন পাশ করতে হবে। ৬. বাংলাদেশ শ্রম আইনের সকল কালাকানুন আইন বাতিল করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন করতে হবে।
উল্লেখিত ৬ দফা দাবি আদায়ে আগামী ২৬ শে ফেব্রুয়ারি শ্রম প্রতিমন্ত্রী বরাবর স্মারক লিপি পেশ করা হবে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী ১৬ হাজার ঘোষণার দাবি

আপডেট সময় ০১:৩৩:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

শনিবার সকাল ১১টায় তোপখানা রোডস্থ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য নি¤œতম মজুরী বোর্ড গঠন এবং বেসিক ১৬,০০০ মোট ২৪,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরী ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন। বক্তব্য রাখেন, রফিকুল ইসলাম সুজন, বাহারাইনে সুলতান, কাজী মোহাম্মদ আলী, কামরুন নাহার, তপন সাহা, শফিকুল ইসলাম শামীম, শফিকুল ইসলাম, গোলাম কাদির, গোলাম রাব্বানী জামিল, আব্দুল্লাহ বাছির, আসাদ্জ্জুামান চৌধুরী, কাজী আবীর হোসাইন, রেহানা আক্তার ডলি, জাহাঙ্গীর মোল্লা, মোঃ মিলন শফিকুল আলম প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরে ২০১৮ সালের শেষে সর্বশেষ মজুরি ঘোষিত হয়েছিল। ইতিমধ্যে পাঁচ বছর শেষ হতে যাচ্ছে। এই পাঁচ বছরে দ্রব্যমূল্য ও গার্মেন্টসের রপ্তানি দুটোই বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি শ্রমিকের মজুরি। ফলে জীবন মানের উন্নয়ন তো দূরের কথা প্রয়োজনীয় খাদ্য কেনার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে শ্রমিকেরা।
আপনারা জানেন বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩৯ ধারা অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিম্নতম মজুরি নির্ধারনের বিধান এবং ১৪০ (ক) ধারায় বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুনভাবে মজুরি কাঠামো ঘোষণার বিধান আছে। কিন্তু কোন আইনের সুফলই গার্মেন্টস শ্রমিকরা পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকরাই নয়, সরকারি কর্মচারী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শিল্প সেক্টরের শ্রমিকরা মজুরি পুনঃনির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দেশের দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠনের জোট হিসেবে ‘গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ’ গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি ও ২০২৩ সালের গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য তাদের প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়।
করোনা পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রপ্তানিকারকদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু শ্রমিকরা এর কোনো সুফল পায়নি। অথচ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও নিত্যপণ্যের বর্ধিত মূল্যের বোঝার চেপেছে শ্রমিকদের ঘাঁড়ে। শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় জাতীয় মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির বিপরীতে শ্রমিকরা অপুষ্টি আর অনাহারে অমানবিকভাবে জীবন যাপন করছে।
আইএলও কনভেনশন ১৩১ এ বলা হয়েছে- সর্বনিম্ন মজুরি অবশ্যই আইন দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক ও তার পরিবারের প্রয়োজন, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। পাঁচ বছর পর পর মজুরি পুনঃনির্ধারণের আইন করা হয়েছে।
মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় আছে-জীবনযাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মুল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য, দেশের ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। শ্রম আইনে উল্লেখিত মানদন্ডসহ অন্যান্য গবেষণা বা তথ্যগুলো নিম্নরূপ:
১। সিপিডির রিপোর্ট অনুসারেঃ বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির হিসেব অনুসারে ৪ সদস্যের পরিবারের মাসিক খরচ ৪৭, ১৮২ টাকা। রেগুলার ডায়েট (মাছ, মুরগি/গরুর মাংস) অনুসারে বিবিএস খানা জরিপ অনুযায়ি ৪ জনের পরিবারের খাবার খরচ মাসিক পরবে বতর্মান বাজার দরে কমন ১৯ আইটেম ধরে ২৩, ৬৭৬ টাকা ও মাছ/মাংস ছাড়া শুধুমাত্র ডাল-ভাত, তেল-লবন-মরিচ (ঈড়সঢ়ৎবংংবফ উরবফ) গ্রহণে ঢাকা শহরে ৪ জনের পরিবারের খাবার খরচ ৯, ৫৫৭ টাকা লাগবে।
২। জাতিসংঘের হিসেবে পুষ্টিমান হিসেবে ১ জনের দৈনিক খাবার খরচ ২৭৬ টাকা। ৪ জনের পরিবার হলে ৩৩,১২০ টাকা। ৫ জনের পরিবার হলে লাগবে ৪১,৪০০ টাকা।
৩। ২০১৫ সালে সরকার ঘোষিত পে-স্কেল এর সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ৮২৫০ টাকা বেসিক ধরে সর্বমোট ১৩,৮০০ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল, বর্তমানে তা বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট ধরে ২১, ৫৭০ টাকা। মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতি ধরলে তা আরও বাড়বে।
৪। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন সকল তফসিল ব্যাংকের সর্বনিম্ন বেতন ২৯, ০০০ টাকা । শিক্ষানবীশকালিন ২৪ হাজার টাকা। এবং অফিস সহকারি, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সর্বনিম্ন বেতন ২৪ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
৫। গার্মেন্টস শিল্পে আমাদের প্রতিযোগি দেশসমুহের মজুরি মালয়েশিয়া -২৬৩ ডলার (২০২০), তুরস্ক -৩৫২ ডলার (২০২০), ভিয়েতনাম-১৯১ ডলার (২০২০), কম্বোডিয়া-২০০ ডলার (১ জানুয়ারি ২০২৩), চীন -২১৭ ডলার (২০২০), ভারত -১৬৮ ডলার (২০২০), পাকিস্থান-১১১ ডলার (২০২০), মিয়ানমার – ৯৪ ডলার (২০২০), বাংলাদেশ – ৭৫ ডলার (২০২০)।
৬। বিলসের গবেষণা: তাদের গবেষনায় এলাকা ভিত্তিক ৩ ধরনের মজুরি কাঠামো প্রস্তাব করেছে। বিলসের গবেষণা অনুযায়ী গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মান সম্পন্ন জীবনযাপনের জন্য মাসে ঢাকায় ২২, ৮০০ টাকা, ঢাকার পাশে স্যাটেলাইট সিটিতে ২১, ০০০ টাকা ও চট্রগ্রামে ২০, ৪০০ টাকা প্রয়োজন। তারা ৫ টি গ্রেড ও মহার্ঘ ভাতার প্রস্তাব করেছে।
৭। এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর গবেষণাঃ ২০২২ সালে বাংলাদেশে এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর গবেষণা অনুযায়ী একজন শ্রমিকের প্রতিদিন ৩০০০ কিলোক্যালরি গ্রহণের জন্য মাসিক খাদ্যদ্রব্যে খরচ হয় ১০,৭৫৪.০০ টাকা ও ব্যবহার্য দ্রব্যের খরচ হয় ১৩,৬১৯.০০ টাকা এবং সর্বমোট খরচ ২৪,৩৭৩.০০ টাকা। খাদ্যদ্রব্য ও ব্যাবহার্য্য দ্রব্যের আনুপাতিক হার ৪৪:৫৬। এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর উক্ত গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মানসম্মতভাবে বাঁচার মতো মজুরী হওয়া উচিৎ ৪০,৪৪২.০০ টাকা
৮। গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ’র প্রস্তাব: জীবনযাপন ব্যয় ও পুষ্টিমান, সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল-২০১৫, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলারে অফিস সহকারি ও শিক্ষানবিষের সর্বনিম্ন বেতন বিবেচনা করে (সিপিডি গবেষণা, এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ এ্যালায়েন্স এর গবেষণা, গার্মেন্টস এর প্রতিযোগি দেশসমুহের সর্বনিম্ন মজুরি, সাম্প্রতিক ঘোষিত বিভিন্ন সেক্টরের মজুরি কাঠামো বিবেচনা করে) সর্বনিম্ন মজুরি ২৪ হাজার টাকা প্রস্তাব করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চ। এই মজুরী আদায়ের জন্য ক্রেতা বা ব্র্যান্ডগুলোর সাথে সামাজিক সংলাপ অগ্রগতি লাভ করবে।
গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি ২৪ হাজার টাকার নিচে হলে কোনভাবে ন্যায্য মজুরি হবে না। আমরা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন ও শ্রমিকদের ন্যূনতম বেসিক ১৬ হাজার ও মোট মজুরি ২৪ হাজার টাকা ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি। আমরা মনে করি মজুরী নির্ধারিত হলে তৈরী পোশাক শিল্প নিয়ে দেশে বিদেশে যে নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে তাবন্ধ হবে এবং বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প গধফব ওহ ইধহমষধফবংয প্রচারণার দ্রুত সাফল্য অর্তিজত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নি¤েœাক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়। ১. অবিলম্বে মজুরী বোর্ড গঠন ও বেসিক ১৬ হাজার মোট ২৪ হাজার নূন্যতম মজুরী ঘোষণা। ২. গার্মেন্ট শ্রমিকদের বার্ষিক ১০% ইনক্রিমেন্ট ঘোষণা করতে হবে। ৩. গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৪. নূন্যতম মজুরী বোর্ডে অভিজ্ঞ সেক্টরল শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে। ৫. গার্মেন্টস শ্রমিকদের ৬ মাসের মাতৃকল্যাণ ছুটির আইন পাশ করতে হবে। ৬. বাংলাদেশ শ্রম আইনের সকল কালাকানুন আইন বাতিল করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন করতে হবে।
উল্লেখিত ৬ দফা দাবি আদায়ে আগামী ২৬ শে ফেব্রুয়ারি শ্রম প্রতিমন্ত্রী বরাবর স্মারক লিপি পেশ করা হবে।