রসু খাঁদের বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা: রামিসাদের ধর্ষণ ও হত্যার মূল অনুঘটক!
২০০৯ সালে যখন চাঁদপুরের সিরিয়াল কিলার রসু খাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তার অপরাধের বর্বরতা দেখে শিউরে উঠেছিল পুরো দেশ। ১১ জন নারীকে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ, স্তন কেটে ফেলা, যোনিপথে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার মতো পৈশাচিক স্বীকারোক্তি সে নিজে দিয়েছিল। ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলায় আদালত তাকে একাধিকবার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, ঘটনার ১৭ বছর পর ২০২৬ সালেও তার সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।আইনি মারপ্যাঁচ, আপিল আর রিভিউয়ের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে এখনো সে কারাগারে বেঁচে আছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ক্ষতে নুনের ছিটা দিচ্ছে না, বরং সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার দিকে।১. জনগণের করের টাকা বনাম অপরাধীর আয়েশএকটি রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক দিনরাত পরিশ্রম করে রাষ্ট্রকে কর (ট্যাক্স) দেয় এই আশায় যে, রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দেবে এবং কোনো অপরাধ ঘটলে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। কিন্তু রসু খাঁর মতো দাগী অপরাধী যখন বছরের পর বছর কারাগারে বসে করদাতাদের টাকায় তিন বেলা খাবার, বাসস্থান ও চিকিৎসা পায়, তখন পুরো ব্যবস্থার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যে করদাতার মা-বোন বা কন্যা এই হিংস্রতার শিকার হলেন, পরোক্ষভাবে তাঁরই কষ্টার্জিত টাকায় বছরের পর বছর লালিত-পালিত হচ্ছে খুনি-ধর্ষক। এটি ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে এক চরম উপহাস।২. কারাগারের ভেতরের মনস্তত্ত্ব ও অপরাধের স্বাভাবিকীকরণকারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যখন এই ধরনের অপরাধীরা বছরের পর বছর বেঁচে থাকে, তখন কারাগারের ভেতরের পরিবেশেও এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় অপরাধীদের মনে ভয় কেটে যায়। অনেক সময় এরা সহ-কয়েদিদের কাছে নিজেদের অপরাধের গল্প জাহির করে, যা কারাগারের ভেতরেও অপরাধমনস্তত্ত্বকে আরও উসকে দেয়। কঠোর শাস্তি অবিলম্বে কার্যকর না হলে অপরাধীদের কাছে বার্তা যায়—"অপরাধ করেও বছরের পর বছর পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব।"৩. পশ্চিমা আইনি কাঠামোর অন্ধ অনুকরণ ও আমাদের বাস্তবতাআমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার বড় অংশই ব্রিটিশ বা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আমলের আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। পশ্চিমা দেশগুলোতে মানবাধিকারের নামে অপরাধীর আপিল ও আইনি লড়াইয়ের সুযোগ দিতে গিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে এতটাই জটিল করা হয়েছে যে, একটি চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছাতে যুগের পর যুগ কেটে যায়।কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ সমাজে, যেখানে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশুরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে, সেখানে এই মন্থর গতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। অপরাধীর মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে ভুক্তভোগীর মানবাধিকারকে এখানে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে।রসু খাঁদের বেঁচে থাকা কীভাবে 'রামিসা'দের মৃত্যুর কারণ?ক্রিমিনোলজি বা অপরাধবিজ্ঞানের একটি সহজ সূত্র হলো—"শাস্তির অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রিতা নতুন অপরাধের জন্ম দেয়।" রসু খাঁর বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকার কারণেই সমাজে আজ নতুন নতুন 'রামিসা'রা ধর্ষিত ও খুন হচ্ছে। এর পেছনে প্রধান যুক্তিগুলো হলো:ভীতিহীন সমাজ তৈরি: যখন একজন সম্ভাব্য ধর্ষক বা খুনি দেখে যে রসু খাঁর মতো ১১ জন নারীকে হত্যাকারীও ১৭ বছর ধরে দিব্যি বেঁচে আছে, তখন তার মনে আইনের প্রতি কোনো ভয় বা শ্রদ্ধা থাকে না। সে ধরে নেয়, অপরাধ করলেও ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে তার জীবন পার হয়ে যাবে, বা কোনো না কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে সে বেঁচে যাবে।দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব: শাস্তির মূল উদ্দেশ্য দুটি—অপরাধীকে সাজা দেওয়া এবং সমাজে একটি দৃষ্টান্ত (Deterrent) স্থাপন করা, যাতে অন্য কেউ একই অপরাধ করার সাহস না পায়। রসু খাঁর শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় সমাজে সেই 'দৃষ্টান্ত' তৈরিই হতে পারেনি।আইনের ওপর জনগণের আস্থাহীনতা: বিচার পেতে যখন যুগের পর যুগ লেগে যায়, তখন সাধারণ মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, কারণ তারা জানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য বা ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে।রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের কাছ থেকে কর নেয়, তবে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। রসু খাঁদের মতো প্রমাণিত ও আত্মস্বীকৃত নরপশুদের আইনি দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা মানে পরোক্ষভাবে পরবর্তী অপরাধকে লাই দেওয়া। সমাজ থেকে 'রামিসা'দের ওপর হওয়া নির্মমতা চিরতরে বন্ধ করতে হলে রসু খাঁদের মতো জঘন্য অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে ফাঁসি কার্যকর করা জরুরি। অপরাধীর নয়, ভুক্তভোগীর ও সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক আইনি ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।বিশ্লেষক: জয়নাল মাযহারী এল এল. এম ( জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। শরীয়া ও সেকুলার আইনের তুলনা গবেষক বিশ্লেষক লেখক ও চিন্তক।