মুক্তির লড়াই

বিনোদন

গান আর হাসন মিলেমিশে একাকার

গান আর হাসন মিলেমিশে একাকার

বৃটিশ ভারত আমলের লক্ষণশী পরগনা বর্তমান সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার তেঘরিয়ায় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ডিসেম্বর অহিদুর রেজা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীর জন্ম। দেওয়ান হাসন রাজা নামেই বিশ্বে সমাদৃত।মরমী সাধনার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ বেড়ে উঠেছেন বিখ্যাত জমিদার পরিবারে। ৫ লক্ষ একরেরও বেশি এলাকার জমিদার হাসন ছিলেন সত্যের পথিক, সত্যনুসন্ধ্যানী, অমায়িক,  সাদাসিধা চরিত্রের মানুষ।এত বড় জমিদার হয়েও বিলাশবিহীন কুঁড়ে ঘরই ছিল হাসনরাজার নিবাস। তাই তিনি গানে গানে লিখে গিয়েছেন তাঁর মনের গহীনে লুকানো কথা-লোকে বলে বলেরে ঘর বাড়ি ভালা না আমার,কি ঘর বানাইমু আমি শুন্যের মাজার। এছাড়াও মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে, কান্দে হাসন রাজার মন ময়নারে/বাপমৈলা, ভাইমৈলা, আরো মৈলা/বন্ধু আইলরে বন্ধু আইলরে বৈসালের বৎসর বন্ধু আইলরে/আমি যাইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে, হাসনরাজার আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে/হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা/যমের দূতে আসিয়া তোমার হাতে দিবে দড়ি,টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে যমের বাড়ি/স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল,কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল/বুঝাইলে না বুঝে মানুষ সমঝাইলে না সমঝে, দুনিয়া দুনিয়া বলে/এমন সহস্র গানের শ্রষ্টা কবি ও মরমী সাধক হাসন রাজা।

হাসনরাজার গানে স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা,ক্ষনিকের জগৎ সংসারের অসারতা,দুনিয়ার ভোগবিলাসের পরিবর্তে পরলোকে গন্তব্যের ইঙ্গিত,পরম শ্রষ্টাকে পাওয়ার আকুতি,পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার সম্পর্ক এ সব দিক গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। 

  যুগ্ন-সচিব বিশিষ্ট কবি,প্রাবন্ধিক, গবেষক মোঃ জেহাদ উদ্দিনের মতে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের চোখে হাসন রাজা ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের অন্যতম।তাঁর মতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসন রাজার কয়েকটি গানের সন্ধ্যান পেয়ে থমকে গিয়ে বলেছিলেন হাসন রাজা একজন বিখ্যাত দার্শনিক।

 রবি ঠাকুর ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর Indian Philosophical Congress এর সভাপতির ভাষণে ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হিবার্ট লেকচার’-এ প্রদত্ত The Religion of Man শীর্ষক বক্তব্যে হাসন রাজার দর্শন তুলে ধরেছিলেন।গবেষক মোঃ জেহাদ উদ্দিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস  করেন হাসন রাজার সহস্র সংগীতের উপর গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মরমী সাধকদের অন্যতম হাসন রাজাকে তুলে ধরা সম্ভব । তিনি আরো বলেন হাসনরাজা ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তাইতো প্রভাবশালী ইংরেজ শাসকদের সামনে বুক ফুলিয়ে বলতেন-হাসনরাজা বাঙ্গালী।মানবদরদী হাসন রাজা সেকালে বহুদাতব্য প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষালয় গড়েছিলেন জনগণের কল্যানে।সুনামগঞ্জের জুবিলী স্কুলও তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠান। যদিও নিজের নাম দেননি কোন প্রতিষ্ঠানে।

হাসন রাজা মিউজিয়াম ও ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, হাসনরাজার জীবন ও কর্ম গ্রন্থের লেখক হাসনরাজার প্রপৌত্র  সামারীন দেওয়ান জানান- হাসনরাজা বিলাসবিহীন এক জমিদার ছিলেন। পার্থিব ভোগ বিলাসের প্রতি অনীহা ছিল তাঁর। প্রচলিত জমিদারির আড়ালে নিভৃতে নিজেকে সহায় সম্বল হীন ক্ষনিকের মুসাফির হিসাবে ভাবতেন হাসন।পরম শ্রষ্টার নৈকট্যলাভের সাধনায় নিমগ্ন থেকে পাড়ি দিয়েছেন কালের খেয়া। হাসন তাঁর গানে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেছেন।অসংখ্য ঘটনার সাথে হাসনের গানের সম্পর্ক রয়েছে।তার মতে গান বাদ দিয়ে হাসনরাজার জীবন নেই। গান আর হাসন মিলেমিশে একাকার।

তিনি বলেন প্রানীকুলের প্রতি হাসনরাজার ছিল পরম মমতা। এ কারনে হাসন রাজা ২৯২টি কুড়া পাখি,৫০টি ময়না ও ২৯টি দোয়েল পাখি পোষতেন। 

১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর ৬৭ বছর বয়সে হাসন রাজা ইন্তেকাল করেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে দীর্ঘকাল বিলাতে থাকা সামারীন দেওয়ান আক্ষেপ করে বলেন-কবি ও মরমী সাধক হাসনরাজা সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক ধারনা রয়েছে। সত্যিকার সাধক হাসনের ব্যপারে মানুষ এখনো অন্ধকারে রয়েগেছে।হাসনরাজার প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরতে ও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষনে ১৯৬৩ খ্রিঃ হতে ক্ষুদ্র পরিসরে হাসনরাজার ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে হাসনরাজা মিউজিয়াম গড়ে তোলেন সামারীন দেওয়ান। এটি ২০০৮ সালের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ মিউজিয়ামে রূপ নেয়। ১৯৬৩ সালে গোড়ারদিকে মাসে দুচারজন দর্শনার্থী আসতো।বর্তমানে প্রতিদিন দেড়শত থেকে দুইশত দর্শনার্থী আগমন ঘটে। ২০১৫ সালে হাসনরাজা মিউজিয়াম ট্রাস্ট গঠন করেন তিনি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন হাসন রাজা পরিষদ। তিনি আরও বলেন হাসনরাজার স্বরূপ অন্বেষণে আরো গবেষণা দরকার।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


গান আর হাসন মিলেমিশে একাকার

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬

featured Image

বৃটিশ ভারত আমলের লক্ষণশী পরগনা বর্তমান সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার তেঘরিয়ায় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ডিসেম্বর অহিদুর রেজা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীর জন্ম। দেওয়ান হাসন রাজা নামেই বিশ্বে সমাদৃত।মরমী সাধনার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ বেড়ে উঠেছেন বিখ্যাত জমিদার পরিবারে। ৫ লক্ষ একরেরও বেশি এলাকার জমিদার হাসন ছিলেন সত্যের পথিক, সত্যনুসন্ধ্যানী, অমায়িক,  সাদাসিধা চরিত্রের মানুষ।এত বড় জমিদার হয়েও বিলাশবিহীন কুঁড়ে ঘরই ছিল হাসনরাজার নিবাস। তাই তিনি গানে গানে লিখে গিয়েছেন তাঁর মনের গহীনে লুকানো কথা-লোকে বলে বলেরে ঘর বাড়ি ভালা না আমার,কি ঘর বানাইমু আমি শুন্যের মাজার। এছাড়াও মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে, কান্দে হাসন রাজার মন ময়নারে/বাপমৈলা, ভাইমৈলা, আরো মৈলা/বন্ধু আইলরে বন্ধু আইলরে বৈসালের বৎসর বন্ধু আইলরে/আমি যাইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে, হাসনরাজার আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে/হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা/যমের দূতে আসিয়া তোমার হাতে দিবে দড়ি,টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে যমের বাড়ি/স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল,কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল/বুঝাইলে না বুঝে মানুষ সমঝাইলে না সমঝে, দুনিয়া দুনিয়া বলে/এমন সহস্র গানের শ্রষ্টা কবি ও মরমী সাধক হাসন রাজা।


হাসনরাজার গানে স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা,ক্ষনিকের জগৎ সংসারের অসারতা,দুনিয়ার ভোগবিলাসের পরিবর্তে পরলোকে গন্তব্যের ইঙ্গিত,পরম শ্রষ্টাকে পাওয়ার আকুতি,পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার সম্পর্ক এ সব দিক গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। 


  যুগ্ন-সচিব বিশিষ্ট কবি,প্রাবন্ধিক, গবেষক মোঃ জেহাদ উদ্দিনের মতে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের চোখে হাসন রাজা ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের অন্যতম।তাঁর মতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসন রাজার কয়েকটি গানের সন্ধ্যান পেয়ে থমকে গিয়ে বলেছিলেন হাসন রাজা একজন বিখ্যাত দার্শনিক।

 রবি ঠাকুর ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর Indian Philosophical Congress এর সভাপতির ভাষণে ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হিবার্ট লেকচার’-এ প্রদত্ত The Religion of Man শীর্ষক বক্তব্যে হাসন রাজার দর্শন তুলে ধরেছিলেন।গবেষক মোঃ জেহাদ উদ্দিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস  করেন হাসন রাজার সহস্র সংগীতের উপর গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মরমী সাধকদের অন্যতম হাসন রাজাকে তুলে ধরা সম্ভব । তিনি আরো বলেন হাসনরাজা ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তাইতো প্রভাবশালী ইংরেজ শাসকদের সামনে বুক ফুলিয়ে বলতেন-হাসনরাজা বাঙ্গালী।মানবদরদী হাসন রাজা সেকালে বহুদাতব্য প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষালয় গড়েছিলেন জনগণের কল্যানে।সুনামগঞ্জের জুবিলী স্কুলও তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠান। যদিও নিজের নাম দেননি কোন প্রতিষ্ঠানে।



হাসন রাজা মিউজিয়াম ও ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, হাসনরাজার জীবন ও কর্ম গ্রন্থের লেখক হাসনরাজার প্রপৌত্র  সামারীন দেওয়ান জানান- হাসনরাজা বিলাসবিহীন এক জমিদার ছিলেন। পার্থিব ভোগ বিলাসের প্রতি অনীহা ছিল তাঁর। প্রচলিত জমিদারির আড়ালে নিভৃতে নিজেকে সহায় সম্বল হীন ক্ষনিকের মুসাফির হিসাবে ভাবতেন হাসন।পরম শ্রষ্টার নৈকট্যলাভের সাধনায় নিমগ্ন থেকে পাড়ি দিয়েছেন কালের খেয়া। হাসন তাঁর গানে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেছেন।অসংখ্য ঘটনার সাথে হাসনের গানের সম্পর্ক রয়েছে।তার মতে গান বাদ দিয়ে হাসনরাজার জীবন নেই। গান আর হাসন মিলেমিশে একাকার।

তিনি বলেন প্রানীকুলের প্রতি হাসনরাজার ছিল পরম মমতা। এ কারনে হাসন রাজা ২৯২টি কুড়া পাখি,৫০টি ময়না ও ২৯টি দোয়েল পাখি পোষতেন। 


১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর ৬৭ বছর বয়সে হাসন রাজা ইন্তেকাল করেন। 


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে দীর্ঘকাল বিলাতে থাকা সামারীন দেওয়ান আক্ষেপ করে বলেন-কবি ও মরমী সাধক হাসনরাজা সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক ধারনা রয়েছে। সত্যিকার সাধক হাসনের ব্যপারে মানুষ এখনো অন্ধকারে রয়েগেছে।হাসনরাজার প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরতে ও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষনে ১৯৬৩ খ্রিঃ হতে ক্ষুদ্র পরিসরে হাসনরাজার ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে হাসনরাজা মিউজিয়াম গড়ে তোলেন সামারীন দেওয়ান। এটি ২০০৮ সালের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ মিউজিয়ামে রূপ নেয়। ১৯৬৩ সালে গোড়ারদিকে মাসে দুচারজন দর্শনার্থী আসতো।বর্তমানে প্রতিদিন দেড়শত থেকে দুইশত দর্শনার্থী আগমন ঘটে। ২০১৫ সালে হাসনরাজা মিউজিয়াম ট্রাস্ট গঠন করেন তিনি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন হাসন রাজা পরিষদ। তিনি আরও বলেন হাসনরাজার স্বরূপ অন্বেষণে আরো গবেষণা দরকার।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই