নতুন মন্ত্রিসভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের (সুমন) এবং প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন। একই নামের এই দুই নেতার যৌথ দায়িত্ব গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতূহল তৈরি করেছে; তবে প্রতীকী এই মিলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—দ্রুত নগরায়ণ, আবাসন সংকট এবং অবকাঠামোগত বৈষম্যের বাস্তবতায় তাদের নেতৃত্ব কতটা কার্যকর নীতিনির্ধারণী রূপ পায়।
আজকের বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়ন আর কেবল সড়ক, সেতু বা দালান নির্মাণের পরিসংখ্যান নয়; বরং তা নাগরিকের বাসযোগ্যতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত এক দশকে নগরায়ণের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, জমির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসন অনিশ্চয়তা এবং শহর-গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য। ফলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত খাত এখন কেবল একটি কারিগরি মন্ত্রণালয় নয়—এটি কার্যত মানবিক উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
এই বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার-কেন্দ্রিক উন্নয়ন’ থেকে ‘মানুষ-কেন্দ্রিক উন্নয়ন’-এ রূপান্তর ঘটানো। পরিকল্পিত নগরায়ণ বলতে কেবল বহুতল ভবন বা নতুন স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা বোঝায় না; বরং এর অর্থ হলো—যানজট, পানি নিষ্কাশন, সবুজ এলাকা, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান ও আবাসনের মধ্যে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা। উন্নয়ন যেন শহরের কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং জেলা ও উপশহরগুলোতেও সমানভাবে বিস্তৃত হয়—এমন দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরেই বাজারনির্ভর ও অসমভাবে বিকশিত। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যদি সাশ্রয়ী আবাসন, ভাড়াভিত্তিক হাউজিং মডেল, এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের নতুন কাঠামো যুক্ত করা যায়, তবে এই খাত অর্থনীতির গতিশীল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতে স্বচ্ছতা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও জরুরি।
এখানে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সমন্বিত নেতৃত্ব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত—এই তিনটির সমন্বয় ঘটাতে পারলে মন্ত্রণালয়টি কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি আধুনিক নগরদর্শনের রূপকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে—এমন উদ্যোগগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে যদি মানুষের জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করা না যায়, তবে তা স্থায়ী হয় না। পরিকল্পিত নগরায়ণ মানে এমন শহর গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিক শুধু বসবাসই করবে না, বরং নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবে। নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই সুযোগ যেমন বড়, প্রত্যাশাও তেমনি ব্যাপক।
এই দায়িত্ব কেবল অবকাঠামো নির্মাণের নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের দায়িত্ব। এখন দেখার বিষয়—নীতিগত দূরদর্শিতা ও বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয়ে এই নেতৃত্ব কতটা কার্যকর পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ সমাজকে পরিচালিত করার জন্য “Order and Progress”-এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। উন্নয়ন তখনই কার্যকর হয় যখন তা পরিকল্পিত, তথ্যনির্ভর এবং মানবকল্যাণমুখী হয়। মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নেতৃত্বে যদি নগর পরিকল্পনায় এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে অনিয়ন্ত্রিত নগর বিস্তার রোধ করে সুষম উন্নয়নের পথ তৈরি হতে পারে।
এমিল ডুর্খেইম সামাজিক সংহতির ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আবাসন কেবল অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। স্বল্প ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা গেলে সমাজে বৈষম্য কমবে, নাগরিক সংহতি বাড়বে। প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমনের জন্য এটি হতে পারে একটি বাস্তবভিত্তিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্র, যেখানে প্রশাসনিক তদারকি ও মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ।
হার্বার্ট স্পেন্সার সমাজকে জীবন্ত অর্গানিজম হিসেবে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গৃহায়ণ খাতে দুর্নীতি, নিম্নমানের নির্মাণ বা দীর্ঘসূত্রতা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই উন্নয়নকে হতে হবে টেকসই, গুণগত এবং দায়বদ্ধ—যেখানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি প্রকল্প রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে।
ম্যাক্স ভেবারের রেশনাল প্রশাসনিক কাঠামোর মূল কথা ছিল—স্বচ্ছতা, নিয়মতান্ত্রিকতা ও জবাবদিহিতা। সরকারি নির্মাণকাজে স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া, Public Procurement Rules (PPR-2008)-এর যথাযথ প্রয়োগ, এবং সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা—এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে নতুন নেতৃত্ব প্রশাসনিক আস্থার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
ইসলামের ইতিহাসও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল ন্যায়, আমানতদারি, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি জনকল্যাণ। ‘মদিনা সনদ’ ছিল বহুধর্মী ও বহুজাতিক সমাজে সহাবস্থান, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসনের এক অনন্য দলিল, যেখানে রাষ্ট্রকে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল।
খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে এই আদর্শ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) রাষ্ট্র পরিচালনাকে ব্যক্তিগত মর্যাদার নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা—“আমি তোমাদের ওপর শাসক নই, বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত”—শাসনব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে দেয়।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) প্রশাসনিক সংস্কার, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জনসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর আমলে বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের স্বচ্ছ পরিচালনা, বাজার তদারকি, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, এমনকি নগর পরিকল্পনার ধারণাও সুসংগঠিত রূপ পায়। তিনি নিয়মিতভাবে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেন এবং জনগণের অভিযোগ সরাসরি শুনতেন—যা আধুনিক গণপ্রশাসনের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়েই বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত হয়, যা ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনায় সহায়তা করে।
চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) শাসনকার্যে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও সামাজিক ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তাঁর শাসনদর্শনে স্পষ্ট ছিল—রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষার মাধ্যম।
এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল স্থাপনা নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং জনসম্পদের সুষম ব্যবহার। ইসলামি শাসন-ঐতিহ্যে নগর ও রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল মানবকল্যাণকেন্দ্রিক—যেখানে উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়।
সমকালীন রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রেও এই মূল্যবোধগুলো প্রাসঙ্গিক। পরিকল্পিত নগরায়ণ, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে হলে উন্নয়নকে কেবল ভৌত অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে—যেমনটি ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে।
আজকের বাস্তবতায় মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের (সুমন) ও প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—উন্নয়নকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই রূপ দেওয়া। পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত নির্মাণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা—এসবই এখন জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তবে এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে বিশেষভাবে রয়েছে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নেতৃত্ব। কারণ, মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর দিকনির্দেশনা মূলত তাঁর হাত ধরেই রূপ পাবে। তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে উন্নয়নকে কেবল প্রকল্পনির্ভর না রেখে জনজীবননির্ভর করে তোলা—যেখানে অবকাঠামো মানে শুধু নির্মাণ নয়, বরং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য, সামাজিক ন্যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়।
বাংলাদেশের নগর বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ‘বিশ্বাসযোগ্য উন্নয়ন’। জনগণ দৃশ্যমান উন্নয়ন অবশ্যই চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় এমন উন্নয়ন, যার ভেতরে থাকে স্বচ্ছতা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা। একটি ফ্ল্যাট, একটি সড়ক কিংবা একটি সরকারি ভবন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা কেবল স্থাপনা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ ও নাগরিকের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে দাঁড়ায়।
এই জায়গাতেই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের নৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত নগরায়ণ মানে যেন এলোমেলো বিস্তার নয়; বরং গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত স্থান, সাশ্রয়ী আবাসন এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে একত্রে বিবেচনায় নেওয়া। উন্নয়ন যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ না করে, তবে তা টেকসই হয় না—এই উপলব্ধি থেকেই নতুন নীতিনির্ধারণ এগোতে হবে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই সুযোগ যেমন বড়, দায়িত্বও তেমনি বিস্তৃত। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যদি পরিকল্পিত নগরায়ণ, সামাজিক ন্যায় ও সুশাসনের সমন্বিত একটি কার্যকর মডেল দাঁড় করাতে পারে, তবে তা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং একটি আরও বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি রচনা করবে।
এখন সময়—উন্নয়নকে দৃশ্যমান থেকে বিশ্বাসযোগ্য, আর কাঠামোগত থেকে মানবিক করার। সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন।
(লেখক একজন কবি, সমাজবিজ্ঞানী ও চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটি()

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নতুন মন্ত্রিসভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের (সুমন) এবং প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন। একই নামের এই দুই নেতার যৌথ দায়িত্ব গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতূহল তৈরি করেছে; তবে প্রতীকী এই মিলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—দ্রুত নগরায়ণ, আবাসন সংকট এবং অবকাঠামোগত বৈষম্যের বাস্তবতায় তাদের নেতৃত্ব কতটা কার্যকর নীতিনির্ধারণী রূপ পায়।
আজকের বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়ন আর কেবল সড়ক, সেতু বা দালান নির্মাণের পরিসংখ্যান নয়; বরং তা নাগরিকের বাসযোগ্যতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত এক দশকে নগরায়ণের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, জমির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসন অনিশ্চয়তা এবং শহর-গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য। ফলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত খাত এখন কেবল একটি কারিগরি মন্ত্রণালয় নয়—এটি কার্যত মানবিক উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
এই বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার-কেন্দ্রিক উন্নয়ন’ থেকে ‘মানুষ-কেন্দ্রিক উন্নয়ন’-এ রূপান্তর ঘটানো। পরিকল্পিত নগরায়ণ বলতে কেবল বহুতল ভবন বা নতুন স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা বোঝায় না; বরং এর অর্থ হলো—যানজট, পানি নিষ্কাশন, সবুজ এলাকা, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান ও আবাসনের মধ্যে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা। উন্নয়ন যেন শহরের কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং জেলা ও উপশহরগুলোতেও সমানভাবে বিস্তৃত হয়—এমন দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরেই বাজারনির্ভর ও অসমভাবে বিকশিত। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যদি সাশ্রয়ী আবাসন, ভাড়াভিত্তিক হাউজিং মডেল, এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের নতুন কাঠামো যুক্ত করা যায়, তবে এই খাত অর্থনীতির গতিশীল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতে স্বচ্ছতা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও জরুরি।
এখানে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সমন্বিত নেতৃত্ব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত—এই তিনটির সমন্বয় ঘটাতে পারলে মন্ত্রণালয়টি কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি আধুনিক নগরদর্শনের রূপকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে—এমন উদ্যোগগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে যদি মানুষের জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করা না যায়, তবে তা স্থায়ী হয় না। পরিকল্পিত নগরায়ণ মানে এমন শহর গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিক শুধু বসবাসই করবে না, বরং নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবে। নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই সুযোগ যেমন বড়, প্রত্যাশাও তেমনি ব্যাপক।
এই দায়িত্ব কেবল অবকাঠামো নির্মাণের নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের দায়িত্ব। এখন দেখার বিষয়—নীতিগত দূরদর্শিতা ও বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয়ে এই নেতৃত্ব কতটা কার্যকর পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ সমাজকে পরিচালিত করার জন্য “Order and Progress”-এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। উন্নয়ন তখনই কার্যকর হয় যখন তা পরিকল্পিত, তথ্যনির্ভর এবং মানবকল্যাণমুখী হয়। মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নেতৃত্বে যদি নগর পরিকল্পনায় এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে অনিয়ন্ত্রিত নগর বিস্তার রোধ করে সুষম উন্নয়নের পথ তৈরি হতে পারে।
এমিল ডুর্খেইম সামাজিক সংহতির ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আবাসন কেবল অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। স্বল্প ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা গেলে সমাজে বৈষম্য কমবে, নাগরিক সংহতি বাড়বে। প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমনের জন্য এটি হতে পারে একটি বাস্তবভিত্তিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্র, যেখানে প্রশাসনিক তদারকি ও মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ।
হার্বার্ট স্পেন্সার সমাজকে জীবন্ত অর্গানিজম হিসেবে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গৃহায়ণ খাতে দুর্নীতি, নিম্নমানের নির্মাণ বা দীর্ঘসূত্রতা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই উন্নয়নকে হতে হবে টেকসই, গুণগত এবং দায়বদ্ধ—যেখানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি প্রকল্প রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে।
ম্যাক্স ভেবারের রেশনাল প্রশাসনিক কাঠামোর মূল কথা ছিল—স্বচ্ছতা, নিয়মতান্ত্রিকতা ও জবাবদিহিতা। সরকারি নির্মাণকাজে স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া, Public Procurement Rules (PPR-2008)-এর যথাযথ প্রয়োগ, এবং সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা—এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে নতুন নেতৃত্ব প্রশাসনিক আস্থার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
ইসলামের ইতিহাসও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল ন্যায়, আমানতদারি, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি জনকল্যাণ। ‘মদিনা সনদ’ ছিল বহুধর্মী ও বহুজাতিক সমাজে সহাবস্থান, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসনের এক অনন্য দলিল, যেখানে রাষ্ট্রকে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল।
খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে এই আদর্শ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) রাষ্ট্র পরিচালনাকে ব্যক্তিগত মর্যাদার নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা—“আমি তোমাদের ওপর শাসক নই, বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত”—শাসনব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে দেয়।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) প্রশাসনিক সংস্কার, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জনসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর আমলে বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের স্বচ্ছ পরিচালনা, বাজার তদারকি, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, এমনকি নগর পরিকল্পনার ধারণাও সুসংগঠিত রূপ পায়। তিনি নিয়মিতভাবে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেন এবং জনগণের অভিযোগ সরাসরি শুনতেন—যা আধুনিক গণপ্রশাসনের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়েই বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত হয়, যা ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনায় সহায়তা করে।
চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) শাসনকার্যে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও সামাজিক ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তাঁর শাসনদর্শনে স্পষ্ট ছিল—রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষার মাধ্যম।
এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল স্থাপনা নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং জনসম্পদের সুষম ব্যবহার। ইসলামি শাসন-ঐতিহ্যে নগর ও রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল মানবকল্যাণকেন্দ্রিক—যেখানে উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়।
সমকালীন রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রেও এই মূল্যবোধগুলো প্রাসঙ্গিক। পরিকল্পিত নগরায়ণ, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে হলে উন্নয়নকে কেবল ভৌত অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে—যেমনটি ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে।
আজকের বাস্তবতায় মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের (সুমন) ও প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—উন্নয়নকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই রূপ দেওয়া। পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত নির্মাণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা—এসবই এখন জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তবে এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে বিশেষভাবে রয়েছে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নেতৃত্ব। কারণ, মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর দিকনির্দেশনা মূলত তাঁর হাত ধরেই রূপ পাবে। তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে উন্নয়নকে কেবল প্রকল্পনির্ভর না রেখে জনজীবননির্ভর করে তোলা—যেখানে অবকাঠামো মানে শুধু নির্মাণ নয়, বরং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য, সামাজিক ন্যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়।
বাংলাদেশের নগর বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ‘বিশ্বাসযোগ্য উন্নয়ন’। জনগণ দৃশ্যমান উন্নয়ন অবশ্যই চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় এমন উন্নয়ন, যার ভেতরে থাকে স্বচ্ছতা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা। একটি ফ্ল্যাট, একটি সড়ক কিংবা একটি সরকারি ভবন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা কেবল স্থাপনা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ ও নাগরিকের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে দাঁড়ায়।
এই জায়গাতেই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের নৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত নগরায়ণ মানে যেন এলোমেলো বিস্তার নয়; বরং গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত স্থান, সাশ্রয়ী আবাসন এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে একত্রে বিবেচনায় নেওয়া। উন্নয়ন যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ না করে, তবে তা টেকসই হয় না—এই উপলব্ধি থেকেই নতুন নীতিনির্ধারণ এগোতে হবে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই সুযোগ যেমন বড়, দায়িত্বও তেমনি বিস্তৃত। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যদি পরিকল্পিত নগরায়ণ, সামাজিক ন্যায় ও সুশাসনের সমন্বিত একটি কার্যকর মডেল দাঁড় করাতে পারে, তবে তা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং একটি আরও বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি রচনা করবে।
এখন সময়—উন্নয়নকে দৃশ্যমান থেকে বিশ্বাসযোগ্য, আর কাঠামোগত থেকে মানবিক করার। সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন।
(লেখক একজন কবি, সমাজবিজ্ঞানী ও চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটি()

আপনার মতামত লিখুন