মুক্তির লড়াই

মতামত

অবক্ষয়ের কালবেলা ও বিপন্ন শৈশব

বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর কত কাড়বে রামিসা-আছিয়াদের প্রাণ?

বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর কত কাড়বে রামিসা-আছিয়াদের প্রাণ?

সময়ের চাকা ঘোরে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, কিন্তু এই ভূখণ্ডের নারী ও শিশুদের জীবনের নিরাপত্তার সমীকরণটি যেন এক আদিম ও পৈশাচিক অন্ধকারেই আটকে আছে। প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো না কোনো নিষ্পাপ শিশুর রক্তাক্ত, নিথর মুখ-আর সন্ধ্যায় সেই খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে কিছুক্ষণের জন্য আলোড়ন তোলে, তারপর আবার সব স্তব্ধ। এই স্তব্ধতাই আজ সবচেয়ে বড় বিপদ।

গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের একটি বহুতল আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী, সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ। মুন্সীগঞ্জের শিয়ালদী গ্রামের রিকশা মিস্ত্রি হান্নান ও পারভিন দম্পতির এই কন্যাসন্তান ঢাকায় এসেছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী মাদকাসক্ত সোহেল রানা শিশুটিকে কৌশলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আলামত গোপন করতে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল আসামি ও তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন আসামিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা না করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই দ্রুত পদক্ষেপও জনমনে স্বস্তি দিতে পারছে না। কারণ সবচেয়ে মর্মভেদী প্রশ্নটি উঠে এসেছে রামিসার বাবার কণ্ঠ থেকে: “বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।” যখন কোনো পিতা সন্তান হত্যার বিচার চাইতে অস্বীকার করেন, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত অবক্ষয় চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। এটি কেবল একজন পিতার হতাশার কথা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের প্রতি গণবিশ্বাসের চূড়ান্ত ভাঙনের ঘোষণা।

রামিসার এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মে মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই দেশজুড়ে চলা এক পৈশাচিকতার তাণ্ডব। গত ৬ মে সিলেটে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ভুট্টাক্ষেতে লাশ ফেলে দেওয়া এবং ১৬ মে মুন্সিগঞ্জে ১০ বছরের শিশু আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনাগুলো বলে দেয়-এই দেশে শিশুরা নিজের বাড়ির পাশে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ নয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সম্মিলিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের সাড়ে চার মাসেই কমপক্ষে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে আরও ৪৬ জনের ওপর এবং ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। বিগত ২০ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল) দেশে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ৬৪৩ জন নিষ্পাপ শিশু প্রাণ হারিয়েছে; যার অর্থ-এ দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জনেরও বেশি শিশু নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে দেশে মোট ২ হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু পশুর লালসার শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আরও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, এই পরিসংখ্যানের বাইরে মাদ্রাসায় শিক্ষার নামে কোমলমতি শিশু পুত্রদের ওপর শিক্ষকদের দ্বারা অবর্ণনীয় নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার (বলাৎকার) ঘটনা যুক্ত হলে চিত্রটি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। পবিত্র মনে করে যে শিক্ষালয়ে অভিভাবকেরা সন্তান পাঠান, সেখানেই শিক্ষকের ছদ্মবেশে থাকা অপরাধীদের লালসার শিকার হতে হচ্ছে শিশুদের-যা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।


এই নারকীয় পরিস্থিতি দেশের কোনো বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম বিভাগে পারিবারিক কলহ ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে শিশু অপহরণের পর হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলসহ ঢাকা বিভাগের শিল্পাঞ্চলগুলোতে চলন্ত বাসে বা নির্জন রাস্তায় কর্মজীবী নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির অভাবে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের পর লোকলজ্জায় আত্মহত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার এক নীরব ও মারাত্মক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই পৈশাচিকতার গ্রাফ দিন দিন উর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রধানতম কারণ হলো বিচারহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি। ঢাকার বিভিন্ন আদালতের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই একটি জেলাতেই শিশু ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রায় ৩,০০০ মামলা বছরের পর বছর ধরে হিমাগারে ঝুলে আছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় নতুন করে আরও ২১৪টি ধর্ষণের মামলা রুজু হয়েছে। আসক ও ওসিসির আইনজীবীদের মতে, আইনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়া, তদন্ত কর্মকর্তাদের স্পর্শকাতর মামলার পাশাপাশি সাধারণ ডিউটিতে ব্যস্ত থাকা, সময়মতো মেডিকেল রিপোর্ট না পাওয়া, ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার অতিরিক্ত জট এবং সঠিক সময়ে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারা এই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সরাসরি পরিণতি হলো-দরিদ্র ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা চালানোর সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে এবং অপরাধীরা পার পেয়ে গিয়ে নতুন অপরাধ করার দুঃসাহস পায়।

এই বিচারহীনতার প্রসঙ্গে মাগুরার আছিয়ার কথা না বললে আলোচনা অধরাই থেকে যায়। ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে দেশজুড়ে প্রচণ্ড আলোড়ন ওঠে। দাবির মুখে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং অভিযোগ গঠনের মাত্র ২১ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১৭ মে ২০২৫ তারিখে মূল আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-মাগুরার সেই দ্রুত বিচার কি অপরাধীদের মনে কোনো ভয় তৈরি করতে পেরেছে? উত্তর হলো, হাজার হাজার ঝুলন্ত মামলার মধ্যে মাত্র একটি বা দুটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সামগ্রিক গলদ ঢাকতে পারে না। যতক্ষণ না দ্রুত বিচার একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ অপরাধীরা সেই হাজারো মামলার ভিড়ে নিজেদের আড়াল করার সুযোগ খুঁজে নেবেই। এই পুরো পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামগ্রিক ব্যর্থতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পতনের ভয়াবহ প্রতিফলন। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দ্রুত গ্রেপ্তার ও চার্জশিটের কথা জানিয়েছেন; কিন্তু বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আসক ও মহিলা পরিষদের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্পষ্ট বলেছে-শিশু সুরক্ষা ও নির্যাতন প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত মৌলিক দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্বে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশু ধর্ষণের মামলার বিচার আলাদাভাবে করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন পেলেও সেটির বাস্তব প্রয়োগ আজও সর্বত্র দৃশ্যমান হয়নি।


রামিসা, লামিয়া, ফাহিমা বা আছিয়ারা কেবল শিরোনাম হওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। তারা বাঁচতে চেয়েছিল, বড় হতে চেয়েছিল, স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল। তাদের এই স্বপ্নের ঋণ পরিশোধ করতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করে প্রতিটি স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোতে দৈনিক শুনানির (ডে-টু-ডে ট্রায়াল) মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশু ধর্ষণের জন্য পৃথক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা দেশের প্রতিটি জেলায় দ্রুত কার্যকর করে সেখানে অন্য মামলার অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইনি দায়ভার নিতে হবে-যাতে দরিদ্র পরিবারগুলো অর্থের অভাবে মামলা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়। চতুর্থত, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, মাদ্রাসায় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে ক্ষমতার আশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। বিজ্ঞানী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ-আমরা সবাই আজ একটি ব্যর্থ সমাজের অংশ, যেখানে সাত-আট বছরের একটি শিশু নিরাপদে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই দিনের ক্ষোভ আর মোমবাতি মিছিলে এই সংকটের সমাধান হবে না; প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত রূপান্তর। আমরা আর কোনো শিশুর রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখতে চাই না। রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ অঙ্গীকারে এই দেশে আবার শৈশবের নিরাপদ হাসি ফিরে আসুক-এটাই আজকের দিনের সবচেয়ে জরুরি ও আপসহীন দাবি।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর কত কাড়বে রামিসা-আছিয়াদের প্রাণ?

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

সময়ের চাকা ঘোরে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, কিন্তু এই ভূখণ্ডের নারী ও শিশুদের জীবনের নিরাপত্তার সমীকরণটি যেন এক আদিম ও পৈশাচিক অন্ধকারেই আটকে আছে। প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো না কোনো নিষ্পাপ শিশুর রক্তাক্ত, নিথর মুখ-আর সন্ধ্যায় সেই খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে কিছুক্ষণের জন্য আলোড়ন তোলে, তারপর আবার সব স্তব্ধ। এই স্তব্ধতাই আজ সবচেয়ে বড় বিপদ।


গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের একটি বহুতল আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী, সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ। মুন্সীগঞ্জের শিয়ালদী গ্রামের রিকশা মিস্ত্রি হান্নান ও পারভিন দম্পতির এই কন্যাসন্তান ঢাকায় এসেছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী মাদকাসক্ত সোহেল রানা শিশুটিকে কৌশলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আলামত গোপন করতে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল আসামি ও তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন আসামিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা না করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই দ্রুত পদক্ষেপও জনমনে স্বস্তি দিতে পারছে না। কারণ সবচেয়ে মর্মভেদী প্রশ্নটি উঠে এসেছে রামিসার বাবার কণ্ঠ থেকে: “বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।” যখন কোনো পিতা সন্তান হত্যার বিচার চাইতে অস্বীকার করেন, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত অবক্ষয় চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। এটি কেবল একজন পিতার হতাশার কথা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের প্রতি গণবিশ্বাসের চূড়ান্ত ভাঙনের ঘোষণা।


রামিসার এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মে মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই দেশজুড়ে চলা এক পৈশাচিকতার তাণ্ডব। গত ৬ মে সিলেটে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ভুট্টাক্ষেতে লাশ ফেলে দেওয়া এবং ১৬ মে মুন্সিগঞ্জে ১০ বছরের শিশু আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনাগুলো বলে দেয়-এই দেশে শিশুরা নিজের বাড়ির পাশে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ নয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সম্মিলিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের সাড়ে চার মাসেই কমপক্ষে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে আরও ৪৬ জনের ওপর এবং ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। বিগত ২০ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল) দেশে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ৬৪৩ জন নিষ্পাপ শিশু প্রাণ হারিয়েছে; যার অর্থ-এ দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জনেরও বেশি শিশু নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে দেশে মোট ২ হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু পশুর লালসার শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আরও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, এই পরিসংখ্যানের বাইরে মাদ্রাসায় শিক্ষার নামে কোমলমতি শিশু পুত্রদের ওপর শিক্ষকদের দ্বারা অবর্ণনীয় নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার (বলাৎকার) ঘটনা যুক্ত হলে চিত্রটি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। পবিত্র মনে করে যে শিক্ষালয়ে অভিভাবকেরা সন্তান পাঠান, সেখানেই শিক্ষকের ছদ্মবেশে থাকা অপরাধীদের লালসার শিকার হতে হচ্ছে শিশুদের-যা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে।


এই নারকীয় পরিস্থিতি দেশের কোনো বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম বিভাগে পারিবারিক কলহ ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে শিশু অপহরণের পর হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলসহ ঢাকা বিভাগের শিল্পাঞ্চলগুলোতে চলন্ত বাসে বা নির্জন রাস্তায় কর্মজীবী নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির অভাবে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের পর লোকলজ্জায় আত্মহত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার এক নীরব ও মারাত্মক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই পৈশাচিকতার গ্রাফ দিন দিন উর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রধানতম কারণ হলো বিচারহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি। ঢাকার বিভিন্ন আদালতের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই একটি জেলাতেই শিশু ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রায় ৩,০০০ মামলা বছরের পর বছর ধরে হিমাগারে ঝুলে আছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় নতুন করে আরও ২১৪টি ধর্ষণের মামলা রুজু হয়েছে। আসক ও ওসিসির আইনজীবীদের মতে, আইনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়া, তদন্ত কর্মকর্তাদের স্পর্শকাতর মামলার পাশাপাশি সাধারণ ডিউটিতে ব্যস্ত থাকা, সময়মতো মেডিকেল রিপোর্ট না পাওয়া, ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার অতিরিক্ত জট এবং সঠিক সময়ে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারা এই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সরাসরি পরিণতি হলো-দরিদ্র ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা চালানোর সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে এবং অপরাধীরা পার পেয়ে গিয়ে নতুন অপরাধ করার দুঃসাহস পায়।

এই বিচারহীনতার প্রসঙ্গে মাগুরার আছিয়ার কথা না বললে আলোচনা অধরাই থেকে যায়। ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে দেশজুড়ে প্রচণ্ড আলোড়ন ওঠে। দাবির মুখে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং অভিযোগ গঠনের মাত্র ২১ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১৭ মে ২০২৫ তারিখে মূল আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-মাগুরার সেই দ্রুত বিচার কি অপরাধীদের মনে কোনো ভয় তৈরি করতে পেরেছে? উত্তর হলো, হাজার হাজার ঝুলন্ত মামলার মধ্যে মাত্র একটি বা দুটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সামগ্রিক গলদ ঢাকতে পারে না। যতক্ষণ না দ্রুত বিচার একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ অপরাধীরা সেই হাজারো মামলার ভিড়ে নিজেদের আড়াল করার সুযোগ খুঁজে নেবেই। এই পুরো পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামগ্রিক ব্যর্থতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পতনের ভয়াবহ প্রতিফলন। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দ্রুত গ্রেপ্তার ও চার্জশিটের কথা জানিয়েছেন; কিন্তু বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আসক ও মহিলা পরিষদের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্পষ্ট বলেছে-শিশু সুরক্ষা ও নির্যাতন প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত মৌলিক দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্বে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশু ধর্ষণের মামলার বিচার আলাদাভাবে করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন পেলেও সেটির বাস্তব প্রয়োগ আজও সর্বত্র দৃশ্যমান হয়নি।


রামিসা, লামিয়া, ফাহিমা বা আছিয়ারা কেবল শিরোনাম হওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। তারা বাঁচতে চেয়েছিল, বড় হতে চেয়েছিল, স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল। তাদের এই স্বপ্নের ঋণ পরিশোধ করতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করে প্রতিটি স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোতে দৈনিক শুনানির (ডে-টু-ডে ট্রায়াল) মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশু ধর্ষণের জন্য পৃথক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা দেশের প্রতিটি জেলায় দ্রুত কার্যকর করে সেখানে অন্য মামলার অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইনি দায়ভার নিতে হবে-যাতে দরিদ্র পরিবারগুলো অর্থের অভাবে মামলা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়। চতুর্থত, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, মাদ্রাসায় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে ক্ষমতার আশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। বিজ্ঞানী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ-আমরা সবাই আজ একটি ব্যর্থ সমাজের অংশ, যেখানে সাত-আট বছরের একটি শিশু নিরাপদে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই দিনের ক্ষোভ আর মোমবাতি মিছিলে এই সংকটের সমাধান হবে না; প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত রূপান্তর। আমরা আর কোনো শিশুর রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখতে চাই না। রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ অঙ্গীকারে এই দেশে আবার শৈশবের নিরাপদ হাসি ফিরে আসুক-এটাই আজকের দিনের সবচেয়ে জরুরি ও আপসহীন দাবি।


লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই