রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সম্মেলনকক্ষে গত সোমবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত হয়েছে রেকর্ড তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নসহ এই ব্যয়ের অংক তিন লাখ আট হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় ৫০ শতাংশ। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটের এই বিশাল অবয়ব নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বার্তা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো-কাগজের এই মহাপরিকল্পনা কি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত রূপান্তর ঘটাতে পারবে, নাকি তা কেবলই এক অলীক সংখ্যাবিলাসে পরিণত হবে?
এবারের এডিপির একটি ইতিবাচক দিক হলো এর পঞ্চস্তম্ভের দার্শনিক ভিত্তি। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সুষম বিকাশ এবং সামাজিক সংহতিকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। খাতভিত্তিক বরাদ্দে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব (১৬.৭০ শতাংশ) দেওয়া এবং এর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত দূরদর্শী। একইভাবে, প্রান্তিক মানুষের জন্য 'পরিবার কার্ড' ও 'কৃषक কার্ড'-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত মহৎ উদ্যোগের কার্যকারিতা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে যদি আমরা বাস্তবায়নের চিরচেনা 'দুষ্টচক্র' থেকে বের হতে না পারি।
বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, আমাদের উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের খাতার সাথে মাঠপর্যায়ের ব্যয়ের খাতার ফারাক আকাশচুম্বী। চলতি ২০extended ২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদে এই হার ছিল গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন-মাত্র ২০.৩ শতাংশ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প নির্বাচন, দরপত্রের দীর্ঘসূত্রতা এবং অদক্ষতার কারণে যেখানে দুই লাখ কোটি টাকার সংশোধিত বাজেটই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না, সেখানে কোন জাদুবলে তিন লাখ কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব হবে? সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল সংখ্যার আকার বাড়ানো ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল।
এবারের বাজেটের সবচেয়ে বিতর্কিত ও উদ্বেগের জায়গাটি হলো 'থোক বরাদ্দের' অভূতপূর্ব ও রহস্যজনক সম্প্রসারণ। মোট বাজেটের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের সাথে যুক্ত নেই, যা মোট বরাদ্দের একটি বিশাল অংশ। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য বিভাগে চলমান প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা-যা মূল প্রকল্পের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি! প্রাথমিক ও গণশিক্ষাতেও একই চিত্র। এই বিপুল পরিমাণ অনির্দিষ্ট বরাদ্দ সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে থাকার কারণে তা অতীতে দুর্নীতির উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার স্বার্থে এই বিশাল থোক বরাদ্দের লাগাম টানা এবং এর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সাথে, এই মহাপরিকল্পনা এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে। মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে আটকে থেকে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে (যেমনটি চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে), তবে বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। আগামী তিন অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ২৭ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার যে পূর্বাভাস বিশেষজ্ঞরা দিচ্ছেন, তা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে বলেছিলেন, "আই হ্যাভ এ প্ল্যান"। এই বাজেট সেই পরিকল্পনারই প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা। উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, উপকূলের সুরক্ষা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের সংযোগ-মানুষ আজ সংখ্যার মায়াজাল দেখতে চায় না, তারা দৃশ্যমান ফলাফল দেখতে চায়।
তিন লাখ কোটি টাকার এই বাজেট একটি স্বপ্নের দলিল হতে পারে, আবার সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে এটি একটি বড় সুযোগ হাতছাড়ার স্মারকও হয়ে উঠতে পারে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, সংখ্যার মহাকাব্য লেখা সহজ, কিন্তু তাকে মানুষের জীবনের পাতায় অনুবাদ করাটাই আসল খতিয়ান। দুর্নীতি দমন, থোক বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারলে এই বাজেট সত্যিই এক নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সম্মেলনকক্ষে গত সোমবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত হয়েছে রেকর্ড তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নসহ এই ব্যয়ের অংক তিন লাখ আট হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় ৫০ শতাংশ। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটের এই বিশাল অবয়ব নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বার্তা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো-কাগজের এই মহাপরিকল্পনা কি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত রূপান্তর ঘটাতে পারবে, নাকি তা কেবলই এক অলীক সংখ্যাবিলাসে পরিণত হবে?
এবারের এডিপির একটি ইতিবাচক দিক হলো এর পঞ্চস্তম্ভের দার্শনিক ভিত্তি। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সুষম বিকাশ এবং সামাজিক সংহতিকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। খাতভিত্তিক বরাদ্দে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব (১৬.৭০ শতাংশ) দেওয়া এবং এর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত দূরদর্শী। একইভাবে, প্রান্তিক মানুষের জন্য 'পরিবার কার্ড' ও 'কৃषक কার্ড'-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত মহৎ উদ্যোগের কার্যকারিতা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে যদি আমরা বাস্তবায়নের চিরচেনা 'দুষ্টচক্র' থেকে বের হতে না পারি।
বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, আমাদের উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের খাতার সাথে মাঠপর্যায়ের ব্যয়ের খাতার ফারাক আকাশচুম্বী। চলতি ২০extended ২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদে এই হার ছিল গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন-মাত্র ২০.৩ শতাংশ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প নির্বাচন, দরপত্রের দীর্ঘসূত্রতা এবং অদক্ষতার কারণে যেখানে দুই লাখ কোটি টাকার সংশোধিত বাজেটই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না, সেখানে কোন জাদুবলে তিন লাখ কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া সম্ভব হবে? সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল সংখ্যার আকার বাড়ানো ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল।
এবারের বাজেটের সবচেয়ে বিতর্কিত ও উদ্বেগের জায়গাটি হলো 'থোক বরাদ্দের' অভূতপূর্ব ও রহস্যজনক সম্প্রসারণ। মোট বাজেটের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের সাথে যুক্ত নেই, যা মোট বরাদ্দের একটি বিশাল অংশ। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য বিভাগে চলমান প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা-যা মূল প্রকল্পের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি! প্রাথমিক ও গণশিক্ষাতেও একই চিত্র। এই বিপুল পরিমাণ অনির্দিষ্ট বরাদ্দ সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে থাকার কারণে তা অতীতে দুর্নীতির উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার স্বার্থে এই বিশাল থোক বরাদ্দের লাগাম টানা এবং এর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সাথে, এই মহাপরিকল্পনা এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে। মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে আটকে থেকে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে (যেমনটি চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে), তবে বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। আগামী তিন অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ২৭ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার যে পূর্বাভাস বিশেষজ্ঞরা দিচ্ছেন, তা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে বলেছিলেন, "আই হ্যাভ এ প্ল্যান"। এই বাজেট সেই পরিকল্পনারই প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা। উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, উপকূলের সুরক্ষা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের সংযোগ-মানুষ আজ সংখ্যার মায়াজাল দেখতে চায় না, তারা দৃশ্যমান ফলাফল দেখতে চায়।
তিন লাখ কোটি টাকার এই বাজেট একটি স্বপ্নের দলিল হতে পারে, আবার সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে এটি একটি বড় সুযোগ হাতছাড়ার স্মারকও হয়ে উঠতে পারে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, সংখ্যার মহাকাব্য লেখা সহজ, কিন্তু তাকে মানুষের জীবনের পাতায় অনুবাদ করাটাই আসল খতিয়ান। দুর্নীতি দমন, থোক বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারলে এই বাজেট সত্যিই এক নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন