মুক্তির লড়াই

সারাদেশ

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) সকালেও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং নগরীর বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি পুরোপুরি না নামায় জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি। লাখো মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও বসতঘর, কোথাও কৃষিজমি, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলা। এসব এলাকায় আকস্মিক বন্যার পানিতে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। সরকারি হিসাবে শুধু চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলাতেই প্রায় চার লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম নগরীতেও দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। যদিও সিটি করপোরেশনের দাবি, নগরীর প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকার পানি নেমে গেছে, তবে নিচু এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট, শমসেরপাড়া, বালুরতাল, অনন্যা আবাসিকসহ কয়েকটি এলাকায় মানুষ এখনো জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।


পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা নৌকা ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।

সরকার জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে মোট ১,০৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গতদের সহায়তায় ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল এবং ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

টানা বৃষ্টির কারণে শিক্ষা কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ও সমমানের নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ রয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় পাঁচজনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু এখনো সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। তবে বৃষ্টি কমে এলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬


টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬

featured Image

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) সকালেও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং নগরীর বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি পুরোপুরি না নামায় জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি। লাখো মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও বসতঘর, কোথাও কৃষিজমি, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলা। এসব এলাকায় আকস্মিক বন্যার পানিতে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। সরকারি হিসাবে শুধু চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলাতেই প্রায় চার লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।


চট্টগ্রাম নগরীতেও দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। যদিও সিটি করপোরেশনের দাবি, নগরীর প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকার পানি নেমে গেছে, তবে নিচু এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট, শমসেরপাড়া, বালুরতাল, অনন্যা আবাসিকসহ কয়েকটি এলাকায় মানুষ এখনো জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।


পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা নৌকা ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।


সরকার জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে মোট ১,০৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গতদের সহায়তায় ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল এবং ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


টানা বৃষ্টির কারণে শিক্ষা কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ও সমমানের নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ রয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।


এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় পাঁচজনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।


আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু এখনো সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। তবে বৃষ্টি কমে এলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই