ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মুক্তির লড়াই

প্রশ্নের মুখে পুলিশের ভূমিকা

নির্বাচন উপলক্ষে গাড়ি রিকুইজিশন : বাড়ছে অসন্তোষ



নির্বাচন উপলক্ষে গাড়ি রিকুইজিশন : বাড়ছে অসন্তোষ

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তুতিতে সারাদেশে বিপুল সংখ্যক যানবাহন রিকুইজিশন করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিকদের মধ্যে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে। বিবিসি বাংলার এক সরজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।


বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কিংবা জনস্বার্থে বাস, মাইক্রোবাস, লেগুনা ও পিকআপের মতো যানবাহন সাময়িকভাবে অধিগ্রহণের ক্ষমতা প্রশাসন ও পুলিশের রয়েছে। তবে ২০২২ সালে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেটকার, ট্যাক্সি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা সাধারণত রিকুইজিশন করার বিধান নেই।

এবারের নির্বাচনে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিনসহ সাপ্তাহিক ও সরকার ঘোষিত ছুটি মিলিয়ে মোট চারদিন ছুটি থাকছে। ফলে এই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সরকারি গাড়ি ব্যবহারহীন থাকার কথা। তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও ভাড়াভিত্তিক গাড়ি কেন রিকুইজিশন করা হচ্ছে—নির্বাচনের দেড় সপ্তাহ আগে সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।


গাড়ি অধিগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট। অনেকেই ফেসবুক পোস্ট ও গ্রুপ আলোচনায় নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার একমাত্র পিকআপ গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে, যা দিয়ে বহু মানুষের জীবিকা চলে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—কোন আইনে একটি গাড়ি দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আরেকজন অভিযোগ করেন, হাইওয়ে পুলিশ তার ব্যক্তিমালিকানাধীন নোয়াহ গাড়ি আটকে কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স জমা নিয়ে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত রিকুইজিশন দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতদিন গাড়ি দেওয়া বা চালকের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

ফেসবুকভিত্তিক ‘ট্রাফিক অ্যালার্ট’ গ্রুপেও গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে সতর্কতা ছড়াচ্ছেন ব্যবহারকারীরা। কোন কোন এলাকায় গাড়ি নিয়ে চলাচলে বেশি ঝুঁকি—সে নিয়েও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শাহবাগ, রামপুরা, মহাখালী ও বাংলামোটরের মতো এলাকাগুলোর নাম ঘুরেফিরে আসছে আলোচনায়।

এদিকে রেন্ট-এ-কার খাতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ সরাসরি প্রাইভেটকার নিচ্ছে না বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে মালিক ও চালকের সম্মতি ছাড়াই গাড়ি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এক পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, তাদের গাড়ি জোরপূর্বক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে মালিক পক্ষ কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

একই অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার দাবি, এ পর্যন্ত সাতটি নোয়াহ ও হায়েস গাড়ি রিকুইজিশনে নেওয়া হয়েছে। ড্রাইভারদের জন্য পর্যাপ্ত থাকার ব্যবস্থা না থাকা এবং ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত থাকায় তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার দূরপাল্লার যানবাহন রিকুইজিশন করা হয়েছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তার অভিযোগ, গাড়ির ভাড়া, চালক ও সহকারীদের বেতন এবং জ্বালানি খরচ কীভাবে পরিশোধ হবে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

গাড়ি রিকুইজিশন সংক্রান্ত ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অতীতে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের রায়ে আদালত ১১ দফা নির্দেশনা দেয়। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়—প্রাইভেটকার, ট্যাক্সি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিকুইজিশন করা যাবে না এবং কোনো গাড়ি একটানা সাত দিনের বেশি অধিগ্রহণ করা নিষিদ্ধ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে গাড়ি নেওয়া গেলেও তা জোরপূর্বক হতে পারে না এবং গাড়ির মালিক ও চালকদের সকল ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।

অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—সরকারি গাড়ির সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সাময়িকভাবে এসব যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দায়িত্ব পালন করবেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

তবে আইন ও বাস্তবতার এই ব্যবধান দূর না হলে, নির্বাচন সামনে রেখে গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


নির্বাচন উপলক্ষে গাড়ি রিকুইজিশন : বাড়ছে অসন্তোষ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তুতিতে সারাদেশে বিপুল সংখ্যক যানবাহন রিকুইজিশন করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিকদের মধ্যে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে। বিবিসি বাংলার এক সরজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।


বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কিংবা জনস্বার্থে বাস, মাইক্রোবাস, লেগুনা ও পিকআপের মতো যানবাহন সাময়িকভাবে অধিগ্রহণের ক্ষমতা প্রশাসন ও পুলিশের রয়েছে। তবে ২০২২ সালে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেটকার, ট্যাক্সি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা সাধারণত রিকুইজিশন করার বিধান নেই।


এবারের নির্বাচনে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিনসহ সাপ্তাহিক ও সরকার ঘোষিত ছুটি মিলিয়ে মোট চারদিন ছুটি থাকছে। ফলে এই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সরকারি গাড়ি ব্যবহারহীন থাকার কথা। তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও ভাড়াভিত্তিক গাড়ি কেন রিকুইজিশন করা হচ্ছে—নির্বাচনের দেড় সপ্তাহ আগে সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।


গাড়ি অধিগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট। অনেকেই ফেসবুক পোস্ট ও গ্রুপ আলোচনায় নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার একমাত্র পিকআপ গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে, যা দিয়ে বহু মানুষের জীবিকা চলে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—কোন আইনে একটি গাড়ি দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।




আরেকজন অভিযোগ করেন, হাইওয়ে পুলিশ তার ব্যক্তিমালিকানাধীন নোয়াহ গাড়ি আটকে কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স জমা নিয়ে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত রিকুইজিশন দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতদিন গাড়ি দেওয়া বা চালকের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।



ফেসবুকভিত্তিক ‘ট্রাফিক অ্যালার্ট’ গ্রুপেও গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে সতর্কতা ছড়াচ্ছেন ব্যবহারকারীরা। কোন কোন এলাকায় গাড়ি নিয়ে চলাচলে বেশি ঝুঁকি—সে নিয়েও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শাহবাগ, রামপুরা, মহাখালী ও বাংলামোটরের মতো এলাকাগুলোর নাম ঘুরেফিরে আসছে আলোচনায়।




এদিকে রেন্ট-এ-কার খাতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ সরাসরি প্রাইভেটকার নিচ্ছে না বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে মালিক ও চালকের সম্মতি ছাড়াই গাড়ি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এক পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, তাদের গাড়ি জোরপূর্বক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে মালিক পক্ষ কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।



একই অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার দাবি, এ পর্যন্ত সাতটি নোয়াহ ও হায়েস গাড়ি রিকুইজিশনে নেওয়া হয়েছে। ড্রাইভারদের জন্য পর্যাপ্ত থাকার ব্যবস্থা না থাকা এবং ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত থাকায় তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন।


এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার দূরপাল্লার যানবাহন রিকুইজিশন করা হয়েছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তার অভিযোগ, গাড়ির ভাড়া, চালক ও সহকারীদের বেতন এবং জ্বালানি খরচ কীভাবে পরিশোধ হবে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।


গাড়ি রিকুইজিশন সংক্রান্ত ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অতীতে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের রায়ে আদালত ১১ দফা নির্দেশনা দেয়। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়—প্রাইভেটকার, ট্যাক্সি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিকুইজিশন করা যাবে না এবং কোনো গাড়ি একটানা সাত দিনের বেশি অধিগ্রহণ করা নিষিদ্ধ।




সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে গাড়ি নেওয়া গেলেও তা জোরপূর্বক হতে পারে না এবং গাড়ির মালিক ও চালকদের সকল ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।




অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—সরকারি গাড়ির সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সাময়িকভাবে এসব যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দায়িত্ব পালন করবেন বলেও উল্লেখ করা হয়।




তবে আইন ও বাস্তবতার এই ব্যবধান দূর না হলে, নির্বাচন সামনে রেখে গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত