মহান স্বাধীনতার মাস মার্চ। বাঙালির স্বাধীনতা ঘোষণার মাস। আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাস। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে অধিকার আদায়ের অগ্নিঝরা এক অধ্যায়ের নাম-মার্চ। ১৯৭১ সালের এই মাসেই বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, জাতি পায় স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা, আর শুরু হয় ইতিহাসের এক রক্তঝরা সংগ্রাম।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান-এ লাখো জনতার সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দেন, তা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই উচ্চারণ শুধু একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপণের মুহূর্ত। সেই ভাষণ মুক্তিকামী মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছিল, দিয়েছিল সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
মার্চ মাসজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে কার্যত পূর্ববাংলার শাসনভার জনগণের হাতে চলে আসে। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা-সবখানেই বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পাকিস্তানি শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সংগঠিত হতে থাকে স্বাধীনতার প্রস্তুতি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন গোপনে এবং প্রকাশ্যে মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি জোরদার করে।
তবে, ষাটের দশক থেকেই স্বাধীনতার বীজ বপন শুরু হয়। ছাত্রসমাজের একটি অগ্রণী অংশ, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক এবং কাজী আরিফ আহমেদ-তারা স্বাধীনতার লক্ষ্যে গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা চালান। “স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস” নামে পরিচিত এ সংগঠন পরবর্তীতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা মুজিব বাহিনী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যা মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে জনআন্দোলনকে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ধাবিত করে।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণআন্দোলনের এই জোয়ার মেনে নেয়নি। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়; ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ইপিআর সদর দপ্তরেও প্রতিরোধ ভেঙে দিতে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট-সব মিলিয়ে ঢাকা নগরী পরিণত হয় রক্তাক্ত জনপদে।
২৫ মার্চের মধ্যরাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সেই ঘোষণা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ২৩ বছরের বঞ্চনা, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয় সেদিন থেকেই। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতা শব্দটি আপেক্ষিক হলেও এর গভীরতা ও আবেগ অসীম। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা একটি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল, দেশপ্রেমিক ও মর্যাদাবান করে তোলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এক অনন্য অর্জন। মার্চের প্রতিটি দিন-৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো, ২৫ মার্চের কালরাত এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা-সব মিলিয়ে এ মাসটি গৌরব, বেদনা ও অমিত সাহসের প্রতীক।
অগ্নিঝরা মার্চ শুধু একটি মাসের নাম নয়; এটি একটি জাতির জাগরণের ইতিহাস, আত্মত্যাগের মহাকাব্য এবং স্বাধীনতার অমোঘ শপথ। ১৯৭১ সালের সেই মার্চ আজও বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয়-স্বাধীনতা কখনো বিনা মূল্যে আসে না; তা অর্জন করতে হয় ত্যাগ, রক্ত ও অবিচল সাহসের বিনিময়ে।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মার্চ ২০২৬
মহান স্বাধীনতার মাস মার্চ। বাঙালির স্বাধীনতা ঘোষণার মাস। আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাস। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে অধিকার আদায়ের অগ্নিঝরা এক অধ্যায়ের নাম-মার্চ। ১৯৭১ সালের এই মাসেই বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, জাতি পায় স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা, আর শুরু হয় ইতিহাসের এক রক্তঝরা সংগ্রাম।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান-এ লাখো জনতার সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দেন, তা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই উচ্চারণ শুধু একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপণের মুহূর্ত। সেই ভাষণ মুক্তিকামী মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছিল, দিয়েছিল সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
মার্চ মাসজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে কার্যত পূর্ববাংলার শাসনভার জনগণের হাতে চলে আসে। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা-সবখানেই বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পাকিস্তানি শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সংগঠিত হতে থাকে স্বাধীনতার প্রস্তুতি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন গোপনে এবং প্রকাশ্যে মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি জোরদার করে।
তবে, ষাটের দশক থেকেই স্বাধীনতার বীজ বপন শুরু হয়। ছাত্রসমাজের একটি অগ্রণী অংশ, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক এবং কাজী আরিফ আহমেদ-তারা স্বাধীনতার লক্ষ্যে গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা চালান। “স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস” নামে পরিচিত এ সংগঠন পরবর্তীতে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা মুজিব বাহিনী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যা মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে জনআন্দোলনকে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ধাবিত করে।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণআন্দোলনের এই জোয়ার মেনে নেয়নি। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়; ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ইপিআর সদর দপ্তরেও প্রতিরোধ ভেঙে দিতে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট-সব মিলিয়ে ঢাকা নগরী পরিণত হয় রক্তাক্ত জনপদে।
২৫ মার্চের মধ্যরাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সেই ঘোষণা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ২৩ বছরের বঞ্চনা, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয় সেদিন থেকেই। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতা শব্দটি আপেক্ষিক হলেও এর গভীরতা ও আবেগ অসীম। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা একটি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল, দেশপ্রেমিক ও মর্যাদাবান করে তোলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এক অনন্য অর্জন। মার্চের প্রতিটি দিন-৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো, ২৫ মার্চের কালরাত এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা-সব মিলিয়ে এ মাসটি গৌরব, বেদনা ও অমিত সাহসের প্রতীক।
অগ্নিঝরা মার্চ শুধু একটি মাসের নাম নয়; এটি একটি জাতির জাগরণের ইতিহাস, আত্মত্যাগের মহাকাব্য এবং স্বাধীনতার অমোঘ শপথ। ১৯৭১ সালের সেই মার্চ আজও বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয়-স্বাধীনতা কখনো বিনা মূল্যে আসে না; তা অর্জন করতে হয় ত্যাগ, রক্ত ও অবিচল সাহসের বিনিময়ে।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন