ঢাকা   মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
মুক্তির লড়াই

অগ্নিঝরা মার্চ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ—বাঙালির মুক্তির সনদ



অগ্নিঝরা মার্চ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ—বাঙালির মুক্তির সনদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস এক অগ্নিঝরা ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই মাসের প্রতিটি দিন ছিল উত্তাল আন্দোলন, প্রতিবাদ, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্দীপ্ত এক জাতির অদম্য প্রত্যয়ের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, শোষণ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি যে ক্ষোভ ও প্রতিরোধের সঞ্চয় করেছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটে এই মার্চ মাসেই। এই উত্তাল সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জাতির জনক শেখ মজিবুর রহমান , যার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয় এবং যা পরবর্তীকালে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ -কে বিজয়ী করে জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করেন। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়হিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভূট্রু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে নানা কৌশল ও টালবাহানা শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ববাংলা জুড়ে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবীসহ সব শ্রেণির মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। এই পরিস্থিতিতে বাঙালির একমাত্র আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।


এরপর শুরু হয় ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব প্রশাসনিক কার্যক্রম জনগণের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পূর্ববাংলার প্রশাসন কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। পাকিস্তানি প্রশাসনের কর্তৃত্ব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো পূর্ববাংলা কার্যত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের অধীন হয়ে যায়।

এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেইসকোর্স ময়দান-এ (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। প্রায় ১৮ মিনিটের সেই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতির সামনে স্বাধীনতার সংগ্রামের রূপরেখা তুলে ধরেন। দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন-“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যদিও তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, কিন্তু তার ভাষণের প্রতিটি বাক্য ছিল স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতির আহ্বান।

বঙ্গবন্ধু এই ভাষণে দেশ পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেন। তিনি ঘোষণা করেন-সব ধরনের কোর্ট-কাচারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান তার নির্দেশ ছাড়া চলবে না। জনগণকে কর বা রাজস্ব পাকিস্তান সরকারের কাছে না দেওয়ার নির্দেশ দেন। ব্যাংক সীমিত সময়ের জন্য খোলা রাখার কথা বলেন, তবে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ রাখতে বলেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জনগণের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। রেডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেরও তিনি জনগণের স্বার্থ রক্ষার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।” বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনার ফলে কার্যত পূর্ববাংলার প্রশাসন, অর্থনীতি এবং যোগাযোগব্যবস্থা জনগণের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।


এদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নামে ঢাকায় আলোচনার নাটক চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু গোপনে তারা বাঙালি জাতিকে দমন করার জন্য ভয়ংকর সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন টিক্কা খান, যিনি তার নির্মমতার জন্য “বুচার অব বেঙ্গল” নামে কুখ্যাত ছিলেন। পরে সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন এ এ কে নিয়াজি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনঅপারেশন সার্চ লাইট” নামে এক পরিকল্পিত গণহত্যা অভিযান শুরু করে। ট্যাংক, কামান ও ভারী অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি আর্মি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একযোগে হামলা চালায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র ও শিক্ষকদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন ছাত্রাবাসে শত শত ছাত্রকে হত্যা করা হয়। একই রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তরেও হামলা চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।

এই ভয়াল রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শুরুবাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী শুধু নিজেরাই হত্যাযজ্ঞ চালায়নি; তারা স্থানীয় দোসরদের নিয়ে গড়ে তোলে কুখ্যাত সহযোগী বাহিনী - রাজাকার, আল বদর এবং আল-সামস্। এই বাহিনীগুলো পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় গ্রামেগঞ্জে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটায়। বিশেষ করে যুদ্ধের শেষ দিকে আল-বদর বাহিনী পরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ মেধাবী বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যা করে। ইতিহাসে এই নির্মম ঘটনাকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যা নামে পরিচিত।

পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী বাহিনীর বর্বরতায় অসংখ্য গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধ কেউই এই নৃশংসতা থেকে রক্ষা পায়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং প্রায় এক কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। হাজার হাজার নারী পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন।

তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বাঙালি জাতি সাহস হারায়নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল তাদের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। সেই ভাষণের নির্দেশনা অনুসরণ করে ছাত্র, যুবক, কৃষক ও শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধ।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং জন্ম নেয় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই বিজয়ের পেছনে ছিল অগণিত শহীদের আত্মত্যাগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব।

আজও ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির কাছে স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক। এই ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বাঙালির সাহস, ঐক্য ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠের আহ্বান আজও স্বাধীনতা, ন্যায় এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগায়।

এই কারণেই বলা হয়-বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, যা একটি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি, সাহস এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।

লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬


অগ্নিঝরা মার্চ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ—বাঙালির মুক্তির সনদ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস এক অগ্নিঝরা ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই মাসের প্রতিটি দিন ছিল উত্তাল আন্দোলন, প্রতিবাদ, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্দীপ্ত এক জাতির অদম্য প্রত্যয়ের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, শোষণ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি যে ক্ষোভ ও প্রতিরোধের সঞ্চয় করেছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটে এই মার্চ মাসেই। এই উত্তাল সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জাতির জনক শেখ মজিবুর রহমান , যার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয় এবং যা পরবর্তীকালে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।


১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ -কে বিজয়ী করে জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করেন। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়হিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভূট্রু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে নানা কৌশল ও টালবাহানা শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ববাংলা জুড়ে বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবীসহ সব শ্রেণির মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। এই পরিস্থিতিতে বাঙালির একমাত্র আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।


এরপর শুরু হয় ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব প্রশাসনিক কার্যক্রম জনগণের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পূর্ববাংলার প্রশাসন কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। পাকিস্তানি প্রশাসনের কর্তৃত্ব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো পূর্ববাংলা কার্যত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের অধীন হয়ে যায়।


এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেইসকোর্স ময়দান-এ (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। প্রায় ১৮ মিনিটের সেই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতির সামনে স্বাধীনতার সংগ্রামের রূপরেখা তুলে ধরেন। দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন-“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যদিও তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, কিন্তু তার ভাষণের প্রতিটি বাক্য ছিল স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতির আহ্বান।


বঙ্গবন্ধু এই ভাষণে দেশ পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেন। তিনি ঘোষণা করেন-সব ধরনের কোর্ট-কাচারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান তার নির্দেশ ছাড়া চলবে না। জনগণকে কর বা রাজস্ব পাকিস্তান সরকারের কাছে না দেওয়ার নির্দেশ দেন। ব্যাংক সীমিত সময়ের জন্য খোলা রাখার কথা বলেন, তবে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ রাখতে বলেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জনগণের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। রেডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেরও তিনি জনগণের স্বার্থ রক্ষার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।” বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনার ফলে কার্যত পূর্ববাংলার প্রশাসন, অর্থনীতি এবং যোগাযোগব্যবস্থা জনগণের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।


এদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নামে ঢাকায় আলোচনার নাটক চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু গোপনে তারা বাঙালি জাতিকে দমন করার জন্য ভয়ংকর সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন টিক্কা খান, যিনি তার নির্মমতার জন্য “বুচার অব বেঙ্গল” নামে কুখ্যাত ছিলেন। পরে সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন এ এ কে নিয়াজি।


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনঅপারেশন সার্চ লাইট” নামে এক পরিকল্পিত গণহত্যা অভিযান শুরু করে। ট্যাংক, কামান ও ভারী অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি আর্মি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একযোগে হামলা চালায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র ও শিক্ষকদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন ছাত্রাবাসে শত শত ছাত্রকে হত্যা করা হয়। একই রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তরেও হামলা চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।


এই ভয়াল রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শুরুবাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ।


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী শুধু নিজেরাই হত্যাযজ্ঞ চালায়নি; তারা স্থানীয় দোসরদের নিয়ে গড়ে তোলে কুখ্যাত সহযোগী বাহিনী - রাজাকার, আল বদর এবং আল-সামস্। এই বাহিনীগুলো পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় গ্রামেগঞ্জে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটায়। বিশেষ করে যুদ্ধের শেষ দিকে আল-বদর বাহিনী পরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ মেধাবী বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যা করে। ইতিহাসে এই নির্মম ঘটনাকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যা নামে পরিচিত।


পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী বাহিনীর বর্বরতায় অসংখ্য গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধ কেউই এই নৃশংসতা থেকে রক্ষা পায়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং প্রায় এক কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। হাজার হাজার নারী পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন।


তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বাঙালি জাতি সাহস হারায়নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল তাদের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। সেই ভাষণের নির্দেশনা অনুসরণ করে ছাত্র, যুবক, কৃষক ও শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধ।


দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং জন্ম নেয় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই বিজয়ের পেছনে ছিল অগণিত শহীদের আত্মত্যাগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব।


আজও ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির কাছে স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক। এই ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বাঙালির সাহস, ঐক্য ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠের আহ্বান আজও স্বাধীনতা, ন্যায় এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগায়।


এই কারণেই বলা হয়-বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, যা একটি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি, সাহস এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।


লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত