বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ সিলেট–আখাউড়া সেকশন আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। প্রায় ১৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ, যা একদিকে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগের প্রাণরেখা, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর, সেই পথেই গত ৮ বছরে ১৬টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং দেশের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে সামনে নিয়ে আসে।
ঐতিহাসিকভাবে এই রেলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ আমলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে নির্মিত এই লাইনটি মূলত সিলেটকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়। স্বাধীনতার পর এবং বিশেষ করে ১৯৮৭ সালে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর মাধ্যমে এই রুটে যাত্রী চলাচল আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে কালনী, জয়ন্তিকা, উপবন, পারাবত, পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসসহ প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন এই রুটে চলাচল করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রেলপথ কি আজও সেই সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, না।
এই সেকশনের বড় একটি অংশ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় অবস্থিত, বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া প্রায় ৮ কিলোমিটার রেলপথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেললাইনের নাট-বোল্ট, ফিশপ্লেট, ক্লিপ ও স্লিপার দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও লাইনের পাথর পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে, যা সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে; ফলে একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতাই নয়, রয়েছে ব্যবস্থাপনাগত সংকটও। বাংলাদেশ রেলওয়ের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ইঞ্জিনকে অন্তত ৩–৪ ঘণ্টা বিশ্রাম দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। একই ইঞ্জিন দিয়ে একাধিক ট্রেন চালানো হচ্ছে, ফলে ইঞ্জিন বিকল হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গত এক মাসেই অন্তত ৪০টি ট্রেন ইঞ্জিন বিকলের কারণে বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছেছে, যা সিডিউল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ।
দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ২০১৯ সালে একাধিক লাইনচ্যুতি, ফেঞ্চুগঞ্জ ও কুলাউড়া এলাকায় দুর্ঘটনা, বরমচালে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, এসব ঘটনা এখনও মানুষের মনে তাজা। সাম্প্রতিক সময়েও একই চিত্র: ২০২৪ সালে উদয়ন এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল, মার্চে উপবন এক্সপ্রেস মাঝপথে থেমে যাওয়া এবং সর্বশেষ তেলবাহী ট্রেনের ট্যাঙ্কার লাইনচ্যুত হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকা, সব মিলিয়ে এই রুট এখন এক অনিশ্চয়তার নাম।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। টিকিট সংকট, অতিরিক্ত যাত্রী, শিডিউল বিপর্যয় এবং নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে রেলমুখী হওয়া থেকে বিরত হচ্ছে। অথচ পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে রেলপথের বিকল্প নেই। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে-সমস্যার সমাধান কোথায়?
প্রথমত, এই রেলপথে জরুরি ভিত্তিতে অবকাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। শত বছরের পুরোনো লাইন, সেতু ও স্লিপার পরিবর্তন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, চুরি প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। তৃতীয়ত, লোকোমোটিভ ও কোচের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন আটকে না পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সিলেট–আখাউড়া রেলপথকে আধুনিক ও ডাবল লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতে এই রুট আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সিলেট–আখাউড়া রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়; এটি একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা, পর্যটন ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি।
অবহেলা আর দীর্ঘসূত্রিতা যদি চলতেই থাকে, তবে এই রেলপথ একসময় যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠবে। এখনই সময়, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ সিলেট–আখাউড়া সেকশন আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। প্রায় ১৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ, যা একদিকে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগের প্রাণরেখা, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর, সেই পথেই গত ৮ বছরে ১৬টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং দেশের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে সামনে নিয়ে আসে।
ঐতিহাসিকভাবে এই রেলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ আমলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে নির্মিত এই লাইনটি মূলত সিলেটকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়। স্বাধীনতার পর এবং বিশেষ করে ১৯৮৭ সালে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর মাধ্যমে এই রুটে যাত্রী চলাচল আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে কালনী, জয়ন্তিকা, উপবন, পারাবত, পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসসহ প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন এই রুটে চলাচল করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রেলপথ কি আজও সেই সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, না।
এই সেকশনের বড় একটি অংশ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় অবস্থিত, বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া প্রায় ৮ কিলোমিটার রেলপথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেললাইনের নাট-বোল্ট, ফিশপ্লেট, ক্লিপ ও স্লিপার দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও লাইনের পাথর পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে, যা সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে; ফলে একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতাই নয়, রয়েছে ব্যবস্থাপনাগত সংকটও। বাংলাদেশ রেলওয়ের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ইঞ্জিনকে অন্তত ৩–৪ ঘণ্টা বিশ্রাম দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। একই ইঞ্জিন দিয়ে একাধিক ট্রেন চালানো হচ্ছে, ফলে ইঞ্জিন বিকল হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গত এক মাসেই অন্তত ৪০টি ট্রেন ইঞ্জিন বিকলের কারণে বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছেছে, যা সিডিউল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ।
দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ২০১৯ সালে একাধিক লাইনচ্যুতি, ফেঞ্চুগঞ্জ ও কুলাউড়া এলাকায় দুর্ঘটনা, বরমচালে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, এসব ঘটনা এখনও মানুষের মনে তাজা। সাম্প্রতিক সময়েও একই চিত্র: ২০২৪ সালে উদয়ন এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল, মার্চে উপবন এক্সপ্রেস মাঝপথে থেমে যাওয়া এবং সর্বশেষ তেলবাহী ট্রেনের ট্যাঙ্কার লাইনচ্যুত হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকা, সব মিলিয়ে এই রুট এখন এক অনিশ্চয়তার নাম।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। টিকিট সংকট, অতিরিক্ত যাত্রী, শিডিউল বিপর্যয় এবং নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে রেলমুখী হওয়া থেকে বিরত হচ্ছে। অথচ পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে রেলপথের বিকল্প নেই। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে-সমস্যার সমাধান কোথায়?
প্রথমত, এই রেলপথে জরুরি ভিত্তিতে অবকাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। শত বছরের পুরোনো লাইন, সেতু ও স্লিপার পরিবর্তন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, চুরি প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। তৃতীয়ত, লোকোমোটিভ ও কোচের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন আটকে না পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সিলেট–আখাউড়া রেলপথকে আধুনিক ও ডাবল লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতে এই রুট আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সিলেট–আখাউড়া রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়; এটি একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা, পর্যটন ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি।
অবহেলা আর দীর্ঘসূত্রিতা যদি চলতেই থাকে, তবে এই রেলপথ একসময় যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠবে। এখনই সময়, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন