মুক্তির লড়াই

জাতীয়

চিরনিদ্রায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক তোফায়েল আহমেদ: কোড়ালিয়ায় দাফন সম্পন্ন

চিরনিদ্রায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক তোফায়েল আহমেদ: কোড়ালিয়ায় দাফন সম্পন্ন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি ফিরে গেলেন তাঁর চিরচেনা মাটির টানে। আজ মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) বেলা সোয়া ৪টায় তাঁর জন্মভূমি ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা-মা ও সহধর্মিণীর কবরের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। এর আগে, বেলা আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বীপ জেলার প্রিয় এই নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মাঠ পেরিয়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় চারপাশ। দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগে গত ১ জুন, সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮২ বছর বয়সী এই প্রবীণ প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। গত বছরের ২০ নভেম্বর তাঁর সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমেদও মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা চিকিৎসক তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী, জামাতা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুজ্জামান তুহিনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শোকাকুল রাজনৈতিক কর্মী-সহযোদ্ধা রেখে গেছেন।

তোফায়েল আহমেদের জীবন মানেই যেন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মৌলভী আজহার আলী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ফাতেমা খানম ছিলেন গৃহিণী। শিক্ষা জীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে যথাক্রমে ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালে আইএসসি ও বিএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মফিজুল হক তালুকদারের বড় মেয়ে আনোয়ার বেগমকে (আনোয়ারা আহমেদ) বিয়ে করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়েও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ ছিল রাজপথ। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের উত্থান ছিল রূপকথার মতো। ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দেওয়ার পর তিনি ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর  ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন এবং এর আহ্বায়ক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর তেজস্বী ও আপসহীন নেতৃত্বে তৎকালীন আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা কেঁপে উঠেছিল, যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের পাতায় তোফায়েল আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে একটি বিশেষ ঘটনার জন্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সের এই তরুণ বজ্রকণ্ঠে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ-প্রতিটি বাঁকে তোফায়েল আহমেদ রেখেছেন অসামান্য কীর্তি। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর, ১৯৭০ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি ভোলার আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও অকুতোভয় ‘মুজিব বাহিনী’র (বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধান অধিনায়কের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চল নিয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কমান্ড ছিল তাঁর হাতে। দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তৎকালীন সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আদর্শের পথে অবিচল ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর টানা ৩৩ মাসসহ জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে, কিন্তু আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি এক চুলও। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দলের ক্রান্তিলগ্নে শক্ত হাল ধরেন।

সংসদীয় রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ তৈরি করেছেন এক অনন্য ও দুর্ভেদ্য রেকর্ড। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোট ১২টি সংসদীয় নির্বাচনের মধ্যে ভোলা ও ময়মনসিংহ আসন থেকে মোট ৯ বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি সফলভাবে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ ও ২০১৪ সালেও তিনি আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারকরণে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। সর্বশেষ শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। ২০২১ সাল থেকে অসুস্থতার কারণে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। রাজপথের তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নীতি নির্ধারক এবং প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি যে কীর্তি রেখে গেছেন, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের নাম চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে। ইতিহাসের এই মহানায়ক বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে, অনন্তকাল।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


চিরনিদ্রায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক তোফায়েল আহমেদ: কোড়ালিয়ায় দাফন সম্পন্ন

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি ফিরে গেলেন তাঁর চিরচেনা মাটির টানে। আজ মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) বেলা সোয়া ৪টায় তাঁর জন্মভূমি ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা-মা ও সহধর্মিণীর কবরের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। এর আগে, বেলা আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বীপ জেলার প্রিয় এই নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মাঠ পেরিয়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় চারপাশ। দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগে গত ১ জুন, সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮২ বছর বয়সী এই প্রবীণ প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। গত বছরের ২০ নভেম্বর তাঁর সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমেদও মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা চিকিৎসক তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী, জামাতা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুজ্জামান তুহিনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শোকাকুল রাজনৈতিক কর্মী-সহযোদ্ধা রেখে গেছেন।


তোফায়েল আহমেদের জীবন মানেই যেন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মৌলভী আজহার আলী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ফাতেমা খানম ছিলেন গৃহিণী। শিক্ষা জীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে যথাক্রমে ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালে আইএসসি ও বিএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মফিজুল হক তালুকদারের বড় মেয়ে আনোয়ার বেগমকে (আনোয়ারা আহমেদ) বিয়ে করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়েও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ ছিল রাজপথ। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের উত্থান ছিল রূপকথার মতো। ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দেওয়ার পর তিনি ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর  ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন এবং এর আহ্বায়ক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর তেজস্বী ও আপসহীন নেতৃত্বে তৎকালীন আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা কেঁপে উঠেছিল, যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের পাতায় তোফায়েল আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে একটি বিশেষ ঘটনার জন্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সের এই তরুণ বজ্রকণ্ঠে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ-প্রতিটি বাঁকে তোফায়েল আহমেদ রেখেছেন অসামান্য কীর্তি। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর, ১৯৭০ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি ভোলার আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও অকুতোভয় ‘মুজিব বাহিনী’র (বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধান অধিনায়কের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চল নিয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কমান্ড ছিল তাঁর হাতে। দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তৎকালীন সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আদর্শের পথে অবিচল ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর টানা ৩৩ মাসসহ জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে, কিন্তু আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি এক চুলও। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দলের ক্রান্তিলগ্নে শক্ত হাল ধরেন।


সংসদীয় রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ তৈরি করেছেন এক অনন্য ও দুর্ভেদ্য রেকর্ড। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোট ১২টি সংসদীয় নির্বাচনের মধ্যে ভোলা ও ময়মনসিংহ আসন থেকে মোট ৯ বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি সফলভাবে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ ও ২০১৪ সালেও তিনি আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারকরণে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। সর্বশেষ শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। ২০২১ সাল থেকে অসুস্থতার কারণে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। রাজপথের তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নীতি নির্ধারক এবং প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি যে কীর্তি রেখে গেছেন, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের নাম চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে। ইতিহাসের এই মহানায়ক বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে, অনন্তকাল।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই