মুক্তির লড়াই

সারাদেশ

আত্রাইয়ে ১২ বছরের স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ, সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে ৩ জনের কারাদণ্ড

আত্রাইয়ে ১২ বছরের স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ, সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে ৩ জনের কারাদণ্ড

নওগাঁর আত্রাইয়ে ১২ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইল কোর্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলার চেষ্টা এবং আটক বরকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় বাল্যবিবাহ আয়োজনের সঙ্গে জড়িত থাকায় বর ও কনের বাবাকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ২টার দিকে উপজেলার বিশা ইউনিয়নের সমাসপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, সমাসপাড়া এলাকায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে—এমন খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে বাল্যবিবাহের আয়োজনের সত্যতা পাওয়া যায়।


এ সময় বর ও কনের বাবা-মাকে বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হয়। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তারা সেখানে উপস্থিত হননি। পরে মোবাইল কোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বর আল আমিন ও কনেকে আটক করেন।

আটক বর ও কনেকে সরকারি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় বরপক্ষের পরিবারের লোকজনসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন গাড়িটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় আটক বরকে ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মোবাইল কোর্টে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য, পেশকার ও গ্রাম পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

পরে বিষয়টি আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জকে জানানো হলে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এরপর বর-কনেসহ প্রথমে তিনজনকে আটক করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে আরও চারজনকে আটক করা হয়।

মোবাইল কোর্ট সূত্রে জানা যায়, বাল্যবিবাহ আয়োজনের অপরাধে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বরের বাবা মোঃ ইয়ানুস শেখকে ২০ হাজার টাকা এবং কনের বাবা জুয়েলকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়।

অন্যদিকে সরকারি কাজে বাধা, আটক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য, পেশকার ও গ্রাম পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—সমাসপাড়ার করম আলী শেখের ছেলে মান্নান শেখ, তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইয়ানুস শেখের ছেলে মোঃ রাব্বি শেখকে ছয় মাস এবং মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে মোঃ মাহাতাব আলীকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহ না দেওয়ার বিষয়ে বর ও কনের বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ১২ বছর বয়সী একজন স্কুলছাত্রীর বিয়ের আয়োজন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ বয়সে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা। অল্প বয়সে বিয়ে হলে তার শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তারা বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো পরিবার যাতে সন্তানের অল্প বয়সে বিয়ের আয়োজন করতে না পারে, সে বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সচেতন মহলের মতে, প্রশাসন বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গেলে তাদের সহযোগিতা করা উচিত। সরকারি কাজে বাধা দেওয়া কিংবা আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, “বাল্যবিবাহের খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। আসামিকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় একদল লোক সরকারি গাড়ি আটকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “শিশুদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বাল্যবিবাহ বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বাড়লে এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে কোনো শিশুর বিয়ে আয়োজনের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত প্রশাসনকে জানিয়ে তা প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


আত্রাইয়ে ১২ বছরের স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ, সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে ৩ জনের কারাদণ্ড

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নওগাঁর আত্রাইয়ে ১২ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইল কোর্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলার চেষ্টা এবং আটক বরকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় বাল্যবিবাহ আয়োজনের সঙ্গে জড়িত থাকায় বর ও কনের বাবাকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।


শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ২টার দিকে উপজেলার বিশা ইউনিয়নের সমাসপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।


জানা যায়, সমাসপাড়া এলাকায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে—এমন খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে বাল্যবিবাহের আয়োজনের সত্যতা পাওয়া যায়।


এ সময় বর ও কনের বাবা-মাকে বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হয়। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তারা সেখানে উপস্থিত হননি। পরে মোবাইল কোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বর আল আমিন ও কনেকে আটক করেন।


আটক বর ও কনেকে সরকারি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় বরপক্ষের পরিবারের লোকজনসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন গাড়িটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় আটক বরকে ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।


পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মোবাইল কোর্টে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য, পেশকার ও গ্রাম পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।


পরে বিষয়টি আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জকে জানানো হলে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এরপর বর-কনেসহ প্রথমে তিনজনকে আটক করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে আরও চারজনকে আটক করা হয়।


মোবাইল কোর্ট সূত্রে জানা যায়, বাল্যবিবাহ আয়োজনের অপরাধে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বরের বাবা মোঃ ইয়ানুস শেখকে ২০ হাজার টাকা এবং কনের বাবা জুয়েলকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়।


অন্যদিকে সরকারি কাজে বাধা, আটক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য, পেশকার ও গ্রাম পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।


দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—সমাসপাড়ার করম আলী শেখের ছেলে মান্নান শেখ, তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইয়ানুস শেখের ছেলে মোঃ রাব্বি শেখকে ছয় মাস এবং মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে মোঃ মাহাতাব আলীকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


এ ছাড়া ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহ না দেওয়ার বিষয়ে বর ও কনের বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে।


স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ১২ বছর বয়সী একজন স্কুলছাত্রীর বিয়ের আয়োজন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ বয়সে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা। অল্প বয়সে বিয়ে হলে তার শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে।


তারা বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো পরিবার যাতে সন্তানের অল্প বয়সে বিয়ের আয়োজন করতে না পারে, সে বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।


সচেতন মহলের মতে, প্রশাসন বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গেলে তাদের সহযোগিতা করা উচিত। সরকারি কাজে বাধা দেওয়া কিংবা আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, “বাল্যবিবাহের খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। আসামিকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় একদল লোক সরকারি গাড়ি আটকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”


তিনি আরও বলেন, “শিশুদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বাল্যবিবাহ বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”


স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বাড়লে এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে কোনো শিশুর বিয়ে আয়োজনের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত প্রশাসনকে জানিয়ে তা প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।



মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই