চৌদ্দগ্রামে বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার
কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার বিরুদ্ধে গ্যাস ফিলিং স্টেশনে মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সাথে, হলফনামায় এই সংক্রান্ত মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগও আনা হয়েছে। কনকাপৈত ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ মনির হোসেন গত শনিবার কুমিল্লা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় এই অভিযোগ করেন।
দাখিলকৃত হলফনামায় মনির হোসেন উল্লেখ করেন, কামরুল হুদার যৌথ মালিকানাধীন মেসার্স মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেডের গ্যাস মিটারে একাধিকবার অবৈধ হস্তক্ষেপ (মিটার টেম্পারিং) করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ১১ কোটি ৮৩ লাখ ৫ হাজার ১০ টাকা সরকারি বকেয়া রয়েছে।
হলফনামায় ফৌজদারি মামলার তথ্যও গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এর মধ্যে চৌদ্দগ্রাম থানার মামলা নং-০৯ (তারিখ ০৭/০২/২০১৮), জিআর নং-৪৩/১৮ এবং স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মামলা নং-৫০/২০২০ সংক্রান্ত তথ্য মনোনয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগকারীর মতে, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত পরিপত্র নং-০৭ এর ৩(খ) এবং পরিপত্র নং-০৬ এর প্যারা-২ অনুযায়ী সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের নিকট বকেয়া বিল সংক্রান্ত তথ্য হলফনামায় দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও প্রার্থী তা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজারে অবস্থিত মেসার্স মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে চার দফায় গ্যাস মিটার টেম্পারিংয়ের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। এসব অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গ্যাস আত্মসাৎ করা হয়, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে বিপুল অঙ্কের বকেয়া নির্ধারণ করা হয়। ২০০৮ সালের ১৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটিকে সিএনজি ও ক্যাপটিভ উভয় খাতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। সংযোগ পাওয়ার পর থেকেই চার দফায় মিটার টেম্পারিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ে। ২০০৯ সালের ১৫ জুন প্রথম দফায় সিএনজি ও ক্যাপটিভ উভয় মিটারে অবৈধ হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হলে ৯৫ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ টাকা বকেয়া নির্ধারণ করা হয়।
২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় সিএনজি মিটার নষ্ট অবস্থায় পাওয়া গেলে ৭৬ লাখ ৭১ হাজার ৭২৩ টাকা বকেয়া নির্ধারণ হয় যা পরিশোধ করা হয়। আবার ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট তৃতীয় দফায় মিটার পরিবর্তনের সময় পুনরায় টেম্পারিং ধরা পড়ে এবং এতে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৪২ হাজার ২১৯ টাকা বকেয়া নিরূপণ করা হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর চতুর্থ দফায় আবারও মিটার টেম্পারিংয়ের প্রমাণ পাওয়ায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং এ বাবদ ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫ টাকা বকেয়া নির্ধারণ করা হয়। ফলে তৃতীয় ও চতুর্থ দফা মিলিয়ে বকেয়া দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৭ লাখ ৯১ হাজার ২৬৪ টাকা এবং সব মিলিয়ে বর্তমানে পাওনা ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি।
বকেয়া পরিশোধ এড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক আইনি পদক্ষেপ নেয়। ২০১৬ সালে বিইআরসি-তে বিরোধ নিষ্পত্তি আবেদন নং-৪৪/২০১৬ দায়ের করা হলে ২০১৮ সালের ২৭ মে কমিশন মিটার টেম্পারিং প্রমাণিত উল্লেখ করে আবেদন খারিজ করে। পরে গ্রাহক হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১১১৫৮/২০১৮ দায়ের করলে ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর আংশিক বিল পরিশোধ সাপেক্ষে সংযোগ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে আপত্তি জানিয়ে বাখরাবাদ আপিল বিভাগে সিভিল আপিল নং-১১৪/২০২৩ দায়ের করে যা বর্তমানে বিচারাধীন। একই সঙ্গে গ্রাহক সংক্রান্ত পরিশোধিত অর্থ ফেরতের দাবিতে বিইআরসি-তে নতুন করে বিরোধ নিষ্পত্তি আবেদন নং–১১/২০২৪ দায়ের করেছে।
সূত্র মতে, ২০০৯ সালে প্রথম দফায় ৯৫ লাখ টাকা, ২০১০ সালে দ্বিতীয় দফায় ৭৬ লাখ টাকা (পরিশোধিত), ২০১৬ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে ৫ কোটি ৪০ লাখ এবং ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বকেয়া নির্ধারণ করা হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে সরকারি পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি। বকেয়া পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক আইনি কৌশল অবলম্বন করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মিটার টেম্পারিং প্রমাণিত উল্লেখ করে আবেদন খারিজ করলেও বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। মামলার সুযোগে এখনো স্থায়ীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট বকেয়া বিল ও চলমান মামলার তথ্য মনোনয়ন হলফনামায় উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হলেও বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদা তা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। শুধু মিয়া বাজার সিএনজি নয়, তার যৌথ মালিকানাধীন বাংলা গ্যাস, স্বজন সিএনজি, সাবুরিয়া সিএনজির বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রীয় গ্যাস আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশনের উচিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ ও তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যাতে অনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ না পায়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সরকারি হিসাব অনুযায়ী উক্ত অর্থ এখনো রাষ্ট্রের পাওনা হিসেবেই বহাল রয়েছে এবং একাধিক দফায় মিটার টেম্পারিংয়ের বিষয়টি নথিপত্রে প্রমাণিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘যিনি রাষ্ট্রীয় গ্যাসের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বকেয়া রেখে দেন এবং আদালতের আশ্রয় নিয়ে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় পাওনা ঝুলিয়ে রাখেন, তিনি কীভাবে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার নৈতিক অধিকার রাখেন-এ প্রশ্ন আজ জনমনে’। স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন রাষ্ট্রীয় গ্যাস আত্মসাৎ, মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপনের অভিযোগ নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে জরুরি তদন্তের দাবি রাখে। দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনী পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে মোঃ কামরুল হুদা বলেন, ‘বিষয়টি বিচারাধীন। আমার কাছে সরকার কোনো টাকা পাবে না’।
কুমিল্লা বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সেলস ডিপার্টমেন্টের ব্যবস্থাপক গোলাম মর্তুজা জানান, মেসার্স মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে মিটার টেম্পারিং ও বকেয়া বিল সংক্রান্ত মামলাটি এখনো বিচারাধীন। মামলা বিচারাধীন হওয়ায় কর্তৃপক্ষকে সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। তবে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই।