ঢাকা   মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
মুক্তির লড়াই

শান্তিগঞ্জ হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে চরম অব্যবস্থাপনা ও ধীরগতির



শান্তিগঞ্জ হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে চরম অব্যবস্থাপনা ও ধীরগতির

​সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে চরম অব্যবস্থাপনা ও ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক হলেও অনেক পিআইসিতে এখনো মাটির কাজই শুরু হয়নি। 

আবার কোথাও বরাদ্দের তুলনায় কাজের পরিধি বেশি হওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সদস্যরা। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হলে আগাম বন্যার কবলে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) উপজেলার খাই হাওর উপ-প্রকল্পের বিভিন্ন বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাজের গতিতে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। ২৬ নং উদ্বোধনী পিআইসি বাঁধের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে শ্রমিক ও জেসিবি মেশিন দিয়ে দ্রুত গতিতে মাটি ভরাটের কাজ চলছে।

​তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ২৭ নং পিআইসিতে। সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, বরাদ্দ অনুযায়ী ৮৯৫ মিটার বাঁধ মেরামতের কাজ করতে গিয়ে তারা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের দাবি, প্রাক্কলন (এস্টিমেট) অনুযায়ী যে পরিমাণ কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রাপ্ত বরাদ্দে সেই কাজ সম্পন্ন করা অসম্ভব। এতে করে কাজ মাঝপথে আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খাই হাওর উপ-প্রকল্পের ২৩ ও ৫৬ নং পিআইসির কাজে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাটির কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এসেও কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম পাহাড়ি ঢল একটি নিয়মিত দুর্যোগ। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ না হলে চৈত্র-বৈশাখ মাসে উজান থেকে আসা পানির চাপে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যেতে পারে। ২৩ ও ৫৬ নং পিআইসির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ না হওয়া মানে পুরো হাওরকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া।

এ বিষয়ে স্থানীয় পিআইসি সংশ্লিষ্টরা বরাদ্দের জটিলতার কথা বললেও, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তদারকি কমিটি নিয়মিত পরিদর্শন করলেও কেন কিছু পিআইসিতে কাজ শুরু হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা শান্তিগঞ্জ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (শাখা কর্মকর্তা) মনিরুজ্জামান বলেন "আমরা নিয়মিত প্রতিটি পিআইসি পরিদর্শন করছি। যেসব প্রকল্পে বরাদ্দের তুলনায় কাজের পরিধি বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো আমরা টেকনিক্যাল কমিটি দিয়ে পুনরায় যাচাই করে দেখছি। তবে ২৩ ও ৫৬ নং পিআইসির কাজ এখনো শুরু না হওয়াটা দুঃখজনক। আমরা তাদের চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না করলে নীতিমালা অনুযায়ী সেই পিআইসি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।"

​শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি মোঃ শাহজাহান বলেন,  ​"হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে কোনো ধরণের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। আমরা সবকটি পিআইসিকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছি। বরাদ্দের কোনো সমস্যা থাকলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য, কিন্তু তার অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। কৃষকের বোরো ফসল রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। যারা এখনো কাজ শুরু করেনি, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে।"


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষায় মোট ৬৭টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন করা হয়েছে। এর অধীনে প্রায় ৪৬.৭৫৫ কিলোমিটার বাঁধের ভাঙন রোধ ও সংস্কার কাজ করা হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সরকারিভাবে ১২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পার হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এখনো কার্যাদেশ (Work Order) না পৌঁছানোয় কাজ শুরু করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা।

​এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে ধীরগতিসম্পন্ন ও কাজ শুরু না হওয়া পিআইসিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত বাঁধের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় ফসলহানির দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬


শান্তিগঞ্জ হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে চরম অব্যবস্থাপনা ও ধীরগতির

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

​সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে চরম অব্যবস্থাপনা ও ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক হলেও অনেক পিআইসিতে এখনো মাটির কাজই শুরু হয়নি। 


আবার কোথাও বরাদ্দের তুলনায় কাজের পরিধি বেশি হওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সদস্যরা। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হলে আগাম বন্যার কবলে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।


মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) উপজেলার খাই হাওর উপ-প্রকল্পের বিভিন্ন বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাজের গতিতে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। ২৬ নং উদ্বোধনী পিআইসি বাঁধের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে শ্রমিক ও জেসিবি মেশিন দিয়ে দ্রুত গতিতে মাটি ভরাটের কাজ চলছে।


​তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ২৭ নং পিআইসিতে। সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, বরাদ্দ অনুযায়ী ৮৯৫ মিটার বাঁধ মেরামতের কাজ করতে গিয়ে তারা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের দাবি, প্রাক্কলন (এস্টিমেট) অনুযায়ী যে পরিমাণ কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রাপ্ত বরাদ্দে সেই কাজ সম্পন্ন করা অসম্ভব। এতে করে কাজ মাঝপথে আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।


সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খাই হাওর উপ-প্রকল্পের ২৩ ও ৫৬ নং পিআইসির কাজে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাটির কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এসেও কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ কৃষকরা।


স্থানীয় কৃষকরা জানান, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম পাহাড়ি ঢল একটি নিয়মিত দুর্যোগ। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ না হলে চৈত্র-বৈশাখ মাসে উজান থেকে আসা পানির চাপে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যেতে পারে। ২৩ ও ৫৬ নং পিআইসির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ না হওয়া মানে পুরো হাওরকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া।


এ বিষয়ে স্থানীয় পিআইসি সংশ্লিষ্টরা বরাদ্দের জটিলতার কথা বললেও, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তদারকি কমিটি নিয়মিত পরিদর্শন করলেও কেন কিছু পিআইসিতে কাজ শুরু হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


এই বিষয়ে জানতে চাইলে মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা শান্তিগঞ্জ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (শাখা কর্মকর্তা) মনিরুজ্জামান বলেন "আমরা নিয়মিত প্রতিটি পিআইসি পরিদর্শন করছি। যেসব প্রকল্পে বরাদ্দের তুলনায় কাজের পরিধি বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো আমরা টেকনিক্যাল কমিটি দিয়ে পুনরায় যাচাই করে দেখছি। তবে ২৩ ও ৫৬ নং পিআইসির কাজ এখনো শুরু না হওয়াটা দুঃখজনক। আমরা তাদের চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না করলে নীতিমালা অনুযায়ী সেই পিআইসি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।"


​শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি মোঃ শাহজাহান বলেন,  ​"হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে কোনো ধরণের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। আমরা সবকটি পিআইসিকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছি। বরাদ্দের কোনো সমস্যা থাকলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য, কিন্তু তার অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। কৃষকের বোরো ফসল রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। যারা এখনো কাজ শুরু করেনি, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে।"


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষায় মোট ৬৭টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন করা হয়েছে। এর অধীনে প্রায় ৪৬.৭৫৫ কিলোমিটার বাঁধের ভাঙন রোধ ও সংস্কার কাজ করা হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সরকারিভাবে ১২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পার হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এখনো কার্যাদেশ (Work Order) না পৌঁছানোয় কাজ শুরু করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা।


​এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে ধীরগতিসম্পন্ন ও কাজ শুরু না হওয়া পিআইসিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত বাঁধের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় ফসলহানির দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত