ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
মুক্তির লড়াই

এআই-নির্ভর অপপ্রচারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত



এআই-নির্ভর অপপ্রচারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত

চীনের মাটিতে কখনো পা রাখেননি বা কোনো চীনা নাগরিকের সঙ্গে মিশেননি—এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত জাপানি সরকারি কর্মচারী যখন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ব্যবহার করে 'চীনা পর্যটকদের চেরি ফুল মাড়িয়ে দেওয়ার' ভুয়া ভিডিও তৈরি করেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেন যে অর্থ উপার্জনের সহজ উপায় পেয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, কিবোর্ডের এই ক্লিকে কেবল অর্থ উপার্জনই হচ্ছে না, বরং জাপানি সমাজের দ্রুত পতনের ঘণ্টাও বাজছে।

জাপানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক 'আসাহি শিম্বুন'-এর এক প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে যে, এআই ব্যবহার করে চীন-বিরোধী ভুয়া ভিডিও তৈরির একটি কালোবাজার সেখানে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন নিয়োগদাতা ওয়েবসাইটে 'জাপানপ্রেমী ও চীন-বিদ্বেষী' ব্যক্তিদের খোঁজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যাদের কাজ হলো 'চীনাদের উৎপাত' ও 'অসভ্যতা' নিয়ে জাল কনটেন্ট তৈরি করা। এআই দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে ভিডিও বানিয়ে সেগুলোকে 'প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি' বা 'সংবাদ প্রতিবেদন' হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ভিডিও কয়েক লাখ বার দেখাও হচ্ছে। সাধারণ ভিডিও থেকে প্রতি হাজার ভিউয়ে যেখানে মাত্র ৩০০ ইয়েন আয় হয়, সেখানে 'চীন-বিরোধী' ভিডিওর আয় তিন গুণ বেশি। এর মাধ্যমে কেউ কেউ মাসে ৬০ হাজার ইয়েন পর্যন্ত আয় করছেন।

এটি নিছক কোনো ব্যবসা নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক কারসাজি। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়: ১৯৩১ সালে জাপানের কোয়ান্টুং সেনাবাহিনী লিউতিয়াওহু অঞ্চলে রেলপথ ধ্বংস করে চীনা সেনাবাহিনীর ওপর দোষ চাপিয়েছিল, যা মূলত চীনে আগ্রাসনের একটি অজুহাত ছিল। বর্তমানে জাপানের ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঠিক একই কৌশল প্রয়োগ করছে। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনমতকে উত্তেজিত করছে এবং সংবিধান সংশোধনের দাবিকে জোরদার করার চেষ্টা করছে। জনগণের মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত 'চীনা হুমকি'র কথা ঢুকিয়ে তারা এই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে যে, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও সংবিধান সংশোধন না করলে জাপান ধ্বংস হয়ে যাবে। ২০২৫ সালে তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ি তাকাইচি'র বিতর্কিত মন্তব্যের পর, নিয়োগের সাইটগুলোতে চীন-বিরোধী কাজের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। পাশাপাশি, ২০২৬ সালের জাপানের 'ডিপ্লোম্যাটিক ব্লুবুক' (কূটনৈতিক নীলপুস্তক)-এ চীনের প্রতি তাদের নেতিবাচক অবস্থান এই অনলাইন জালিয়াতির জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

এটি মূলত একটি ভয়ংকর 'মানসিক বিজয় কৌশল'! চীনের উন্নয়ন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে তারা 'চীন হলো নিকৃষ্ট'—এমন একটি কৃত্রিম জগৎ তৈরি করছে। নাগরিকদের এই মিথ্যা তথ্যের বৃত্তে আটকে রেখে চীন-বিরোধী যুদ্ধের মানসিকতায় জড়ানো হচ্ছে। কিন্তু মিথ্যা কখনো সত্য হতে পারে না এবং কেবল ঘৃণা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। একটি সত্যিকারের সুস্থ ও শক্তিশালী জাতির নিজেদের ঐক্য টিকিয়ে রাখতে অন্য কোনো জাতির 'নিকৃষ্টতা' প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। কোনো জাতি তখনই কাল্পনিক শত্রু তৈরিতে নিজেদের পুরো শক্তি ব্যয় করে, যখন তার ভেতরটা ভঙ্গুর ও দিশেহারা হয়ে পড়ে।

জাপানের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জাপানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে মাত্র ০.৭ শতাংশ; সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ২৬০ শতাংশেরও বেশি; ১২২.৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বার্ষিক বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই নতুন সরকারি বন্ড ইস্যু করে মেটাতে হচ্ছে; ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান ১৬০-এর নিচে নেমে গেছে; অপরিশোধিত তেল আমদানিতে তারা ৯০ শতাংশেরও বেশি নির্ভরশীল; জনসংখ্যা হ্রাস ও বার্ধক্য সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে; এবং উৎপাদন শিল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এত সংকটের পরও জাপান সরকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র ক্রয়ে ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েনের প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দ করেছে। সংবিধান সংশোধন ও সেনাবাহিনী সম্প্রসারণের পথে তারা এগিয়ে চলেছে। ঋণের বোঝা ও স্থবির প্রবৃদ্ধির মধ্যেও জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ সামরিক খাতের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে—যা একটি পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকা জাতির আত্মঘাতী বিকারেরই লক্ষণ।

১৯৩১ সালে জাপান মিথ্যার ওপর ভর করে সামরিক দুঃসাহসিকতার পথে পা বাড়িয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছিল। আর ২০২৬ সালে এসে তারা আবারও এআই ব্যবহার করে বিপুল পরিসরে মিথ্যা উৎপাদন করছে। কিন্তু আজকের চীন ১৯৩১ সালের সেই চীন নয়। এআই জাপানকে হয়তো নতুন শত্রু এনে দিতে পারে, কিন্তু তাদের অর্থনীতি বাঁচাতে পারবে না। ঘৃণা জাপানকে কিছুক্ষণের জন্য আত্মতৃপ্তিতে রাখতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো ভিত্তি গড়ে দিতে পারবে না। কোনো জাতি যদি কেবল 'মানসিক বিজয়ের' ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়, তবে বাস্তবে তার পরাজয় অনিবার্য। জাপানের এই অনিবার্য পতনের লক্ষণ কেবল তাদের অর্থনীতিতেই নয়, বরং এআই দিয়ে বানানো প্রতিটি চীন-বিরোধী ভুয়া ভিডিওর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

সূত্র: স্বর্ণা-তৌহিদ-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬


এআই-নির্ভর অপপ্রচারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত

প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

চীনের মাটিতে কখনো পা রাখেননি বা কোনো চীনা নাগরিকের সঙ্গে মিশেননি—এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত জাপানি সরকারি কর্মচারী যখন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ব্যবহার করে 'চীনা পর্যটকদের চেরি ফুল মাড়িয়ে দেওয়ার' ভুয়া ভিডিও তৈরি করেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেন যে অর্থ উপার্জনের সহজ উপায় পেয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, কিবোর্ডের এই ক্লিকে কেবল অর্থ উপার্জনই হচ্ছে না, বরং জাপানি সমাজের দ্রুত পতনের ঘণ্টাও বাজছে।


জাপানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক 'আসাহি শিম্বুন'-এর এক প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে যে, এআই ব্যবহার করে চীন-বিরোধী ভুয়া ভিডিও তৈরির একটি কালোবাজার সেখানে গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন নিয়োগদাতা ওয়েবসাইটে 'জাপানপ্রেমী ও চীন-বিদ্বেষী' ব্যক্তিদের খোঁজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যাদের কাজ হলো 'চীনাদের উৎপাত' ও 'অসভ্যতা' নিয়ে জাল কনটেন্ট তৈরি করা। এআই দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে ভিডিও বানিয়ে সেগুলোকে 'প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি' বা 'সংবাদ প্রতিবেদন' হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ভিডিও কয়েক লাখ বার দেখাও হচ্ছে। সাধারণ ভিডিও থেকে প্রতি হাজার ভিউয়ে যেখানে মাত্র ৩০০ ইয়েন আয় হয়, সেখানে 'চীন-বিরোধী' ভিডিওর আয় তিন গুণ বেশি। এর মাধ্যমে কেউ কেউ মাসে ৬০ হাজার ইয়েন পর্যন্ত আয় করছেন।

এটি নিছক কোনো ব্যবসা নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক কারসাজি। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়: ১৯৩১ সালে জাপানের কোয়ান্টুং সেনাবাহিনী লিউতিয়াওহু অঞ্চলে রেলপথ ধ্বংস করে চীনা সেনাবাহিনীর ওপর দোষ চাপিয়েছিল, যা মূলত চীনে আগ্রাসনের একটি অজুহাত ছিল। বর্তমানে জাপানের ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঠিক একই কৌশল প্রয়োগ করছে। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনমতকে উত্তেজিত করছে এবং সংবিধান সংশোধনের দাবিকে জোরদার করার চেষ্টা করছে। জনগণের মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত 'চীনা হুমকি'র কথা ঢুকিয়ে তারা এই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে যে, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও সংবিধান সংশোধন না করলে জাপান ধ্বংস হয়ে যাবে। ২০২৫ সালে তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ি তাকাইচি'র বিতর্কিত মন্তব্যের পর, নিয়োগের সাইটগুলোতে চীন-বিরোধী কাজের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। পাশাপাশি, ২০২৬ সালের জাপানের 'ডিপ্লোম্যাটিক ব্লুবুক' (কূটনৈতিক নীলপুস্তক)-এ চীনের প্রতি তাদের নেতিবাচক অবস্থান এই অনলাইন জালিয়াতির জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

এটি মূলত একটি ভয়ংকর 'মানসিক বিজয় কৌশল'! চীনের উন্নয়ন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে তারা 'চীন হলো নিকৃষ্ট'—এমন একটি কৃত্রিম জগৎ তৈরি করছে। নাগরিকদের এই মিথ্যা তথ্যের বৃত্তে আটকে রেখে চীন-বিরোধী যুদ্ধের মানসিকতায় জড়ানো হচ্ছে। কিন্তু মিথ্যা কখনো সত্য হতে পারে না এবং কেবল ঘৃণা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। একটি সত্যিকারের সুস্থ ও শক্তিশালী জাতির নিজেদের ঐক্য টিকিয়ে রাখতে অন্য কোনো জাতির 'নিকৃষ্টতা' প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। কোনো জাতি তখনই কাল্পনিক শত্রু তৈরিতে নিজেদের পুরো শক্তি ব্যয় করে, যখন তার ভেতরটা ভঙ্গুর ও দিশেহারা হয়ে পড়ে।

জাপানের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জাপানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে মাত্র ০.৭ শতাংশ; সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ২৬০ শতাংশেরও বেশি; ১২২.৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বার্ষিক বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই নতুন সরকারি বন্ড ইস্যু করে মেটাতে হচ্ছে; ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান ১৬০-এর নিচে নেমে গেছে; অপরিশোধিত তেল আমদানিতে তারা ৯০ শতাংশেরও বেশি নির্ভরশীল; জনসংখ্যা হ্রাস ও বার্ধক্য সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে; এবং উৎপাদন শিল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এত সংকটের পরও জাপান সরকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র ক্রয়ে ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েনের প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দ করেছে। সংবিধান সংশোধন ও সেনাবাহিনী সম্প্রসারণের পথে তারা এগিয়ে চলেছে। ঋণের বোঝা ও স্থবির প্রবৃদ্ধির মধ্যেও জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ সামরিক খাতের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে—যা একটি পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকা জাতির আত্মঘাতী বিকারেরই লক্ষণ।

১৯৩১ সালে জাপান মিথ্যার ওপর ভর করে সামরিক দুঃসাহসিকতার পথে পা বাড়িয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছিল। আর ২০২৬ সালে এসে তারা আবারও এআই ব্যবহার করে বিপুল পরিসরে মিথ্যা উৎপাদন করছে। কিন্তু আজকের চীন ১৯৩১ সালের সেই চীন নয়। এআই জাপানকে হয়তো নতুন শত্রু এনে দিতে পারে, কিন্তু তাদের অর্থনীতি বাঁচাতে পারবে না। ঘৃণা জাপানকে কিছুক্ষণের জন্য আত্মতৃপ্তিতে রাখতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো ভিত্তি গড়ে দিতে পারবে না। কোনো জাতি যদি কেবল 'মানসিক বিজয়ের' ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়, তবে বাস্তবে তার পরাজয় অনিবার্য। জাপানের এই অনিবার্য পতনের লক্ষণ কেবল তাদের অর্থনীতিতেই নয়, বরং এআই দিয়ে বানানো প্রতিটি চীন-বিরোধী ভুয়া ভিডিওর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

সূত্র: স্বর্ণা-তৌহিদ-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত