মুক্তির লড়াই

মতামত

তরুণ প্রজন্মের ধ্বংস ও সম্মিলিত প্রতিরোধের অপরিহার্য আহ্বান

মাদকের বিষবাষ্পে নিমজ্জিত জাতি

মাদকের বিষবাষ্পে নিমজ্জিত জাতি

বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ জাতীয় সংকটের সম্মুখীন, যেখানে মাদকের বিস্তার দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, পরিবারের বন্ধন ছিন্ন করছে, সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং জাতির সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবসম্পদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণা অনুসারে দেশে বর্তমানে প্রায় আটাত্তর লক্ষ থেকে তিরাশি লক্ষ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় চার দশমিক আট শতাংশের সমান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাঁজা সেবনকারী প্রায় একান্ন লক্ষ থেকে একাত্তর লক্ষের মতো, তারপর ইয়াবা বা মেথামফেটামিন প্রায় তেইশ লক্ষ, অ্যালকোহল বিশ লক্ষসহ কোডিনযুক্ত সিরাপ, ঘুমের ওষুধ, হেরোইন এবং অন্যান্য সিন্থেটিক মাদকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়, বরং জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক ভয়ংকর সূচক, যেখানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গ্রামের কিশোর, তরুণ-তরুণী এমনকি শিশুরাও এই বিষাক্ত জালে আটকে পড়ছে। ফলস্বরূপ মেধাশূন্যতা, অপরাধপ্রবণতা, পরিবার ভাঙন ও সামাজিক অস্থিরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছেন যে, গত সতেরোই ফেব্রুয়ারি থেকে একত্রিশে মে পর্যন্ত সারাদেশে ত্রিশ হাজার সাতশ চুয়াল্লিশটি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যাতে নয় হাজার দুইশ একান্নটি মামলা দায়ের করে নয় হাজার ছয়শ পঁচাশি জন মাদক চোরাকারবারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে, যার ভিত্তিতে দুই হাজার ছাব্বিশ-সাতাশ অর্থবছরের প্রথম ষাট দিনে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। সরকার জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, উপজেলা-জেলা ও মেট্রোপলিটন থানাভিত্তিক তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং গত এক মে থেকে দেশব্যাপী মাদক, অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধী গ্রেপ্তারে সুনির্দিষ্ট অভিযান চলছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ, জামিনে মুক্ত হয়ে ব্যবসায়ীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়া, সীমান্তপথে অবাধ চোরাচালান, অনলাইন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আড়ালে চালান পরিবহন, ভেজাল বিষাক্ত মাদকের কারণে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি এবং প্রকাশ্য বেচাকেনা দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত মাদকের বিস্তারকে অসহনীয় করে তুলেছে। টেকনাফ, উখিয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সীমান্ত এলাকায় মাদকের বড় বড় চালান আসছে, যেখানে অনেক ব্যবসায়ী রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের হাটবাজার পর্যন্ত ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, শিশুরা জুতার সলিউশন বা পলিথিনে মাদক নিয়ে নেশা করছে এবং মাদকাসক্তদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতি মেধাশূন্য হওয়ার চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫ অনুসারে, বিশ্বব্যাপী দুই হাজার তেইশ সালে তিনশ ষোলো মিলিয়ন মানুষ মাদক ব্যবহার করেছে, যা পনেরো থেকে চৌষট্টি বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ছয় শতাংশ এবং এই সংখ্যা দশ বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতা আরও ভয়াবহ, কারণ দেশটি গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল আসছে, অন্যদিকে ভারত থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগস ঢুকছে এবং আধুনিক কৌশলে নারী-শিশু, অ্যাম্বুল্যান্স, সবজির গাড়ি, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চালান পৌঁছাচ্ছে। দুই হাজার চব্বিশ-পঁচিশ সালে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

শুধু আইন প্রয়োগ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ ইউএনওডিসির মতে ধরা পড়া মাদক মাত্র দশ শতাংশ, বাকিটা অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সকল স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে সীমান্তে ড্রোন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিজিবি-পুলিশ-কাস্টমসের সমন্বয় জোরদার করতে হবে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ করে মিয়ানমার-ভারতের সাথে বৃদ্ধি করতে হবে, মাদক মামলায় জামিন কঠিন করা, দ্রুত বিচার, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চাকরি ও শিক্ষায় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা, সরকারি-বেসরকারি রিহ্যাব সেন্টার বৃদ্ধি করে মাদকাসক্তদের রোগী হিসেবে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। ইউএনওডিসি, ডব্লিউএইচও, ইউএনএইডসের সুপারিশ অনুসারে নিডল-সিরিঞ্জ প্রোগ্রাম, অপয়েড সাবস্টিটিউশন থেরাপি, এইচআইভি প্রতিরোধ ও কাউন্সেলিংসহ সমন্বিত প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে। বেসরকারি সংস্থা যেমন মানস তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা ও পুনর্বাসনে কাজ করছে, যা আরও সম্প্রসারিত করা দরকার।

পরিবারই প্রথম প্রতিরোধের ক্ষেত্র। সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হওয়া, চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধবের ওপর নজরদারি, খোলামেলা আলোচনা ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সেমিনার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করে যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম, পুরোহিত ও ধর্মীয় নেতারা জুমার খুতবা ও সভায় মাদকের কুফল নিয়ে আলোচনা করে সামাজিক বয়কটের পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্র ও নাটকের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ ঘটিয়ে মাদককে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। সীমান্ত এলাকায় বৈধ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মাদকের আকর্ষণ কমানো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দূর করে দুর্নীতিমুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলা এবং সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও জনতার সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

মাদক কেবল একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেয় না, বরং তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয় পুরো পরিবার, সমাজ ও জাতির সুন্দর ভবিষ্যৎ। বর্তমানে আমাদের তরুণ প্রজন্মের এক বড় অংশ এই বিষাক্ত নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজকাঠামোর ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে মাদকের নীল দংশন ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের টহলের অভাব, সামাজিক শাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং ভয়ের সংস্কৃতি মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তি বৃদ্ধি করছে। অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন ও কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ঘটছে, অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকাসক্তদের মৃত্যুর মূল কারণ বিষক্রিয়া, হার্ট, লিভার, কিডনির সমস্যা, এইচআইভি, হেপাটাইটিসের ঝুঁকি এবং মানসিক অবক্ষয়, যা জাতির কর্মক্ষম প্রজন্মকে ধ্বংস করছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক সংগঠন ও সমাজপতিদের সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। ইতি মধ্যে দেশের  বিভিন্ন জেলায় সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা কর্মশালা চলছে, যা আরও ব্যাপক করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রয়াসে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ইউএনওডিসির সুপারিশ অনুসারে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ জোরদার করতে হবে। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, নিজে মাদক থেকে দূরে থাকব, সমাজকেও এর বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করব, একটি মাদকমুক্ত সুস্থ শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তুলে স্বপ্নের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব। এই লড়াই আমাদের অস্তিত্বের লড়াই এবং জয় আমাদের হতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


মাদকের বিষবাষ্পে নিমজ্জিত জাতি

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ জাতীয় সংকটের সম্মুখীন, যেখানে মাদকের বিস্তার দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, পরিবারের বন্ধন ছিন্ন করছে, সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং জাতির সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবসম্পদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণা অনুসারে দেশে বর্তমানে প্রায় আটাত্তর লক্ষ থেকে তিরাশি লক্ষ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় চার দশমিক আট শতাংশের সমান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাঁজা সেবনকারী প্রায় একান্ন লক্ষ থেকে একাত্তর লক্ষের মতো, তারপর ইয়াবা বা মেথামফেটামিন প্রায় তেইশ লক্ষ, অ্যালকোহল বিশ লক্ষসহ কোডিনযুক্ত সিরাপ, ঘুমের ওষুধ, হেরোইন এবং অন্যান্য সিন্থেটিক মাদকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়, বরং জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক ভয়ংকর সূচক, যেখানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গ্রামের কিশোর, তরুণ-তরুণী এমনকি শিশুরাও এই বিষাক্ত জালে আটকে পড়ছে। ফলস্বরূপ মেধাশূন্যতা, অপরাধপ্রবণতা, পরিবার ভাঙন ও সামাজিক অস্থিরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছেন যে, গত সতেরোই ফেব্রুয়ারি থেকে একত্রিশে মে পর্যন্ত সারাদেশে ত্রিশ হাজার সাতশ চুয়াল্লিশটি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যাতে নয় হাজার দুইশ একান্নটি মামলা দায়ের করে নয় হাজার ছয়শ পঁচাশি জন মাদক চোরাকারবারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে, যার ভিত্তিতে দুই হাজার ছাব্বিশ-সাতাশ অর্থবছরের প্রথম ষাট দিনে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। সরকার জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, উপজেলা-জেলা ও মেট্রোপলিটন থানাভিত্তিক তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং গত এক মে থেকে দেশব্যাপী মাদক, অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধী গ্রেপ্তারে সুনির্দিষ্ট অভিযান চলছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ, জামিনে মুক্ত হয়ে ব্যবসায়ীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়া, সীমান্তপথে অবাধ চোরাচালান, অনলাইন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আড়ালে চালান পরিবহন, ভেজাল বিষাক্ত মাদকের কারণে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি এবং প্রকাশ্য বেচাকেনা দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত মাদকের বিস্তারকে অসহনীয় করে তুলেছে। টেকনাফ, উখিয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সীমান্ত এলাকায় মাদকের বড় বড় চালান আসছে, যেখানে অনেক ব্যবসায়ী রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের হাটবাজার পর্যন্ত ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, শিশুরা জুতার সলিউশন বা পলিথিনে মাদক নিয়ে নেশা করছে এবং মাদকাসক্তদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতি মেধাশূন্য হওয়ার চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫ অনুসারে, বিশ্বব্যাপী দুই হাজার তেইশ সালে তিনশ ষোলো মিলিয়ন মানুষ মাদক ব্যবহার করেছে, যা পনেরো থেকে চৌষট্টি বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ছয় শতাংশ এবং এই সংখ্যা দশ বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিশ্বব্যাপী প্রবণতা আরও ভয়াবহ, কারণ দেশটি গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল আসছে, অন্যদিকে ভারত থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগস ঢুকছে এবং আধুনিক কৌশলে নারী-শিশু, অ্যাম্বুল্যান্স, সবজির গাড়ি, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চালান পৌঁছাচ্ছে। দুই হাজার চব্বিশ-পঁচিশ সালে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

শুধু আইন প্রয়োগ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ ইউএনওডিসির মতে ধরা পড়া মাদক মাত্র দশ শতাংশ, বাকিটা অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সকল স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে সীমান্তে ড্রোন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিজিবি-পুলিশ-কাস্টমসের সমন্বয় জোরদার করতে হবে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ করে মিয়ানমার-ভারতের সাথে বৃদ্ধি করতে হবে, মাদক মামলায় জামিন কঠিন করা, দ্রুত বিচার, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চাকরি ও শিক্ষায় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা, সরকারি-বেসরকারি রিহ্যাব সেন্টার বৃদ্ধি করে মাদকাসক্তদের রোগী হিসেবে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। ইউএনওডিসি, ডব্লিউএইচও, ইউএনএইডসের সুপারিশ অনুসারে নিডল-সিরিঞ্জ প্রোগ্রাম, অপয়েড সাবস্টিটিউশন থেরাপি, এইচআইভি প্রতিরোধ ও কাউন্সেলিংসহ সমন্বিত প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে। বেসরকারি সংস্থা যেমন মানস তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা ও পুনর্বাসনে কাজ করছে, যা আরও সম্প্রসারিত করা দরকার।

পরিবারই প্রথম প্রতিরোধের ক্ষেত্র। সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হওয়া, চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধবের ওপর নজরদারি, খোলামেলা আলোচনা ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সেমিনার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করে যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম, পুরোহিত ও ধর্মীয় নেতারা জুমার খুতবা ও সভায় মাদকের কুফল নিয়ে আলোচনা করে সামাজিক বয়কটের পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্র ও নাটকের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ ঘটিয়ে মাদককে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। সীমান্ত এলাকায় বৈধ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মাদকের আকর্ষণ কমানো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দূর করে দুর্নীতিমুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলা এবং সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও জনতার সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

মাদক কেবল একজন ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেয় না, বরং তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয় পুরো পরিবার, সমাজ ও জাতির সুন্দর ভবিষ্যৎ। বর্তমানে আমাদের তরুণ প্রজন্মের এক বড় অংশ এই বিষাক্ত নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজকাঠামোর ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে মাদকের নীল দংশন ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের টহলের অভাব, সামাজিক শাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং ভয়ের সংস্কৃতি মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তি বৃদ্ধি করছে। অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন ও কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ঘটছে, অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকাসক্তদের মৃত্যুর মূল কারণ বিষক্রিয়া, হার্ট, লিভার, কিডনির সমস্যা, এইচআইভি, হেপাটাইটিসের ঝুঁকি এবং মানসিক অবক্ষয়, যা জাতির কর্মক্ষম প্রজন্মকে ধ্বংস করছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক সংগঠন ও সমাজপতিদের সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। ইতি মধ্যে দেশের  বিভিন্ন জেলায় সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা কর্মশালা চলছে, যা আরও ব্যাপক করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রয়াসে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ইউএনওডিসির সুপারিশ অনুসারে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ জোরদার করতে হবে। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, নিজে মাদক থেকে দূরে থাকব, সমাজকেও এর বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করব, একটি মাদকমুক্ত সুস্থ শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তুলে স্বপ্নের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব। এই লড়াই আমাদের অস্তিত্বের লড়াই এবং জয় আমাদের হতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই