মুক্তির লড়াই

সাহিত্য

মোর্শেদা চৌধুরী এ্যানি'র গুচ্ছ কবিতা 'পবিত্র আশুরা'

মোর্শেদা চৌধুরী এ্যানি'র গুচ্ছ কবিতা 'পবিত্র আশুরা'

​১. কারবালার ক্রন্দন


​ফোরাতের তীরে কাঁদে বালুচর,

রক্তে ভিজেছে আজ হোসেনের ঘর।

আকাশের বুকে যেন নেমেছে আঁধার,

ফেটে যায় বুক আজ শুনে মুসলিম সবার!

​ক্ষুধায় আর তৃষ্ণায় যেন কাতর শিশুরা,

শোকের সাগরে ভাসে আজ মদিনারা।

আলী আসগরের গলে তীরের আঘাত,

কেমনে সহিবে মাতা এমন বজ্রপাত?

​নেমে এলো নেমে এলো বিষাদের রাত,

ফোরাতের পানি হলো রক্তের পাত।

হোসেনের স্মরণে যে আঁখি জল ঝরে,

কারবালার স্মৃতি আজও কাঁদায় অন্তরে।

​২. ফোরাতের তৃষ্ণা

​বয়ে চলে ফোরাত নদী কলকল সুরে,

রাসূলের পরিবার তৃষ্ণাতে মরে।

এক ফোঁটা পানির তরে কাঁদে সোনামণি,

পাষাণের বুকে তবু জাগেনি ধবনি।

​এজিদের সেনা দল ঘিরে রাখে ঘাট,

মুমিনের বুকে যেন ভেঙে পড়ে খাট।

পানির বদলে তারা ছুড়ে মারে তীর,

রক্তে রাঙানো হলো ফোরাতের তীর।

​নবীজির প্রিয় নাতি তৃষ্ণার্ত বুকে,

বিদায় নিলেন এই ধরণীর সুখে।

নদী তুমি বয়ে যাও কলঙ্ক লয়ে,

বুকের এ হাহাকার কেমনে যাই সয়ে?

​৩. কচি প্রাণ আলী আসগর

​মায়ের কোলেতে কাঁদে তৃষ্ণার্ত ছাওয়াল,

কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে, ওগো মা দয়াল!

নবীজির বংশের সে যে ছোট ফুল,

পাষাণেরা ছিঁড়ে দিল তার সেই মূল।

​ফোরাতের তীরে এসে পিতা তার কয়,

এক ফোঁটা পানি দাও, শিশু শত্রু নয়!

পানির বদলে এলো হুরমুলার তীর,

রক্তে ভেসে গেল পিতার শরীর।

​নিথর শরীর লয়ে পিতা ফেরে ঘরে,

মায়ের বুক খালি হলো চিরতরে।

আলী আসগরের এই করুণ বিদায়,

জগতে এমন কষ্ট সহা নাহি যায়।

​৪. বীর কাসেমের মেহেদি

​বিয়ের মেহেদি রঙ শুকায়নি হাতে,

কাসেম চলিল আজ মরণের পথে।

বুক ভরা আশা ছিল, ছিল কত সুখ,

মুহূর্তে বিষাদে ছেয়ে গেল তার মুখ।

​মায়াবী তরুণ মুখ, শাহাদাত বরণ,

কারবালার ধূলি হলো শেষ শয্যা-করণ।

চাচা হোসেনের তরে দিল সে যে প্রাণ,

ইসলামের ইতিহাসে রেখে গেল মান।

​কনের নয়নে অশ্রু, বুকে হাহাকার,

ভেঙে গেল সব সুখ, আঁধার সংসার।

মেহেদির রঙ আজ রক্তের লাল,

কাঁদাবে এ স্মৃতি মোদের অনন্তকাল।

​৫. বিদায়বেলায় জয়নব

​ভাইয়ের গলাটি ধরে বোন জয়নব কাঁদে,

বিদায়ের সুর আজ কারবালা বাঁধে।

বলিছে জয়নব, "ভাই, যেও না সমরে,

কেমনে বাঁচিব আমি একা এই ঘরে?"

​হোসেন বলিছে, "বোন, ধৈর্য ধরো বুকে,

ইসলামের তরে আজ বিদায় নাও সুখে।

নবীজির দ্বীন যেন বেঁচে থাকে আর,

সহিতে হইবে এই দুঃখের পাহাড়।"

​ভাইয়ের বিদায় দেখে ফেটে যায় বুক,

ধূলিতে লুটাবে আজ ভাইয়ার সেই মুখ।

জয়নবের কান্না আজও বাতাসেতে ভাসে,

আশুরার দিন এলেই মন কেঁদে আসে।

​৬. ধুলোয় লুটিয়া তলোয়ার

​তলোয়ার হাতে বীর হোসেন যখন,

শত্রুর মাঝে যেন সিংহের মতন।

তবুও অধর্মের দল ঘিরে ধরে তায়,

শত শত তীরের আঘাত বুকে লেগে যায়।

​সিজদায় মাথা রেখে প্রভু জিকিরে,

পবিত্র রক্ত ঝরে কারবালার তীরে।

শিমারের খঞ্জর চলিল গলায়,

কেঁদে ওঠে আসমান এমন বেলায়।

​ধুলোয় লুটিয়া রয় বীরের তলোয়ার,

ইসলামের আকাশে এ কি অন্ধকার!

নাতির মস্তক কাটে পাপিষ্ঠের দল,

মুমিনের চোখে নামে বরষার জল।

​৭. যুলজানাহর শূন্য পিঠ

​হোসেনের প্রিয় ঘোড়া 'যুলজানাহ' নাম,

রণক্ষেত্রে কেটে গেল কত যে ঘাম।

প্রভুর শরীর লয়ে লড়িল সে বীর,

অবশেষে ফিরে এলো একা নদী তীর।

​শূন্য পিঠ লয়ে যখন তাবু পানে ধায়,

মহিলারা কেঁদে ওঠে মহা বেদনায়।

পিঠে নাই প্রিয় প্রভু, রক্তে ভেজা জিন,

মুহূর্তে শেষ হলো আশুরার দিন।

​ঘোড়াটি কাঁদিল মাথা ঝুঁকিয়ে ধুলোয়,

হোসেনের স্মৃতি যেন বাতাসে দোলায়।

শূন্য পিঠ দেখে আজ কাঁদে সব প্রাণ,

কারবালা নিল কেড়ে হোসেনের জান।

​৮. তাবু পোড়ার আগুন

​হোসেনের শাহাদাতে কাঁপিল আকাশ,

তাবুতে ছড়াল ওরে কান্নার বাতাস।

কুফাবাসী পাপিষ্ঠেরা দয়া নাহি করে,

আগুন জ্বলালো এসে জয়নবের ঘরে।

​অসহায় নারী আর শিশুদের দল,

ভয়ে কাঁদে, চোখে শুধু ফোরাতের জল।

ছিনিয়ে নিল তারা পরনের বাস,

চারিদিকে শুধু আজ কান্নার চাষ।

​জ্বলন্ত তাবুর মাঝে জয়নুল আবেদীন,

অসুস্থ শরীরে কাঁদে, দিন আজ ক্ষণহীন।

কারবালার শেষ দৃশ্য আগুনের শিখা,

বেদনার ইতিহাসে রক্তে তা লেখা।

​৯. জয়নুল আবেদীনের চোখের জল

​কারবালার একমাত্র বেঁচে থাকা বীর,

অসুস্থ জয়নুল, চোখে অশ্রুর নীর।

পিতার মস্তক আর ভাইদের লাশ,

চোখের সামনে দেখে ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস।

​বেঁধে নিয়ে যায় তারে শিকল পরায়ে,

অত্যাচারী কুফাবাসী চলে যে তাড়ায়ে।

পিতার রক্ত মাখা ধুলো পড়ে রয়,

জয়নুলের বুকে শুধু মহাকষ্ট হয়।

​সারাটি জীবন ধরে কেঁদেছেন তিনি,

ভোলেননি কারবালার সেই দিনক্ষণি।

এক ফোঁটা জল দেখলে মনে পড়ে তাঁর,

পিতার তৃষ্ণার্ত বুক, ফোরাতের ধার।

​১০. মহরমের শিক্ষা ও ত্যাগ

​মহরম ফিরে আসে প্রতি বছর ঘুরে,

বেদনার সুর বাজে মুমিনের সুরে।

১০ই আশুরার এই ত্যাগের কাহিনী,

যুগে যুগে দেয় শুধু ন্যায়ের ইমানি।

​হোসেন দিয়েছেন প্রাণ, দেননি তো মাথা,

অধর্মের কাছে তিনি হননি তো নোয়াতা।

রক্তের বিনিময়ে ইসলাম বাঁচে,

মুমিনের মন আজও এই শিক্ষা যাচে।

​আশুরার দিন শুধু কান্নার নয়,

অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগবার সময়।

হোসেনের কোরবানি স্মরি অশ্রু ঝরে,

ধন্য সে ত্যাগী প্রাণ প্রতি অন্তরে।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬


মোর্শেদা চৌধুরী এ্যানি'র গুচ্ছ কবিতা 'পবিত্র আশুরা'

প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬

featured Image

​১. কারবালার ক্রন্দন


​ফোরাতের তীরে কাঁদে বালুচর,

রক্তে ভিজেছে আজ হোসেনের ঘর।

আকাশের বুকে যেন নেমেছে আঁধার,

ফেটে যায় বুক আজ শুনে মুসলিম সবার!

​ক্ষুধায় আর তৃষ্ণায় যেন কাতর শিশুরা,

শোকের সাগরে ভাসে আজ মদিনারা।

আলী আসগরের গলে তীরের আঘাত,

কেমনে সহিবে মাতা এমন বজ্রপাত?

​নেমে এলো নেমে এলো বিষাদের রাত,

ফোরাতের পানি হলো রক্তের পাত।

হোসেনের স্মরণে যে আঁখি জল ঝরে,

কারবালার স্মৃতি আজও কাঁদায় অন্তরে।

​২. ফোরাতের তৃষ্ণা

​বয়ে চলে ফোরাত নদী কলকল সুরে,

রাসূলের পরিবার তৃষ্ণাতে মরে।

এক ফোঁটা পানির তরে কাঁদে সোনামণি,

পাষাণের বুকে তবু জাগেনি ধবনি।

​এজিদের সেনা দল ঘিরে রাখে ঘাট,

মুমিনের বুকে যেন ভেঙে পড়ে খাট।

পানির বদলে তারা ছুড়ে মারে তীর,

রক্তে রাঙানো হলো ফোরাতের তীর।

​নবীজির প্রিয় নাতি তৃষ্ণার্ত বুকে,

বিদায় নিলেন এই ধরণীর সুখে।

নদী তুমি বয়ে যাও কলঙ্ক লয়ে,

বুকের এ হাহাকার কেমনে যাই সয়ে?

​৩. কচি প্রাণ আলী আসগর

​মায়ের কোলেতে কাঁদে তৃষ্ণার্ত ছাওয়াল,

কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে, ওগো মা দয়াল!

নবীজির বংশের সে যে ছোট ফুল,

পাষাণেরা ছিঁড়ে দিল তার সেই মূল।

​ফোরাতের তীরে এসে পিতা তার কয়,

এক ফোঁটা পানি দাও, শিশু শত্রু নয়!

পানির বদলে এলো হুরমুলার তীর,

রক্তে ভেসে গেল পিতার শরীর।

​নিথর শরীর লয়ে পিতা ফেরে ঘরে,

মায়ের বুক খালি হলো চিরতরে।

আলী আসগরের এই করুণ বিদায়,

জগতে এমন কষ্ট সহা নাহি যায়।

​৪. বীর কাসেমের মেহেদি

​বিয়ের মেহেদি রঙ শুকায়নি হাতে,

কাসেম চলিল আজ মরণের পথে।

বুক ভরা আশা ছিল, ছিল কত সুখ,

মুহূর্তে বিষাদে ছেয়ে গেল তার মুখ।

​মায়াবী তরুণ মুখ, শাহাদাত বরণ,

কারবালার ধূলি হলো শেষ শয্যা-করণ।

চাচা হোসেনের তরে দিল সে যে প্রাণ,

ইসলামের ইতিহাসে রেখে গেল মান।

​কনের নয়নে অশ্রু, বুকে হাহাকার,

ভেঙে গেল সব সুখ, আঁধার সংসার।

মেহেদির রঙ আজ রক্তের লাল,

কাঁদাবে এ স্মৃতি মোদের অনন্তকাল।

​৫. বিদায়বেলায় জয়নব

​ভাইয়ের গলাটি ধরে বোন জয়নব কাঁদে,

বিদায়ের সুর আজ কারবালা বাঁধে।

বলিছে জয়নব, "ভাই, যেও না সমরে,

কেমনে বাঁচিব আমি একা এই ঘরে?"

​হোসেন বলিছে, "বোন, ধৈর্য ধরো বুকে,

ইসলামের তরে আজ বিদায় নাও সুখে।

নবীজির দ্বীন যেন বেঁচে থাকে আর,

সহিতে হইবে এই দুঃখের পাহাড়।"

​ভাইয়ের বিদায় দেখে ফেটে যায় বুক,

ধূলিতে লুটাবে আজ ভাইয়ার সেই মুখ।

জয়নবের কান্না আজও বাতাসেতে ভাসে,

আশুরার দিন এলেই মন কেঁদে আসে।

​৬. ধুলোয় লুটিয়া তলোয়ার

​তলোয়ার হাতে বীর হোসেন যখন,

শত্রুর মাঝে যেন সিংহের মতন।

তবুও অধর্মের দল ঘিরে ধরে তায়,

শত শত তীরের আঘাত বুকে লেগে যায়।

​সিজদায় মাথা রেখে প্রভু জিকিরে,

পবিত্র রক্ত ঝরে কারবালার তীরে।

শিমারের খঞ্জর চলিল গলায়,

কেঁদে ওঠে আসমান এমন বেলায়।

​ধুলোয় লুটিয়া রয় বীরের তলোয়ার,

ইসলামের আকাশে এ কি অন্ধকার!

নাতির মস্তক কাটে পাপিষ্ঠের দল,

মুমিনের চোখে নামে বরষার জল।

​৭. যুলজানাহর শূন্য পিঠ

​হোসেনের প্রিয় ঘোড়া 'যুলজানাহ' নাম,

রণক্ষেত্রে কেটে গেল কত যে ঘাম।

প্রভুর শরীর লয়ে লড়িল সে বীর,

অবশেষে ফিরে এলো একা নদী তীর।

​শূন্য পিঠ লয়ে যখন তাবু পানে ধায়,

মহিলারা কেঁদে ওঠে মহা বেদনায়।

পিঠে নাই প্রিয় প্রভু, রক্তে ভেজা জিন,

মুহূর্তে শেষ হলো আশুরার দিন।

​ঘোড়াটি কাঁদিল মাথা ঝুঁকিয়ে ধুলোয়,

হোসেনের স্মৃতি যেন বাতাসে দোলায়।

শূন্য পিঠ দেখে আজ কাঁদে সব প্রাণ,

কারবালা নিল কেড়ে হোসেনের জান।

​৮. তাবু পোড়ার আগুন

​হোসেনের শাহাদাতে কাঁপিল আকাশ,

তাবুতে ছড়াল ওরে কান্নার বাতাস।

কুফাবাসী পাপিষ্ঠেরা দয়া নাহি করে,

আগুন জ্বলালো এসে জয়নবের ঘরে।

​অসহায় নারী আর শিশুদের দল,

ভয়ে কাঁদে, চোখে শুধু ফোরাতের জল।

ছিনিয়ে নিল তারা পরনের বাস,

চারিদিকে শুধু আজ কান্নার চাষ।

​জ্বলন্ত তাবুর মাঝে জয়নুল আবেদীন,

অসুস্থ শরীরে কাঁদে, দিন আজ ক্ষণহীন।

কারবালার শেষ দৃশ্য আগুনের শিখা,

বেদনার ইতিহাসে রক্তে তা লেখা।

​৯. জয়নুল আবেদীনের চোখের জল

​কারবালার একমাত্র বেঁচে থাকা বীর,

অসুস্থ জয়নুল, চোখে অশ্রুর নীর।

পিতার মস্তক আর ভাইদের লাশ,

চোখের সামনে দেখে ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস।

​বেঁধে নিয়ে যায় তারে শিকল পরায়ে,

অত্যাচারী কুফাবাসী চলে যে তাড়ায়ে।

পিতার রক্ত মাখা ধুলো পড়ে রয়,

জয়নুলের বুকে শুধু মহাকষ্ট হয়।

​সারাটি জীবন ধরে কেঁদেছেন তিনি,

ভোলেননি কারবালার সেই দিনক্ষণি।

এক ফোঁটা জল দেখলে মনে পড়ে তাঁর,

পিতার তৃষ্ণার্ত বুক, ফোরাতের ধার।

​১০. মহরমের শিক্ষা ও ত্যাগ

​মহরম ফিরে আসে প্রতি বছর ঘুরে,

বেদনার সুর বাজে মুমিনের সুরে।

১০ই আশুরার এই ত্যাগের কাহিনী,

যুগে যুগে দেয় শুধু ন্যায়ের ইমানি।

​হোসেন দিয়েছেন প্রাণ, দেননি তো মাথা,

অধর্মের কাছে তিনি হননি তো নোয়াতা।

রক্তের বিনিময়ে ইসলাম বাঁচে,

মুমিনের মন আজও এই শিক্ষা যাচে।

​আশুরার দিন শুধু কান্নার নয়,

অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগবার সময়।

হোসেনের কোরবানি স্মরি অশ্রু ঝরে,

ধন্য সে ত্যাগী প্রাণ প্রতি অন্তরে।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই