একটি রাষ্ট্র কতটা দেউলিয়া ও পঙ্গু, তা পরিমাপ করা যায় সেই রাষ্ট্রের নাগরিকের প্লেটে থাকা খাবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার দেখে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে একশ্রেণির অমানুষ অবলীলায় শিশুর দুধ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রধান খাদ্যশস্যে মিশিয়ে দিচ্ছে ধীরগতির বিষাক্ত কেমিক্যাল, টেক্সটাইল রং ও নিষিদ্ধ প্রিজারভেটিভ। এটি কোনো সাধারণ 'ভেজাল' বা বাণিজ্যিক অপরাধ নয়; এটি কোটি মানুষের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক 'নীরব গণহত্যা'।
প্রায়শই দেখা যায়, বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা ভ্রাম্যমাণ আদালত কোটি টাকার বিষাক্ত খাদ্যের কারখানা সিলগালা করছে। কিন্তু অপরাধের এই হিমশৈলের চূড়া কাটার পর সাজা হচ্ছে চরম প্রহসনমূলক—সামান্য কিছু অর্থদণ্ড বা কয়েক মাসের কারাদণ্ড! এই মেরুদণ্ডহীন ও লঘু দণ্ডের কারণে পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদার ও অসাধু নরপিশাচরা জামিনে বা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে দ্বিগুণ হিংস্রতায় আবারও এই মরণব্যাধির ব্যবসা শুরু করছে। আইন যেখানে অপরাধ দমনের হাতিয়ার হওয়ার কথা, সেখানে এই শিথিল আইন যেন অপরাধীদের জন্য আরও বড় অপরাধ করার রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স হয়ে দাঁড়িয়েছে!
এই লাইসেন্সধারী নীরব ঘাতকদের শিকড় উপড়ে ফেলতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের আইনি কাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় আমূল, আপসহীন ও আগ্রাসী পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। নিম্নোক্ত কঠোর ও নির্মম পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য:
১. জামিন অযোগ্য ধারা ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল
খাদ্যে ভেজাল এবং বিশেষ করে শিশুখাদ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিষপ্রয়োগের মতো পৈশাচিক অপরাধকে 'সম্পূর্ণ অজামিনযোগ্য' (Non-bailable) ঘোষণা করতে হবে। এই ধরনের খুনিদের বিচার সাধারণ আদালতের দীর্ঘসূত্রতার আমলাতান্ত্রিক ফাঁদে ফেলে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা চলবে না। 'বিশেষ ট্রাইব্যুনাল' গঠন করে সংক্ষিপ্ততম সময়ে এদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে হবে।
২. সর্বোচ্চ শাস্তির দৃষ্টান্তমূলক ও অবিলম্ব প্রয়োগ
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজালের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও তা কাগজে-কলমেই মরে আছে, বাস্তবে এর প্রয়োগ শূন্যের কোঠায়। শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে বিষ মেশানোর অপরাধকে 'গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ' নয়, বরং সরাসরি 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ ও মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
৩. মূল হোতাদের সমূলে বিনাশ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ
কারখানার চুনোপুঁটি বা দিনমজুর শ্রমিকদের ধরে নামমাত্র জরিমানা বা লোকদেখানো সাজা দিয়ে এই মরণ-সিন্ডিকেট ভাঙা অসম্ভব। পর্দার আড়ালে থেকে যারা এই কোটি কোটি টাকার বিষ-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে, নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে সেই মূল হোতা, অর্থদাতা ও তাদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে হবে। এদের কেবল জেলেই নয়, এদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করে যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
৪. ৩৬৫ দিনের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আধুনিক ল্যাব
বিশেষ কোনো দিবস বা লোকদেখানো মৌসুমী অভিযান চালিয়ে এই অদৃশ্য মাফিয়া চক্রকে দমন করা যাবে না। বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টাই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবের সহায়তায় কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যেন বিষ বাজারে আসার আগেই তা ধ্বংস করা যায়।
খাদ্যের নিরাপত্তা কোনো করুণা বা বিলাসী দাবি নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার এবং রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষার মৌলিক অধিকার।
আজ যদি আমরা এই লোভী, পিশাচ ও অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি দেওয়াল তুলে না দাঁড়াই, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিণত হবে এক পঙ্গু, বিকলাঙ্গ ও অসুস্থ লাশের দেশে। এই মুনাফালোভী ঘাতকদের জন্য কোনো অনুকম্পা, কোনো ছাড় বা কোনো মানবাধিকার থাকতে পারে না। শিশুখাদ্যসহ সব ধরনের খাদ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে আইন সংশোধন করে কঠোর, জামিন অযোগ্য এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দ্রুততম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হোক।

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
একটি রাষ্ট্র কতটা দেউলিয়া ও পঙ্গু, তা পরিমাপ করা যায় সেই রাষ্ট্রের নাগরিকের প্লেটে থাকা খাবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার দেখে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে একশ্রেণির অমানুষ অবলীলায় শিশুর দুধ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রধান খাদ্যশস্যে মিশিয়ে দিচ্ছে ধীরগতির বিষাক্ত কেমিক্যাল, টেক্সটাইল রং ও নিষিদ্ধ প্রিজারভেটিভ। এটি কোনো সাধারণ 'ভেজাল' বা বাণিজ্যিক অপরাধ নয়; এটি কোটি মানুষের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক 'নীরব গণহত্যা'।
প্রায়শই দেখা যায়, বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা ভ্রাম্যমাণ আদালত কোটি টাকার বিষাক্ত খাদ্যের কারখানা সিলগালা করছে। কিন্তু অপরাধের এই হিমশৈলের চূড়া কাটার পর সাজা হচ্ছে চরম প্রহসনমূলক—সামান্য কিছু অর্থদণ্ড বা কয়েক মাসের কারাদণ্ড! এই মেরুদণ্ডহীন ও লঘু দণ্ডের কারণে পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদার ও অসাধু নরপিশাচরা জামিনে বা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে দ্বিগুণ হিংস্রতায় আবারও এই মরণব্যাধির ব্যবসা শুরু করছে। আইন যেখানে অপরাধ দমনের হাতিয়ার হওয়ার কথা, সেখানে এই শিথিল আইন যেন অপরাধীদের জন্য আরও বড় অপরাধ করার রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স হয়ে দাঁড়িয়েছে!
এই লাইসেন্সধারী নীরব ঘাতকদের শিকড় উপড়ে ফেলতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের আইনি কাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় আমূল, আপসহীন ও আগ্রাসী পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। নিম্নোক্ত কঠোর ও নির্মম পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য:
১. জামিন অযোগ্য ধারা ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল
খাদ্যে ভেজাল এবং বিশেষ করে শিশুখাদ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিষপ্রয়োগের মতো পৈশাচিক অপরাধকে 'সম্পূর্ণ অজামিনযোগ্য' (Non-bailable) ঘোষণা করতে হবে। এই ধরনের খুনিদের বিচার সাধারণ আদালতের দীর্ঘসূত্রতার আমলাতান্ত্রিক ফাঁদে ফেলে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা চলবে না। 'বিশেষ ট্রাইব্যুনাল' গঠন করে সংক্ষিপ্ততম সময়ে এদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে হবে।
২. সর্বোচ্চ শাস্তির দৃষ্টান্তমূলক ও অবিলম্ব প্রয়োগ
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজালের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও তা কাগজে-কলমেই মরে আছে, বাস্তবে এর প্রয়োগ শূন্যের কোঠায়। শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে বিষ মেশানোর অপরাধকে 'গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ' নয়, বরং সরাসরি 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ ও মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
৩. মূল হোতাদের সমূলে বিনাশ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ
কারখানার চুনোপুঁটি বা দিনমজুর শ্রমিকদের ধরে নামমাত্র জরিমানা বা লোকদেখানো সাজা দিয়ে এই মরণ-সিন্ডিকেট ভাঙা অসম্ভব। পর্দার আড়ালে থেকে যারা এই কোটি কোটি টাকার বিষ-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে, নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে সেই মূল হোতা, অর্থদাতা ও তাদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে হবে। এদের কেবল জেলেই নয়, এদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করে যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
৪. ৩৬৫ দিনের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আধুনিক ল্যাব
বিশেষ কোনো দিবস বা লোকদেখানো মৌসুমী অভিযান চালিয়ে এই অদৃশ্য মাফিয়া চক্রকে দমন করা যাবে না। বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টাই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবের সহায়তায় কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যেন বিষ বাজারে আসার আগেই তা ধ্বংস করা যায়।
খাদ্যের নিরাপত্তা কোনো করুণা বা বিলাসী দাবি নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার এবং রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষার মৌলিক অধিকার।
আজ যদি আমরা এই লোভী, পিশাচ ও অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি দেওয়াল তুলে না দাঁড়াই, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিণত হবে এক পঙ্গু, বিকলাঙ্গ ও অসুস্থ লাশের দেশে। এই মুনাফালোভী ঘাতকদের জন্য কোনো অনুকম্পা, কোনো ছাড় বা কোনো মানবাধিকার থাকতে পারে না। শিশুখাদ্যসহ সব ধরনের খাদ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে আইন সংশোধন করে কঠোর, জামিন অযোগ্য এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দ্রুততম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হোক।

আপনার মতামত লিখুন