মুক্তির লড়াই

মতামত

শিক্ষার আলো বনাম ডিজিটাল অন্ধকার: এহসানুল হক মিলনের সংস্কারের পথে ট্রলের বিষাক্ত ছায়া

শিক্ষার আলো বনাম ডিজিটাল অন্ধকার: এহসানুল হক মিলনের সংস্কারের পথে ট্রলের বিষাক্ত ছায়া

সম্প্রতি কয়কমাস আগে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন, “এই তোমরা কেমন আছ? ঠিকমতো পড়াশোনা কর তো? পড়তে হবে, নকল আর হবে না।” এই সরল, স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল আহ্বানকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র ট্রল, মিম ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড়। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষ এই বক্তব্যকে বিকৃত করে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত করেছেন। এই ঘটনা শুধু একজন মন্ত্রীর সম্মানহানি নয়, বরং আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির অপব্যবহারের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। 

ট্রলিংয়ের ইতিহাস ইন্টারনেটের প্রথম দিনগুলোতে ফিরে যায়। তখন ফোরাম ও চ্যাটরুমে কিছু ব্যবহারকারী ইচ্ছাকৃত উসকানিমূলক মন্তব্য করে প্রতিক্রিয়া আদায় করতেন। কলিন্স ডিকশনারি অনুসারে, অনলাইনে অহেতুক, বিরক্তিকর ও বিষয়বহির্ভূত কথা বলে পাঠককে উসকে দেওয়াই ট্রলিং। সময়ের সঙ্গে এটি মিম কালচারে রূপ নিয়েছে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ও টিকটকের অ্যালগরিদম দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী বিতর্কিত কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়। হিব্রু ইউনিভার্সিটির গবেষক লিমর শিফম্যানের মতে, মিম হলো এমন ডিজিটাল উপাদান যা মানুষ অনুকরণ করে, ছড়ায় এবং নতুন রূপ দেয়। রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে ‘মিম’ ধারণাটি প্রবর্তন করেন-যা অনুকরণযোগ্য আইডিয়া বা আচরণ হিসেবে ভাইরাল হয়। 

কিন্তু ট্রলের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো আরও গভীর। ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ার গবেষক এভিটা মার্চের ‘লস অ্যান্ড দ্য ডার্ক টেট্রাড’ গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রলারদের মধ্যে স্যাডিজমের প্রবণতা প্রবল-অন্যকে মানসিক আঘাত দিয়ে তারা আনন্দ পান। অনলাইনের নিরাপদ দূরত্ব পরিচয় গোপন করে সীমা লঙ্ঘনকে সহজ করে দেয়। তবে ট্রল সবসময় নেতিবাচক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক সমালোচনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে-রাস্তার খারাপ অবস্থা বা যানজট নিয়ে মিম ভাইরাল হয়ে কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ে। কিন্তু যখন তা ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা ঘৃণায় পরিণত হয়, তখন তা সাইবার বুলিংয়ের রূপ নেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক।

বর্তমান ক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ট্রলিংয়ের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। “এই তোমরা কেমন আছো, পড়তে হবে, নকল আর চলবে না, তোমরা বড় হয়ে কার রাজনীতি করবা জাইমা রহমানের”-এমন বিকৃত সংস্করণ ছড়িয়ে শিক্ষার্থীরা শুধু একজন জনপ্রতিনিধিকে নয়, গুরুজন ও শিক্ষক  সমাজের প্রতি সম্মানকেও ক্ষুন্ন করছে। এটি অন্ধ অনুকরণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। সম্মানহানি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাইবার বুলিং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে-যুক্তরাজ্যের ম্যালিসিয়াস কমিউনিকেশনস অ্যাক্ট, সিঙ্গাপুরের প্রটেকশন ফ্রম হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্ট, আয়ারল্যান্ডের হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্ট ইত্যাদি। বাংলাদেশেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে, যদিও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। তিনি ২০০১-২০০৬ সালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নকলবিরোধী অভিযানে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছিলেন। পরীক্ষা কেন্দ্রে নকলমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা তাঁর সেই সময়ের অন্যতম মাইলফলক। বর্তমান দায়িত্বে এসেও তিনি একই দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানে নকল ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠান প্রধানকেই দায় নিতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনের আওতায় আনা হবে বলে ঘোষণা করেছেন। প্রশ্নফাঁস রোধে একক প্রশ্নপত্র, ইন-হাউজ কোচিং নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষকদের অযাচিত মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। 

তাঁর যুগান্তকারী উদ্যোগগুলো আরও ব্যাপক। ২০২৭ সাল থেকে জানুয়ারিতে এসএসসি এবং জুলাইয়ের মধ্যে এইচএসসি ফল প্রকাশের পরিকল্পনা, সেশনজট নিরসন এবং শিক্ষার্থীদের সময়ের অপচয় রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৮ সাল থেকে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন। প্রাথমিক থেকেই মিড-ডে মিল, ইউনিফর্ম, খেলাধুলাভিত্তিক আনন্দময় শিক্ষা চালু, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষার জোরদার, কোচিং নির্ভরতা কমানো এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বুয়েট, বুটেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআই ল্যাব, গবেষণা বৃদ্ধি, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং দেশীয় প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশ-শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে রাজনীতি করতে হবে, যাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন ব্যাহত না হয়। 

এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেবে। টেক্সটাইল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী মিলনের অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি এসব সংস্কারকে বাস্তবায়নযোগ্য করে তুলেছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ইতিবাচক পদক্ষেপের পরিবর্তে ট্রলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। পারিবারিক শিক্ষা, গুরুজনদের প্রতি সম্মান এবং দায়িত্ববোধের অভাব এখানে স্পষ্ট। হংকং ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, মিম শিক্ষার্থীদের চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যখন তা ঘৃণা ও অপমানের হাতিয়ার হয়, তখন তা বিপরীত ফল দেয়। সেলিব্রিটি ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা বেশি ট্রলের শিকার হন কারণ ট্রলাররা প্রতিক্রিয়া ও মনোযোগ চায়। নার্সিসিজম ও রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশনও এর পেছনে কাজ করে।

আমাদের সময় এসেছে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার, পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ট্রল যদি সৃজনশীল সমালোচনায় পরিণত হয়, তাহলে ভালো। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।

ড. এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে শিক্ষা খাতের এই রূপান্তর যুগান্তকারী। নকলমুক্ত, কোচিংমুক্ত, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তাঁর দৃঢ় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা উচিত। সমাজকে এই ইতিবাচক যাত্রায় সহযোগিতা করতে হবে, ট্রল করে বাধা সৃষ্টি নয়। ডিজিটাল যুগে এক ক্লিকে বিনোদন তৈরি হয়, আঘাতও তৈরি হয়। তাই ট্রল করার আগে ভাবুন-এটি কি শুধু মজা, নাকি কারও সম্মান ও সমাজের ভবিষ্যতের প্রতি অন্যায়?

শিক্ষা আমাদের জাতির ভিত্তি। এই ভিত্তিকে মজবুত করতে মন্ত্রী মিলনের সংস্কারের সঙ্গে আমাদের সবাইকে হাত মেলাতে হবে। ট্রলের অন্ধকার ছেড়ে শিক্ষার আলোয় ফিরে আসুন। নতুন প্রজন্মকে সত্যিকারের দক্ষ, নৈতিক ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এটাই সময়। 

লেখক :  সাংবাদিক ও সংগঠক। 

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬


শিক্ষার আলো বনাম ডিজিটাল অন্ধকার: এহসানুল হক মিলনের সংস্কারের পথে ট্রলের বিষাক্ত ছায়া

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি কয়কমাস আগে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন, “এই তোমরা কেমন আছ? ঠিকমতো পড়াশোনা কর তো? পড়তে হবে, নকল আর হবে না।” এই সরল, স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল আহ্বানকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র ট্রল, মিম ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড়। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষ এই বক্তব্যকে বিকৃত করে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত করেছেন। এই ঘটনা শুধু একজন মন্ত্রীর সম্মানহানি নয়, বরং আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির অপব্যবহারের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। 

ট্রলিংয়ের ইতিহাস ইন্টারনেটের প্রথম দিনগুলোতে ফিরে যায়। তখন ফোরাম ও চ্যাটরুমে কিছু ব্যবহারকারী ইচ্ছাকৃত উসকানিমূলক মন্তব্য করে প্রতিক্রিয়া আদায় করতেন। কলিন্স ডিকশনারি অনুসারে, অনলাইনে অহেতুক, বিরক্তিকর ও বিষয়বহির্ভূত কথা বলে পাঠককে উসকে দেওয়াই ট্রলিং। সময়ের সঙ্গে এটি মিম কালচারে রূপ নিয়েছে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ও টিকটকের অ্যালগরিদম দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী বিতর্কিত কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়। হিব্রু ইউনিভার্সিটির গবেষক লিমর শিফম্যানের মতে, মিম হলো এমন ডিজিটাল উপাদান যা মানুষ অনুকরণ করে, ছড়ায় এবং নতুন রূপ দেয়। রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে ‘মিম’ ধারণাটি প্রবর্তন করেন-যা অনুকরণযোগ্য আইডিয়া বা আচরণ হিসেবে ভাইরাল হয়। 

কিন্তু ট্রলের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো আরও গভীর। ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ার গবেষক এভিটা মার্চের ‘লস অ্যান্ড দ্য ডার্ক টেট্রাড’ গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রলারদের মধ্যে স্যাডিজমের প্রবণতা প্রবল-অন্যকে মানসিক আঘাত দিয়ে তারা আনন্দ পান। অনলাইনের নিরাপদ দূরত্ব পরিচয় গোপন করে সীমা লঙ্ঘনকে সহজ করে দেয়। তবে ট্রল সবসময় নেতিবাচক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক সমালোচনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে-রাস্তার খারাপ অবস্থা বা যানজট নিয়ে মিম ভাইরাল হয়ে কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ে। কিন্তু যখন তা ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা ঘৃণায় পরিণত হয়, তখন তা সাইবার বুলিংয়ের রূপ নেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক।

বর্তমান ক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ট্রলিংয়ের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। “এই তোমরা কেমন আছো, পড়তে হবে, নকল আর চলবে না, তোমরা বড় হয়ে কার রাজনীতি করবা জাইমা রহমানের”-এমন বিকৃত সংস্করণ ছড়িয়ে শিক্ষার্থীরা শুধু একজন জনপ্রতিনিধিকে নয়, গুরুজন ও শিক্ষক  সমাজের প্রতি সম্মানকেও ক্ষুন্ন করছে। এটি অন্ধ অনুকরণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। সম্মানহানি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাইবার বুলিং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে-যুক্তরাজ্যের ম্যালিসিয়াস কমিউনিকেশনস অ্যাক্ট, সিঙ্গাপুরের প্রটেকশন ফ্রম হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্ট, আয়ারল্যান্ডের হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্ট ইত্যাদি। বাংলাদেশেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে, যদিও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। তিনি ২০০১-২০০৬ সালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নকলবিরোধী অভিযানে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছিলেন। পরীক্ষা কেন্দ্রে নকলমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা তাঁর সেই সময়ের অন্যতম মাইলফলক। বর্তমান দায়িত্বে এসেও তিনি একই দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানে নকল ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠান প্রধানকেই দায় নিতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনের আওতায় আনা হবে বলে ঘোষণা করেছেন। প্রশ্নফাঁস রোধে একক প্রশ্নপত্র, ইন-হাউজ কোচিং নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষকদের অযাচিত মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। 

তাঁর যুগান্তকারী উদ্যোগগুলো আরও ব্যাপক। ২০২৭ সাল থেকে জানুয়ারিতে এসএসসি এবং জুলাইয়ের মধ্যে এইচএসসি ফল প্রকাশের পরিকল্পনা, সেশনজট নিরসন এবং শিক্ষার্থীদের সময়ের অপচয় রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৮ সাল থেকে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন। প্রাথমিক থেকেই মিড-ডে মিল, ইউনিফর্ম, খেলাধুলাভিত্তিক আনন্দময় শিক্ষা চালু, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষার জোরদার, কোচিং নির্ভরতা কমানো এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বুয়েট, বুটেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআই ল্যাব, গবেষণা বৃদ্ধি, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং দেশীয় প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশ-শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে রাজনীতি করতে হবে, যাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন ব্যাহত না হয়। 

এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেবে। টেক্সটাইল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী মিলনের অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি এসব সংস্কারকে বাস্তবায়নযোগ্য করে তুলেছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ইতিবাচক পদক্ষেপের পরিবর্তে ট্রলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। পারিবারিক শিক্ষা, গুরুজনদের প্রতি সম্মান এবং দায়িত্ববোধের অভাব এখানে স্পষ্ট। হংকং ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, মিম শিক্ষার্থীদের চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যখন তা ঘৃণা ও অপমানের হাতিয়ার হয়, তখন তা বিপরীত ফল দেয়। সেলিব্রিটি ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা বেশি ট্রলের শিকার হন কারণ ট্রলাররা প্রতিক্রিয়া ও মনোযোগ চায়। নার্সিসিজম ও রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশনও এর পেছনে কাজ করে।

আমাদের সময় এসেছে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার, পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ট্রল যদি সৃজনশীল সমালোচনায় পরিণত হয়, তাহলে ভালো। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।

ড. এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে শিক্ষা খাতের এই রূপান্তর যুগান্তকারী। নকলমুক্ত, কোচিংমুক্ত, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তাঁর দৃঢ় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা উচিত। সমাজকে এই ইতিবাচক যাত্রায় সহযোগিতা করতে হবে, ট্রল করে বাধা সৃষ্টি নয়। ডিজিটাল যুগে এক ক্লিকে বিনোদন তৈরি হয়, আঘাতও তৈরি হয়। তাই ট্রল করার আগে ভাবুন-এটি কি শুধু মজা, নাকি কারও সম্মান ও সমাজের ভবিষ্যতের প্রতি অন্যায়?

শিক্ষা আমাদের জাতির ভিত্তি। এই ভিত্তিকে মজবুত করতে মন্ত্রী মিলনের সংস্কারের সঙ্গে আমাদের সবাইকে হাত মেলাতে হবে। ট্রলের অন্ধকার ছেড়ে শিক্ষার আলোয় ফিরে আসুন। নতুন প্রজন্মকে সত্যিকারের দক্ষ, নৈতিক ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এটাই সময়। 

লেখক :  সাংবাদিক ও সংগঠক। 


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই