মুক্তির লড়াই

মতামত

প্রতারণার ফাঁদে বন্দি

সাগরপথে ইউরোপের স্বপ্ন এবং বাংলাদেশের মানবপাচার সংকট

সাগরপথে ইউরোপের স্বপ্ন এবং বাংলাদেশের মানবপাচার সংকট

গত ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত হয়েছে মানব পাচারবিরোধী দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৩ সালে এই দিনটিকে ঘোষণা করেছিল। এবারের প্রতিপাদ্য ছিলো‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’ বা ‘Trapped Behind the Scam’-যা সরাসরি আলোকপাত করেছে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজে আটকে পড়া মানুষদের ওপর। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) সতর্ক করেছে যে, ভুয়া চাকরির প্রলোভনে ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ চক্র মানুষকে সীমান্ত পার করে জোর করে অনলাইন জালিয়াতিতে খাটাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই দিবস আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। কারণ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে অনিয়মিত প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশ এখন শীর্ষে, আর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যাম সেন্টার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্র এবং নারীপাচারের জালেও হাজার হাজার বাংলাদেশি আটকা পড়ছেন।

ফ্রন্টেক্স ও আইওএম-ডিটিএম-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে মোট ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন-যাদের ৮৩ শতাংশই ইতালিতে সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুটে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইতালিতে প্রায় ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং লিবিয়া উপকূল থেকে গ্রিসে আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি পৌঁছেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই রুটে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বলছে, এদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছর; তারা মূলত মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লার বাসিন্দা। ঢাকা থেকে মিসর, দুবাই বা তুরস্ক হয়ে লিবিয়া পৌঁছান তারা। ভালো কাজের প্রলোভন দেওয়া হলেও ৭৫ শতাংশ কোনো কাজ পাননি; ৯৩ শতাংশ লিবিয়ার ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।

মার্চের ২১ তারিখে লিবিয়ার তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হওয়া এক নৌকায় দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি মারা যান-যাদের ১২ জনই সুনামগঞ্জের। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সারভাইভারদের বর্ণনায় জানা যায়, নৌকায় ৩৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৩ জন ছিলেন। ফ্রন্টেক্স ও গ্রিস কোস্টগার্ডের উদ্ধার অভিযানে কেউ কেউ বেঁচে ফিরলেও এমন মৃত্যুযাত্রা থামেনি। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বারবার সতর্ক করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে-বিশেষ করে ফেসবুকের শতাধিক গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে-নৌকার ছবি ও যোগাযোগ নম্বর দিয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তির এই ব্যবহারে এখনো পিছিয়ে।

সাগরপথের পাশাপাশি সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের নতুন ও ভয়াবহ রূপ। বিএমইটির তথ্যমতে, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই কোনো চাকরি পাননি। জুন মাসে কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি উদ্ধার হয়ে দেশে ফেরেন। ব্র্যাকের গবেষণায় ফিরে আসাদের ৯৮ শতাংশ জানিয়েছেন চাকরির প্রতিশ্রুতি ভুয়া ছিল, ৯০ শতাংশকে জোর করে অনলাইন জালিয়াতিতে খাটানো হয়েছে, ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না, ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত টার্গেট পূরণ করতে না পারলে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো; অনেকের পরিচয় ছিল শুধু একটি কোড। মিয়ানমার থেকেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১৮ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮ জন উদ্ধার হয়েছেন। জাতিসংঘ ও আইওএম বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এসব স্ক্যাম কম্পাউন্ডে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজ এখন বৈশ্বিক মানবপাচারের অন্যতম প্রধান রূপ।

কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল বানানোর অভিযোগও উঠেছে। ফোর্টিফাই রাইটসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তদন্তে দেখা গেছে, ওয়েল্ডার বা নিরাপত্তারক্ষীর চাকরির কথা বলে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়ে রুশ ভাষার অবোধ্য চুক্তিতে সই করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে। নারীপাচারের চিত্রও ভয়াবহ। দুবাই, সৌদি আরব বা মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মী বা পার্লার কর্মীর প্রলোভনে অনেক নারীকে যৌন ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। পটুয়াখালীর লিজা আক্তার, নোয়াখালীর পহেলী আক্তার, নারায়ণগঞ্জের বিধবা সাহারা বেগমের ১৭ বছরের মেয়ে জান্নাতের মতো অনেকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বঙ্গোপসাগর উপকূলে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীদের অপহরণ করে ট্রলারে মালয়েশিয়া পাচারের ঘটনাও অব্যাহত।

আইনি সুরক্ষার চিত্র হতাশাজনক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবপাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে-যার ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন ও ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন। এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫০০টি নতুন মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার বাংলাদেশি ডিপোর্টি হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরে ফেরেন। সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে-যেখানে সংঘবদ্ধ পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু ব্র্যাকের শরিফুল হাসানের কথায়, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের অঙ্গীকার ছাড়া মানবপাচার, অর্থপাচার ও মাদকের মতো আন্তঃসম্পর্কিত অপরাধ নির্মূল করা কঠিন।

জাতিসংঘ, আইওএম, ফ্রন্টেক্স ও ব্র্যাকের এই সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তরুণদের স্বপ্নকে পুঁজি করে পাচারকারীরা সামাজিক মাধ্যম ও আধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানিয়েছে। সাগরের তরঙ্গে প্রাণহানি, লিবিয়ার ক্যাম্পে নির্যাতন, স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বৈদ্যুতিক শক আর যুদ্ধক্ষেত্রে মানবঢাল-এসবই প্রমাণ হয় যে, অদম্য বাসনা ও লোভনীয় উপার্জনের আশা কত সহজে ফাঁদে পরিণত হয়। পকরতি বছর এই দিবসে শুধু স্মরণ নয়, কার্যকর পদক্ষেপের নেয়ার দরকার। আইনের কঠোর প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের তরুণদের জীবন যেন আর কোনো পাচারকারীর ফাঁদে বন্দি না হয়-এটাই সকলের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। 

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬


সাগরপথে ইউরোপের স্বপ্ন এবং বাংলাদেশের মানবপাচার সংকট

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

গত ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত হয়েছে মানব পাচারবিরোধী দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৩ সালে এই দিনটিকে ঘোষণা করেছিল। এবারের প্রতিপাদ্য ছিলো‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’ বা ‘Trapped Behind the Scam’-যা সরাসরি আলোকপাত করেছে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজে আটকে পড়া মানুষদের ওপর। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) সতর্ক করেছে যে, ভুয়া চাকরির প্রলোভনে ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ চক্র মানুষকে সীমান্ত পার করে জোর করে অনলাইন জালিয়াতিতে খাটাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই দিবস আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। কারণ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে অনিয়মিত প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশ এখন শীর্ষে, আর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যাম সেন্টার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্র এবং নারীপাচারের জালেও হাজার হাজার বাংলাদেশি আটকা পড়ছেন।

ফ্রন্টেক্স ও আইওএম-ডিটিএম-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে মোট ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন-যাদের ৮৩ শতাংশই ইতালিতে সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুটে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইতালিতে প্রায় ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং লিবিয়া উপকূল থেকে গ্রিসে আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি পৌঁছেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই রুটে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বলছে, এদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছর; তারা মূলত মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লার বাসিন্দা। ঢাকা থেকে মিসর, দুবাই বা তুরস্ক হয়ে লিবিয়া পৌঁছান তারা। ভালো কাজের প্রলোভন দেওয়া হলেও ৭৫ শতাংশ কোনো কাজ পাননি; ৯৩ শতাংশ লিবিয়ার ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।

মার্চের ২১ তারিখে লিবিয়ার তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হওয়া এক নৌকায় দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি মারা যান-যাদের ১২ জনই সুনামগঞ্জের। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সারভাইভারদের বর্ণনায় জানা যায়, নৌকায় ৩৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৩ জন ছিলেন। ফ্রন্টেক্স ও গ্রিস কোস্টগার্ডের উদ্ধার অভিযানে কেউ কেউ বেঁচে ফিরলেও এমন মৃত্যুযাত্রা থামেনি। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বারবার সতর্ক করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে-বিশেষ করে ফেসবুকের শতাধিক গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে-নৌকার ছবি ও যোগাযোগ নম্বর দিয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তির এই ব্যবহারে এখনো পিছিয়ে।

সাগরপথের পাশাপাশি সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের নতুন ও ভয়াবহ রূপ। বিএমইটির তথ্যমতে, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই কোনো চাকরি পাননি। জুন মাসে কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি উদ্ধার হয়ে দেশে ফেরেন। ব্র্যাকের গবেষণায় ফিরে আসাদের ৯৮ শতাংশ জানিয়েছেন চাকরির প্রতিশ্রুতি ভুয়া ছিল, ৯০ শতাংশকে জোর করে অনলাইন জালিয়াতিতে খাটানো হয়েছে, ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না, ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত টার্গেট পূরণ করতে না পারলে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো; অনেকের পরিচয় ছিল শুধু একটি কোড। মিয়ানমার থেকেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১৮ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮ জন উদ্ধার হয়েছেন। জাতিসংঘ ও আইওএম বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এসব স্ক্যাম কম্পাউন্ডে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজ এখন বৈশ্বিক মানবপাচারের অন্যতম প্রধান রূপ।

কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল বানানোর অভিযোগও উঠেছে। ফোর্টিফাই রাইটসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তদন্তে দেখা গেছে, ওয়েল্ডার বা নিরাপত্তারক্ষীর চাকরির কথা বলে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়ে রুশ ভাষার অবোধ্য চুক্তিতে সই করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে। নারীপাচারের চিত্রও ভয়াবহ। দুবাই, সৌদি আরব বা মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মী বা পার্লার কর্মীর প্রলোভনে অনেক নারীকে যৌন ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। পটুয়াখালীর লিজা আক্তার, নোয়াখালীর পহেলী আক্তার, নারায়ণগঞ্জের বিধবা সাহারা বেগমের ১৭ বছরের মেয়ে জান্নাতের মতো অনেকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বঙ্গোপসাগর উপকূলে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীদের অপহরণ করে ট্রলারে মালয়েশিয়া পাচারের ঘটনাও অব্যাহত।

আইনি সুরক্ষার চিত্র হতাশাজনক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবপাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে-যার ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন ও ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন। এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৫০০টি নতুন মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার বাংলাদেশি ডিপোর্টি হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরে ফেরেন। সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে-যেখানে সংঘবদ্ধ পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু ব্র্যাকের শরিফুল হাসানের কথায়, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের অঙ্গীকার ছাড়া মানবপাচার, অর্থপাচার ও মাদকের মতো আন্তঃসম্পর্কিত অপরাধ নির্মূল করা কঠিন।

জাতিসংঘ, আইওএম, ফ্রন্টেক্স ও ব্র্যাকের এই সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তরুণদের স্বপ্নকে পুঁজি করে পাচারকারীরা সামাজিক মাধ্যম ও আধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানিয়েছে। সাগরের তরঙ্গে প্রাণহানি, লিবিয়ার ক্যাম্পে নির্যাতন, স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বৈদ্যুতিক শক আর যুদ্ধক্ষেত্রে মানবঢাল-এসবই প্রমাণ হয় যে, অদম্য বাসনা ও লোভনীয় উপার্জনের আশা কত সহজে ফাঁদে পরিণত হয়। পকরতি বছর এই দিবসে শুধু স্মরণ নয়, কার্যকর পদক্ষেপের নেয়ার দরকার। আইনের কঠোর প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের তরুণদের জীবন যেন আর কোনো পাচারকারীর ফাঁদে বন্দি না হয়-এটাই সকলের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। 


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই