মুক্তির লড়াই

সারাদেশ

মানবপাচারের ‘সস্তা রুট’ ফেনী

ফুলগাজী-পরশুরাম সীমান্তে দালালচক্রের জাল, ভিসা ছাড়াই পারাপারের অভিযোগ

ফুলগাজী-পরশুরাম সীমান্তে দালালচক্রের জাল, ভিসা ছাড়াই পারাপারের অভিযোগ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় অবৈধ সীমান্ত পারাপারের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। অর্থের বিনিময়ে ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিকদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পার করে দেওয়ার সঙ্গে স্থানীয় দালালচক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধান।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সীমান্ত পার হওয়ার উদ্দেশ্যে আসা ব্যক্তিদের ফেনীতে অবস্থান, স্থানীয় বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় এবং সীমান্তের ওপারে থাকা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের তথ্যও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে কথা হয়েছে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ব্যক্তি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ফুলগাজীর আমজাদহাট ইউনিয়নের এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে মানবপাচারচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন, জানান—দেশের অন্য কয়েকটি সীমান্তের তুলনায় ফেনী দিয়ে পারাপারে খরচ কম এবং অপেক্ষার সময়ও তুলনামূলক কম।


তার দাবি, ফেনীর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধভাবে পার করে দিতে জনপ্রতি প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি অনুযায়ী এ অর্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হয় বলেও তিনি জানান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পারাপারে আগ্রহীদের সীমান্তবর্তী নির্দিষ্ট বাড়িতে এক-দুই দিন রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাদের সীমান্তের দিকে নেওয়া হয়।

তবে এসব তথ্যের স্বাধীনতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে ফুলগাজী ও পরশুরামের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ পারাপারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফুলগাজীর আমজাদহাট ও মুন্সিরহাট ইউনিয়নের কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকা এবং পরশুরামের বিলোনিয়া, বক্সমাহমুদ ও মির্জানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার নাম স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরিচিত লোকজনের অল্প সময়ের জন্য অবস্থান, মধ্যস্থতাকারীদের আনাগোনা এবং রাতের বেলায় সন্দেহজনক চলাচল নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে।

নিজেকে পাচারচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করা এক ব্যক্তি জানান, বাংলাদেশে থাকা দালালদের সঙ্গে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় থাকা ব্যক্তিদের যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে পার করে দেওয়া ব্যক্তিকে ভারতের অংশে গ্রহণ করে পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা হয় বলেও তার দাবি।

এ ধরনের আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক থাকলে শুধু সীমান্তে টহল বাড়িয়ে তা বন্ধ করা কঠিন। অর্থের লেনদেন, স্থানীয় সহযোগী, পরিবহনব্যবস্থা এবং সীমান্তের দুই পাশের যোগাযোগ—সবগুলো স্তর তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফুলগাজী সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করা চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক নারী জানান, সীমান্ত পার হওয়ার আগে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সীমান্তের কাছাকাছি একটি বাড়িতে অবস্থানের পর পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাদের এগিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

তার দাবি, সীমান্ত পার হওয়ার পর ভারতের অংশে আগে থেকে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে তার বর্ণিত সীমান্ত পারাপারের নির্দিষ্ট কৌশল ও স্থান নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ করা হয়নি।

সম্প্রতি ফুলগাজী সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের চেষ্টার অভিযোগে বিজিবির হাতে আটক হন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার স্কুলশিক্ষক পার্থ সারথি নাথ (৪৫)।

তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কয়েক মাস আগে তিনি পরিবারের চার সদস্যসহ অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় মোট ১০ জন বিজিবির হাতে আটক হন বলে দাবি করেন তিনি।

পার্থ সারথির ভাষ্য, তাদের ভারতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে পাচারকারীদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাদের প্রায় দুই দিন একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে থাকতে হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে একই ধরনের ঘটনায় আটক চট্টগ্রামের রাউজানের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক কশ্যাপ সরকার (৫২) জানান, ভারতীয় ভিসা না পেয়ে তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তার দাবি, স্বজনদের কাছ থেকে ফেনী সীমান্তকে তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের পথ হিসেবে জানার পর তিনি এ পথ বেছে নেন।


ফুলগাজী থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে করা একটি মামলায় মুন্সিরহাটের বদরপুর এলাকার আনোয়ার হোসেন মিয়াজী, মো. কবির হোসেন, বাবু, করিমুল্লাহসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলায় একজনকে আটক এবং দালালের প্রলোভনে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ জনকে উদ্ধারের তথ্য রয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালেও একই আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় আমজাদহাটের হাড়ীপুস্করনী এলাকার সলিমুল্লাহ প্রকাশ সলু, মো. রফিকুল ইসলাম, মহি উদ্দিন, পূর্ব বসন্তপুরের সিএনজি চালক মো. ইউনুস ও মো. রাকিব হোসেনের নাম আসে। ওই মামলায় তিনজনকে আটক এবং পাঁচজন ভুক্তভোগী উদ্ধারের তথ্য রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, ফেনীর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চলাচলের সময় বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটকের ঘটনাও ঘটেছে। তাদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

এমনকি কয়েকজন আটক বিদেশি নাগরিকের কাছে শরণার্থী-সংক্রান্ত কার্ড পাওয়ার কথাও সূত্রটি জানিয়েছে। তবে কার্ডগুলোর বৈধতা, উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, মানবপাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিষয়টি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

ফেনীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম জানান, মানবপাচারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবিকে বিষয়টি তদন্তের জন্য বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান জানান, মানবপাচার প্রতিরোধে সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।

ফেনী সীমান্তে যদি সত্যিই একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে তাদের স্থানীয় সহযোগীরা কারা? সীমান্তবর্তী বাড়িগুলোতে বহিরাগতদের অবস্থানের বিষয়টি নজরে আসছে না কেন? অর্থের লেনদেন কীভাবে হচ্ছে? সীমান্তের ওপারে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগই বা কীভাবে হচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু সীমান্তে অভিযান নয়, দালালচক্রের অর্থের উৎস, মোবাইল যোগাযোগ, স্থানীয় সহযোগী, পরিবহনব্যবস্থা এবং আগের মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা জরুরি।

কারণ মানবপাচার শুধু সীমান্তের একটি অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অবৈধ অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

ফেনী সীমান্তে তাই নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন দালালচক্রের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ফুলগাজী-পরশুরাম সীমান্তে দালালচক্রের জাল, ভিসা ছাড়াই পারাপারের অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় অবৈধ সীমান্ত পারাপারের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। অর্থের বিনিময়ে ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিকদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পার করে দেওয়ার সঙ্গে স্থানীয় দালালচক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধান।


দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সীমান্ত পার হওয়ার উদ্দেশ্যে আসা ব্যক্তিদের ফেনীতে অবস্থান, স্থানীয় বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় এবং সীমান্তের ওপারে থাকা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের তথ্যও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে কথা হয়েছে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ব্যক্তি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে।


পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ফুলগাজীর আমজাদহাট ইউনিয়নের এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে মানবপাচারচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন, জানান—দেশের অন্য কয়েকটি সীমান্তের তুলনায় ফেনী দিয়ে পারাপারে খরচ কম এবং অপেক্ষার সময়ও তুলনামূলক কম।


তার দাবি, ফেনীর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধভাবে পার করে দিতে জনপ্রতি প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি অনুযায়ী এ অর্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হয় বলেও তিনি জানান।


তার ভাষ্য অনুযায়ী, পারাপারে আগ্রহীদের সীমান্তবর্তী নির্দিষ্ট বাড়িতে এক-দুই দিন রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাদের সীমান্তের দিকে নেওয়া হয়।


তবে এসব তথ্যের স্বাধীনতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।


অনুসন্ধানে ফুলগাজী ও পরশুরামের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ পারাপারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফুলগাজীর আমজাদহাট ও মুন্সিরহাট ইউনিয়নের কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকা এবং পরশুরামের বিলোনিয়া, বক্সমাহমুদ ও মির্জানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার নাম স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরিচিত লোকজনের অল্প সময়ের জন্য অবস্থান, মধ্যস্থতাকারীদের আনাগোনা এবং রাতের বেলায় সন্দেহজনক চলাচল নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে।


নিজেকে পাচারচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করা এক ব্যক্তি জানান, বাংলাদেশে থাকা দালালদের সঙ্গে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় থাকা ব্যক্তিদের যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে পার করে দেওয়া ব্যক্তিকে ভারতের অংশে গ্রহণ করে পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা হয় বলেও তার দাবি।


এ ধরনের আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক থাকলে শুধু সীমান্তে টহল বাড়িয়ে তা বন্ধ করা কঠিন। অর্থের লেনদেন, স্থানীয় সহযোগী, পরিবহনব্যবস্থা এবং সীমান্তের দুই পাশের যোগাযোগ—সবগুলো স্তর তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


ফুলগাজী সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করা চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক নারী জানান, সীমান্ত পার হওয়ার আগে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সীমান্তের কাছাকাছি একটি বাড়িতে অবস্থানের পর পরিস্থিতি অনুকূল হলে তাদের এগিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।


তার দাবি, সীমান্ত পার হওয়ার পর ভারতের অংশে আগে থেকে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থা করা হয়।


তবে তার বর্ণিত সীমান্ত পারাপারের নির্দিষ্ট কৌশল ও স্থান নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ করা হয়নি।


সম্প্রতি ফুলগাজী সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের চেষ্টার অভিযোগে বিজিবির হাতে আটক হন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার স্কুলশিক্ষক পার্থ সারথি নাথ (৪৫)।


তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কয়েক মাস আগে তিনি পরিবারের চার সদস্যসহ অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় মোট ১০ জন বিজিবির হাতে আটক হন বলে দাবি করেন তিনি।


পার্থ সারথির ভাষ্য, তাদের ভারতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে পাচারকারীদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাদের প্রায় দুই দিন একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে থাকতে হয়েছিল বলেও জানান তিনি।


অন্যদিকে একই ধরনের ঘটনায় আটক চট্টগ্রামের রাউজানের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক কশ্যাপ সরকার (৫২) জানান, ভারতীয় ভিসা না পেয়ে তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।


তার দাবি, স্বজনদের কাছ থেকে ফেনী সীমান্তকে তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের পথ হিসেবে জানার পর তিনি এ পথ বেছে নেন।


ফুলগাজী থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে করা একটি মামলায় মুন্সিরহাটের বদরপুর এলাকার আনোয়ার হোসেন মিয়াজী, মো. কবির হোসেন, বাবু, করিমুল্লাহসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলায় একজনকে আটক এবং দালালের প্রলোভনে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ জনকে উদ্ধারের তথ্য রয়েছে।


এর আগে ২০২৪ সালেও একই আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় আমজাদহাটের হাড়ীপুস্করনী এলাকার সলিমুল্লাহ প্রকাশ সলু, মো. রফিকুল ইসলাম, মহি উদ্দিন, পূর্ব বসন্তপুরের সিএনজি চালক মো. ইউনুস ও মো. রাকিব হোসেনের নাম আসে। ওই মামলায় তিনজনকে আটক এবং পাঁচজন ভুক্তভোগী উদ্ধারের তথ্য রয়েছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, ফেনীর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চলাচলের সময় বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটকের ঘটনাও ঘটেছে। তাদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।


এমনকি কয়েকজন আটক বিদেশি নাগরিকের কাছে শরণার্থী-সংক্রান্ত কার্ড পাওয়ার কথাও সূত্রটি জানিয়েছে। তবে কার্ডগুলোর বৈধতা, উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, মানবপাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিষয়টি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে বলেও জানান তিনি।


ফেনীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম জানান, মানবপাচারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবিকে বিষয়টি তদন্তের জন্য বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান জানান, মানবপাচার প্রতিরোধে সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।


ফেনী সীমান্তে যদি সত্যিই একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে তাদের স্থানীয় সহযোগীরা কারা? সীমান্তবর্তী বাড়িগুলোতে বহিরাগতদের অবস্থানের বিষয়টি নজরে আসছে না কেন? অর্থের লেনদেন কীভাবে হচ্ছে? সীমান্তের ওপারে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগই বা কীভাবে হচ্ছে?


এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু সীমান্তে অভিযান নয়, দালালচক্রের অর্থের উৎস, মোবাইল যোগাযোগ, স্থানীয় সহযোগী, পরিবহনব্যবস্থা এবং আগের মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা জরুরি।


কারণ মানবপাচার শুধু সীমান্তের একটি অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অবৈধ অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।


ফেনী সীমান্তে তাই নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন দালালচক্রের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই