ঢাকা   মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
মুক্তির লড়াই

লালমনিরহাটের সদর হাসপাতাল এখন রেফার্ড হাসপাতাল নামে পরিচিত



লালমনিরহাটের সদর হাসপাতাল এখন রেফার্ড হাসপাতাল নামে পরিচিত

স্বাস্থ্যসেবায় ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল 'রেফার্ড হাসপাতাল' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গুরুতর কোনো রোগী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে দেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। এ কারণেই বলা হয় রেফার্ড হাসপাতাল।

পাঁচটি উপজেলা, দুইটি পৌরসভা ও ৪৫টি ইউনিয়নে বসবাসরত লালমনিরহাট জেলার বিশাল এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য এই সদর হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেবার মান একটুও বাড়েনি। ২৫০ শয্যার অবকাঠামো তৈরি হলেও ১০০ শয্যার জনবল ও অবকাঠামো দিয়েই চালানো হচ্ছে এটি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ সংখ্যা ৪১ জন। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২২ জন, অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ১৯টি পদ। নার্সদের জন্য মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ৭৩টি, যেখানে কর্মরত আছেন ৬৫ জন, অর্থাৎ আটটি পদ শূন্য রয়েছে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ফিজিও), মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিও), ফার্মাসিস্ট, টিকিট ক্লার্ক, ওয়ার্ড মাস্টার, ল্যাব অ্যাটেন্ডেন্ট, বাবুর্চি, ডোম, অফিস সহায়ক, স্ট্রেচার বেয়ারার, সুইপার ও ওয়ার্ড বয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর প্রায় সব পদই শূন্য।

জনবল সঙ্কটের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতিরও চরম অভাব রয়েছে হাসপাতালে। এ ছাড়া, থাকা যন্ত্রপাতির অধিকাংশই নষ্ট, অ্যাম্বুলেন্স স্বল্পতা, শয্যা সঙ্কটের কারণে বারান্দা, সিঁড়ি, এমনকি মেঝেতেও রোগী ও স্বজনদের থাকতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা দায়। হাসপাতালের ভেতরে কুকুর ও বিড়াল অবাধে চলাফেরা করছে। সরকার সরবরাহকৃত প্রয়োজনীয় ওষুধ কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

রোগীর স্বজন ও অভিভাবকদের অভিযোগ, জেলা হাসপাতালে জটিল অপারেশন তো দূরের কথা, ছোট কোনো অপারেশনের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুনতে হয় নানা অজুহাত। চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যবহার

সেবাধর্মী নয়। এ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রংপুর বিভাগীয় শহরে বসবাস করেন এবং সেখানকার বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা দিতেই ব্যস্ত থাকেন। ঠিক মতো চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন না অন্য চিকিৎসকরাও। প্রতিদিন হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে দেয়া হয়।

এ ছাড়া হাসপাতালের সামনে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মোটরবাইকের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। তারা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রোগীদের প্রেসক্রিপশন দেখেন ও ছবি তুলে রাখেন।

এদিকে ২৫০ শয্যা চলে ১০০ শয্যার জনবলে

পৌরসভার বাসিন্দা হাসনাহেনা বেগম (৪৫) জানান, তার ছেলের পা কেটে গেলে গুরুতর অবস্থায় তাকে সন্ধ্যার সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর এক চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালে অর্থোপেডিক চিকিৎসক নেই। রোগীকে রংপুরে নিয়ে যেতে হবে। অন্য এক চিকিৎসক লালমনিরহাটের কোনো ভালো ডাক্তার দেখাতে বলেন এবং ক্লিনিকে চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিয়ে শেষ পর্যন্ত রংপুরে রেফার্ড করেন। এম এ হান্নান (৫৫) নামে আরেক অভিভাবক ক্ষোভ নিয়ে বলেন, 'আমার ১৫ দিনের নাতনীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। শিশু ওয়ার্ডের ডাক্তাররা রোগীদের দেখাশোনা না করে বারবার বলছেন, এ রোগীকে রংপুর হাসপাতালে রেফার্ড করে দিচ্ছি, সেখানে নিয়ে যান।'

এ বিষয়ে লালমনিরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মতিন আখতারুজ্জামান বলেন, '২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে সঠিকভাবে কাজ করার জন্য অন্তত ৯০ জন চিকিৎসক ও ১৬০ জন নার্স প্রয়োজন। এ ছাড়া ২৪টি কর্মচারীর পদও শূন্য রয়েছে। মাত্র ১৯ জন চিকিৎসক ও ৬২ জন নার্স দিয়ে চালানো হচ্ছে হাসপাতালটি। এ কারণেই চিকিৎসাসেবায় সমস্যা হচ্ছে।'

স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও জনবল সঙ্কটের কারণে জেলার প্রধান এই হাসপাতালটি জনগণের আস্থা হারাতে বসেছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে 'রেফার্ড হাসপাতাল' নামটি থেকেই যাবে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের পরিচয় হিসেবে।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬


লালমনিরহাটের সদর হাসপাতাল এখন রেফার্ড হাসপাতাল নামে পরিচিত

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬

featured Image

স্বাস্থ্যসেবায় ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল 'রেফার্ড হাসপাতাল' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গুরুতর কোনো রোগী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে দেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। এ কারণেই বলা হয় রেফার্ড হাসপাতাল।


পাঁচটি উপজেলা, দুইটি পৌরসভা ও ৪৫টি ইউনিয়নে বসবাসরত লালমনিরহাট জেলার বিশাল এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য এই সদর হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেবার মান একটুও বাড়েনি। ২৫০ শয্যার অবকাঠামো তৈরি হলেও ১০০ শয্যার জনবল ও অবকাঠামো দিয়েই চালানো হচ্ছে এটি।


হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ সংখ্যা ৪১ জন। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২২ জন, অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ১৯টি পদ। নার্সদের জন্য মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ৭৩টি, যেখানে কর্মরত আছেন ৬৫ জন, অর্থাৎ আটটি পদ শূন্য রয়েছে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ফিজিও), মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিও), ফার্মাসিস্ট, টিকিট ক্লার্ক, ওয়ার্ড মাস্টার, ল্যাব অ্যাটেন্ডেন্ট, বাবুর্চি, ডোম, অফিস সহায়ক, স্ট্রেচার বেয়ারার, সুইপার ও ওয়ার্ড বয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর প্রায় সব পদই শূন্য।


জনবল সঙ্কটের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতিরও চরম অভাব রয়েছে হাসপাতালে। এ ছাড়া, থাকা যন্ত্রপাতির অধিকাংশই নষ্ট, অ্যাম্বুলেন্স স্বল্পতা, শয্যা সঙ্কটের কারণে বারান্দা, সিঁড়ি, এমনকি মেঝেতেও রোগী ও স্বজনদের থাকতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা দায়। হাসপাতালের ভেতরে কুকুর ও বিড়াল অবাধে চলাফেরা করছে। সরকার সরবরাহকৃত প্রয়োজনীয় ওষুধ কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।


রোগীর স্বজন ও অভিভাবকদের অভিযোগ, জেলা হাসপাতালে জটিল অপারেশন তো দূরের কথা, ছোট কোনো অপারেশনের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুনতে হয় নানা অজুহাত। চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যবহার


সেবাধর্মী নয়। এ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রংপুর বিভাগীয় শহরে বসবাস করেন এবং সেখানকার বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা দিতেই ব্যস্ত থাকেন। ঠিক মতো চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন না অন্য চিকিৎসকরাও। প্রতিদিন হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে দেয়া হয়।


এ ছাড়া হাসপাতালের সামনে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মোটরবাইকের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। তারা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রোগীদের প্রেসক্রিপশন দেখেন ও ছবি তুলে রাখেন।


এদিকে ২৫০ শয্যা চলে ১০০ শয্যার জনবলে


পৌরসভার বাসিন্দা হাসনাহেনা বেগম (৪৫) জানান, তার ছেলের পা কেটে গেলে গুরুতর অবস্থায় তাকে সন্ধ্যার সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর এক চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালে অর্থোপেডিক চিকিৎসক নেই। রোগীকে রংপুরে নিয়ে যেতে হবে। অন্য এক চিকিৎসক লালমনিরহাটের কোনো ভালো ডাক্তার দেখাতে বলেন এবং ক্লিনিকে চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিয়ে শেষ পর্যন্ত রংপুরে রেফার্ড করেন। এম এ হান্নান (৫৫) নামে আরেক অভিভাবক ক্ষোভ নিয়ে বলেন, 'আমার ১৫ দিনের নাতনীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। শিশু ওয়ার্ডের ডাক্তাররা রোগীদের দেখাশোনা না করে বারবার বলছেন, এ রোগীকে রংপুর হাসপাতালে রেফার্ড করে দিচ্ছি, সেখানে নিয়ে যান।'


এ বিষয়ে লালমনিরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মতিন আখতারুজ্জামান বলেন, '২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে সঠিকভাবে কাজ করার জন্য অন্তত ৯০ জন চিকিৎসক ও ১৬০ জন নার্স প্রয়োজন। এ ছাড়া ২৪টি কর্মচারীর পদও শূন্য রয়েছে। মাত্র ১৯ জন চিকিৎসক ও ৬২ জন নার্স দিয়ে চালানো হচ্ছে হাসপাতালটি। এ কারণেই চিকিৎসাসেবায় সমস্যা হচ্ছে।'


স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও জনবল সঙ্কটের কারণে জেলার প্রধান এই হাসপাতালটি জনগণের আস্থা হারাতে বসেছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে 'রেফার্ড হাসপাতাল' নামটি থেকেই যাবে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের পরিচয় হিসেবে।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত